ঘরে বসে ইসলাম শিক্ষা: কী পড়বেন, কীভাবে পড়বেন
গণমাধ্যম ডেক্স
প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসায় গিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশোনা করার সুযোগ সবার থাকে না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে একজন মানুষ চাইলেই ঘরে বসে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও প্রামাণ্য গ্রন্থ অধ্যয়নের মাধ্যমে গভীর ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন না।
নিজের ধর্ম ও জীবন পরিচালনার জন্য যতটুকু জ্ঞান অর্জন করা ওয়াজিব, সঠিক পদ্ধতিতে চেষ্টা করলে তা ঘরে বসেই অর্জন করা অসম্ভব নয়। তবে একটা নির্ভরযোগ্য, দক্ষ ও খোদাভীরু আলেমের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখতে হবে।
ঘরে বসে ধর্মীয় শিক্ষা অর্জনের জন্য একটি রূপরেখা তুলে ধরা হলো।
প্রথম ধাপ: সহিহ-শুদ্ধ কোরআন পাঠ
ঘরে বসে কোরআন শিক্ষার যাত্রাটি শুধু পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর মর্মার্থ অনুধাবনের দিকে নিয়ে যেতে হবে।
কী পড়বেন:
তেলাওয়াত ও তাজবিদ: শুরুতেই কায়দা বা তাজবিদের কোনো নির্ভরযোগ্য বই নিয়ে কোনো দক্ষ কারির সহায়তায় বা অডিও-ভিডিও অ্যাপের মাধ্যমে হরফের মাখরাজ ও সিফাত ঠিক করে নিতে হবে।
অনুবাদ: পড়ার জন্য প্রামাণ্য ও সহজবোধ্য অনুবাদ নির্বাচন করতে হবে।
তাফসির: কোরআনের আয়াতের প্রেক্ষাপট বুঝতে সংক্ষিপ্ত ও নির্ভরযোগ্য তাফসির পড়া যেতে পারে। আধুনিক যুগের সহজবোধ্য কোনো তাফসির গ্রন্থ।
নামাজ ও ইবাদতের শর্ত হিসেবে ন্যূনতম কোরআনের কিছু অংশ সহিহ করে পড়া এবং তার মূল বিধান জানা প্রতিটি মুমিনের ওপর ব্যক্তিগত ফরজ। (আল-ফতোয়া আল-হিন্দিয়া, ১/৬২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০০)
২. দ্বিতীয় ধাপ: আকাইদ
ধর্মীয় শিক্ষার দ্বিতীয় ও সবচেয়ে সংবেদনশীল স্তম্ভ হলো সঠিক আকিদা বা বিশ্বাস গঠন করা। ভুলের বেড়াজাল থেকে ইমানকে রক্ষা করতে শরিয়তের মৌলিক বিশ্বাসগুলো পরিষ্কার থাকা জরুরি।
কী পড়বেন: তাওহিদ, রিনামাজ, ফেরেশতাকুল, আসমানি কিতাবসমূহ, পরকাল এবং তকদিরের ওপর ইমান আনার বিষয়টি বিস্তারিত জানতে হবে। এ ক্ষেত্রে আকাইদ শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য ও সহজ গ্রন্থ, বা আলেমদের লেখা আকিদা বিষয়ক সংক্ষিপ্ত পুস্তিকা অধ্যয়ন করা উচিত।
কেন আকিদা শিক্ষা: ইমানের মৌলিক বিষয়গুলোতে কোনো প্রকার সন্দেহ বা ভ্রান্তি দূর করার জন্য এবং সঠিক আকিদা লালন করার জন্য সমকালীন আকিদাহ বিষয়ক জ্ঞান অর্জন করা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ১/১২৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)
৩. তৃতীয় ধাপ: দৈনন্দিন মাসআলা
ঘরসংসার ও কর্মব্যস্ত জীবনে একজন মানুষের হালাল-হারাম, পবিত্রতা, নামাজ, রোজা এবং লেনদেনের যেসব মাসআলা প্রতিদিন প্রয়োজন হয়, তা নিখুঁতভাবে জানা ফিকহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
কী পড়বেন:
পবিত্রতা ও নামাজ: অজু, গোসল, তায়াম্মুম এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সঠিক নিয়ম নির্ভরযোগ্য লেখকের নামাজ ও মাসআলা বিষয়ক বই পড়া যেতে পারে।
হানাফি ফিকহের আলোকে মাসআলা শেখার জন্য ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বজনস্বীকৃত এবং অত্যন্ত ফলপ্রসূ গ্রন্থ মুফতি কেফায়েতুল্লাহ দেহলভি রচিত ‘তা’লিমুল ইসলাম’ (৪ খণ্ডে সমাপ্ত) অথবা মাওলানা আশরাফ আলী থানবি রচিত ‘বেহেশতী জেওর’ (বিশেষ করে প্রথম দিকের অংশগুলো) অধ্যয়ন করা কার্যকর।
এই কিতাবগুলোতে ঘরে বসে দৈনন্দিন জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ মাসআলা শেখার সব উপাদান রয়েছে।
৪. চতুর্থ ধাপ: হাদিস অধ্যয়ন
নবীজির সুন্নাহ ও চারিত্রিক গুণাবলি নিজের জীবনে ফুটিয়ে তোলার জন্য হাদিস অধ্যয়ন অপরিহার্য।
কী পড়বেন: শুরুতেই বিশাল বুখারি বা মুসলিম শরিফ নয়; বরং চরিত্র ও আখলাক সংশোধনের জন্য ইমাম নববি সংকলিত হাদিসগ্রন্থ ‘রিয়াদুস সালেহিন’ দিয়ে শুরু করতে পারেন।
এই গ্রন্থে ইখলাস, সবর, সততা, তাকওয়া এবং সদাচরণের ওপর চমৎকার সব হাদিস সাজানো রয়েছে।
ঘরে একা পড়তে গিয়ে যদি কোনো বিষয়ে ধন্দ তৈরি হয় বা ফিকহি মাসআলা বুঝতে সমস্যা হয়, তবে নিজে মনগড়া ফায়সালা না করে স্থানীয় কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির শরণাপন্ন হয়ে তা পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত।
ঘরে বসে পড়ার কর্মপরিকল্পনা
নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ: প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠার পর ফজরের পরের সময়টি অথবা রাতে ঘুমানোর আগে অন্তত ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা সময় নির্দিষ্ট করে নিন। এই সময়ে কোনো মোবাইল বা অন্য ব্যস্ততা রাখবেন না।
নোট নেওয়ার অভ্যাস: পড়ার সময় খাতার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা, নতুন শব্দ বা না-বোঝা বিষয়গুলো লিখে রাখুন।
মাসআলা যাচাই: ঘরে একা পড়তে গিয়ে যদি কোনো বিষয়ে ধন্দ তৈরি হয় বা ফিকহি মাসআলা বুঝতে সমস্যা হয়, তবে নিজে মনগড়া ফায়সালা না করে স্থানীয় কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির শরণাপন্ন হয়ে তা পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত।
সূত্র: প্রথম আলো