গণিত অলিম্পিয়াড: আমার প্রস্তুতির গল্প ও কিছু পরামর্শ
গণমাধ্যম ডেক্স
গণিত অলিম্পিয়াডের সঙ্গে আমার পরিচয় স্কুলজীবনের শুরুর দিকে। তখন বুঝিনি, এই পরিচয় একদিন আমাকে জাতীয় গণিত ক্যাম্প পর্যন্ত নিয়ে যাবে। ২০২১ ও ২০২২ সালে সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে জাতীয় ক্যাম্পে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এতগুলো বছরের পথচলায় অনেক বই পড়েছি, অনেক ওয়েবসাইট ঘেঁটেছি, অনেক ভুল করেছি, আবার অনেক কিছু শিখেছি। কোন বই, কোন প্ল্যাটফর্ম আর কোন অভ্যাস আমার সবচেয়ে কাজে লেগেছে, সেই অভিজ্ঞতাই এখানে ভাগ করে নিচ্ছি। যারা এখন অলিম্পিয়াডের প্রস্তুতি শুরু করতে চাইছে কিংবা শুরু করেছে, কিন্তু কোন দিকে এগোবে বুঝতে পারছে না, তাদের যদি এই লেখা একটু হলেও পথ দেখায়, সেটাই হবে আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।
শুরুটা যেভাবে
‘অলিম্পিয়াড’ শব্দটা প্রথম শুনি ২০১৬ সালে। সে বছর আমার এক সহপাঠী জাতীয় পর্যায়ে ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়নস’ হয়। খবরটা শুনে অবাক হয়েছিলাম। স্কুলের অঙ্কের বাইরেও যে গণিত নিয়ে এমন বড় প্রতিযোগিতা হয়, সেটা তখনই প্রথম জানলাম। সহপাঠীর সাফল্য দেখে মনে কৌতূহল জাগল, আসলে সেখানে কী ধরনের প্রশ্ন আসে, কীভাবে ভাবতে হয়?
পরের বছর আমাদের স্কুলের ক্লাব একটি গণিত ক্যাম্পের আয়োজন করে। সেই ক্যাম্পই ছিল আমার জন্য আসল শুরু। সেখানে প্রথমবার মডুলার অ্যারিথমেটিক শিখি। কোনো সংখ্যাকে অন্য সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ কত থাকে, শুধু সেটা নিয়ে কাজ করেই যে কত জটিল সমস্যার সমাধান করা যায়, তা দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। ক্যাম্পে নানা ধরনের সমস্যা নিয়ে ভাবার সুযোগ পাই, আর বুঝতে পারি, অলিম্পিয়াডের গণিত মানে সূত্র মুখস্থ করা নয়; বরং নতুনভাবে ভাবতে শেখা।
ক্যাম্প শেষ হওয়ার পর নিজে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করি। প্রথমে হাত দিই নিজের পাঠ্যবইয়ে। বইয়ের অনুশীলনীর সমস্যাগুলো কারও সাহায্য ছাড়া, সমাধান না দেখে নিজে নিজে করার চেষ্টা করতাম। এতে ভিত্তিটা শক্ত হয়। পাঠ্যবইয়ের সমস্যায় স্বচ্ছন্দ হওয়ার পর ধীরে ধীরে বাইরের বই আর অন্যান্য উৎসের দিকে এগোই।
নতুনদের জন্য পরামর্শ: শুরুতেই কঠিন বই ধরার দরকার নেই। নিজের পাঠ্যবইটা ভালোভাবে শেষ করো। ভিত্তি শক্ত না হলে পরের ধাপগুলো কঠিন মনে হবে।
যে বইগুলো কাজে লেগেছে
বই ছিল আমার প্রস্তুতির মূল ভরসা। প্রতিটি বই আলাদা আলাদা কাজে লেগেছে।
• বিডিএমও প্রস্তুতি: অলিম্পিয়াডে কোন কোন বিষয় আসে, শুরুতে সেটাই জানতাম না। এই বই থেকে সংখ্যাতত্ত্ব, জ্যামিতি, বীজগণিত, কম্বিনেটরিকসের মতো অনেক টপিকের প্রাথমিক ধারণা পেয়েছি। বলা যায়, বইটি আমাকে পুরো প্রস্তুতির একটা মানচিত্র দিয়েছিল। কী পড়তে হবে, আর কোন ক্রমে এগোতে হবে, তা বুঝতে বইটি খুব সাহায্য করেছে।
• বিডিএমও কম্পেন্ডিয়াম: এতে জুনিয়র ক্যাটাগরির বিগত বছরের প্রশ্নগুলো একসঙ্গে পাওয়া যায়। পুরোনো প্রশ্ন সমাধান করে বুঝতে পেরেছি, পরীক্ষায় কী ধরনের প্রশ্ন আসে, কোন টপিক থেকে বেশি আসে, আর প্রশ্নের কাঠিন্য কেমন হয়। প্রস্তুতির জন্য বিগত বছরের প্রশ্নের চেয়ে ভালো অনুশীলন খুব কমই আছে।
• Art and Craft of Problem Solving: আগের বইগুলো থেকে শিখেছি কী জানতে হবে, আর এই বই থেকে শিখেছি কীভাবে ভাবতে হবে। সমস্যা দেখে কোথা থেকে শুরু করব, আটকে গেলে কোন কৌশল কাজে লাগাব, ছোট উদাহরণ দিয়ে প্যাটার্ন খোঁজা, উল্টো দিক থেকে ভাবা, এমন অনেক কৌশল এই বই থেকে শিখেছি। ইংরেজিতে লেখা হলেও বইটি পড়ার পরিশ্রম পুরোপুরি সার্থক।
• নিউরনে আবারও অনুরণন: ক্যালকুলাসের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় এই বইয়ের মাধ্যমে। স্কুলের পাঠ্যসূচির অনেক আগেই ক্যালকুলাসের মূল ধারণাগুলো সহজভাবে বুঝতে পেরেছি। গণিতকে শুধু প্রতিযোগিতার বিষয় হিসেবে না দেখে উপভোগ করতে শেখার ক্ষেত্রেও বইটির অবদান আছে।
• 104 Number Theory Problems (Titu Andreescu, Dorin Andrica ও Zuming Feng): সংখ্যাতত্ত্বের জন্য এই বইটাই আমার সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল। বইয়ের শুরুতে সংখ্যাতত্ত্বের মৌলিক ধারণাগুলো আলোচনা করা আছে। তারপর ধাপে ধাপে সহজ থেকে কঠিন, অর্থাৎ অলিম্পিয়াড মানের সমস্যায় পৌঁছানো যায়। এক লাফে কঠিন সমস্যায় না গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওঠার এই ব্যবস্থা আমার খুব কাজে লেগেছে। সমস্যাগুলো সমাধান করতে করতে বুঝেছি, সংখ্যাতত্ত্বে ভালো করতে হলে কেবল সূত্র জানলে চলে না, সমস্যার ভেতরের কাঠামোটা ধরতে পারতে হয়।
• Euclidean Geometry in Mathematical Olympiads (Evan Chen): জ্যামিতির জন্য আমি এই বইটি পড়েছি। অলিম্পিয়াডের জ্যামিতি স্কুলের জ্যামিতির চেয়ে অনেকটাই আলাদা। এখানে শুধু উপপাদ্য জানলে হয় না, কোন সমস্যায় কোন কৌশল কাজে লাগবে, সেটাও বুঝতে হয়। এই বই পড়ে সেই দৃষ্টিভঙ্গিটা তৈরি হয়েছে। জ্যামিতির সমস্যায় আটকে গেলে আমি এর ধারণাগুলোয় ফিরে যেতাম।
বই পড়তে গিয়ে অনেক জায়গায় আটকে যেতাম। কোনো অংশ না বুঝলে হতাশ হয়ে বই বন্ধ করে দিতাম না। ইউটিউব চ্যানেল আর অনলাইনের অন্যান্য উৎস থেকে সেই টপিক আলাদা করে শিখে নিতাম, তারপর আবার বইয়ে ফিরে যেতাম। একই বিষয় দুই–তিনটা উৎস থেকে পড়লে অনেক সময় যে জিনিস কিছুতেই মাথায় ঢুকছিল না, সেটাও পরিষ্কার হয়ে যায়।
নতুনদের জন্য পরামর্শ: একসঙ্গে অনেক বই শুরু কোরো না। একটা বই ধরে মন দিয়ে শেষ করো, তারপর পরেরটায় যাও। আর বিগত বছরের প্রশ্ন সমাধান করাকে প্রস্তুতির নিয়মিত অংশ বানাও।
বন্ধুদের সঙ্গে প্র্যাকটিস
গণিত একা একা করার জিনিস মনে হলেও আমার প্রস্তুতির বড় একটা অংশ ছিল বন্ধুদের সঙ্গে। মেসেঞ্জার গ্রুপ আর বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে আমি সক্রিয় ছিলাম। সেখানে অনেকে নিয়মিত প্রবলেম পোস্ট করত। আমি সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করতাম, কখনো পারতাম, কখনো পারতাম না।
কোথাও আটকে গেলে নিজের প্রশ্নটা ফেসবুক পেজ বা গ্রুপে পোস্ট করতাম, কিংবা গ্রুপের বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করতাম। এখানেই সবচেয়ে মজার জিনিসটা শিখেছি: একই সমস্যা একেকজন একেকভাবে সমাধান করে। কেউ বীজগণিত দিয়ে, কেউ জ্যামিতিক চিত্র এঁকে, কেউ আবার একদম অপ্রত্যাশিত কোনো কৌশলে। অন্যদের সমাধান দেখে নিজের চিন্তার পরিধি অনেক বেড়েছে। আর নিজের সমাধান অন্যকে বুঝিয়ে বলতে গিয়ে নিজের বোঝাটাও আরও পাকা হয়েছে।
নতুনদের জন্য পরামর্শ: প্রশ্ন করতে লজ্জা পেয়ো না। আর কোনো সমস্যা সমাধান করতে পারলেও অন্যদের সমাধান দেখো। প্রায়ই দেখবে, তোমার চেয়ে ছোট বা সুন্দর কোনো সমাধান আছে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম
বই আর বন্ধুদের পাশাপাশি দুটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আমার প্রস্তুতিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
• Art of Problem Solving (AoPS) ফোরাম: বিশ্বের নানা দেশের অলিম্পিয়াডের প্রশ্ন আর সেগুলোর সমাধান এখানে পাওয়া যায়। একটি প্রশ্নের নিচে প্রায়ই অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন সমাধান থাকে। নিজে চেষ্টা করার পর সেগুলো মিলিয়ে দেখলে অনেক কিছু শেখা যায়। নির্দিষ্ট কোনো টপিকের সমস্যা খুঁজে পেতেও এই ফোরাম খুব কাজের।
• গণিতযজ্ঞ কনটেস্ট: আমি নিয়মিত এই অনলাইন কনটেস্টগুলোয় অংশ নিতাম। ঘরে বসে আরাম করে সমস্যা সমাধান করা আর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চাপ নিয়ে সমাধান করা—দুটি একেবারে আলাদা অভিজ্ঞতা। কনটেস্টে অংশ নিতে নিতে সময় ব্যবস্থাপনা আর প্রতিযোগিতার অভ্যাস তৈরি হয়। ফলে আসল অলিম্পিয়াডে গিয়ে আর অতটা নার্ভাস লাগে না।
নতুনদের জন্য পরামর্শ: AoPS-এ সমাধান দেখার আগে অন্তত কিছুটা সময় নিজে চেষ্টা করো। সরাসরি সমাধান দেখে ফেললে শেখা হয় খুব কম।
জাতীয় ক্যাম্পের অভিজ্ঞতা
এত বছরের প্রস্তুতির ফল পাই ২০২১ সালে, যখন সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে প্রথমবার জাতীয় গণিত ক্যাম্পে ডাক পাই। পরের বছর, ২০২২ সালেও সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে ক্যাম্পে অংশ নিই।
ক্যাম্পে এসে নতুন করে বুঝলাম, একই সমস্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মানুষ কতটা ভিন্নভাবে ভাবতে পারে। সারা দেশ থেকে আসা মেধাবী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে সমস্যা নিয়ে ভাবা, আলোচনা করা—এর অভিজ্ঞতা অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা হয় না। ক্যাম্পে গণিতের অনেক নতুন শাখার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, যেগুলোর নামও আগে ঠিকমতো জানতাম না। শুধু ক্লাস নয়, বিভিন্ন গেম ও অ্যাকটিভিটির মাধ্যমেও সমস্যা নিয়ে ভাবার নতুন নতুন উপায় শিখেছি। ক্যাম্প আমাকে শিখিয়েছে, গণিত শুধু প্রতিযোগিতা জেতার বিষয় নয়, এটা একটা আনন্দের যাত্রা।
পেছনে তাকালে দেখি, আমার প্রস্তুতিতে কোনো জাদুকরি শর্টকাট ছিল না। পাঠ্যবই দিয়ে শুরু করে ধাপে ধাপে বাইরের বইয়ে যাওয়া, নিয়মিত সমস্যা সমাধান করা, বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করা আর কনটেস্টে অংশ নেওয়া, এই সাধারণ অভ্যাসগুলোই আমাকে এগিয়ে নিয়েছে।
যারা নতুন শুরু করছ, তাদের বলব, আটকে যাওয়াটা প্রস্তুতিরই অংশ। কোনো সমস্যা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভেবেও সমাধান করতে না পারলে মন খারাপ কোরো না, ওই ভাবনার সময়টাতেই তুমি সবচেয়ে বেশি শিখছ। প্রশ্ন করো, অন্যের সমাধান দেখো, আর গণিতটা উপভোগ করো। ধৈর্য ধরে লেগে থাকলে পথ নিজেই খুলে যাবে।
সূত্র: প্রথম আলো