শাকিল হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে: প্রতিমন্ত্রী পুতুল
গণমাধ্যম ডেক্স
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল বলেছেন, নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিলের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যত প্রভাবশালী ব্যক্তিই জড়িত থাকুক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। বাংলাদেশের মাটিতেই শাকিল হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর শহরের খামারনাচকৈড় খোয়ারপাড়া মহল্লায় নিহত শাকিলের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, ‘শাকিল খুন হয়ে আমাদের বুকের মধ্যে বিচার নামের অনেক বড় একটা বোঝা রেখে গেছেন। যতদিন পর্যন্ত এর বিচার করতে না পারব, ততদিন পর্যন্ত আমাদের এই বোঝা যাবে না।’
তিনি বলেন, ‘ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা যত বড় প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে। কেউ অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাকে হত্যার অধিকার কারও নেই। অপরাধ করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রয়েছে, আইনের মাধ্যমে তার বিচার হতে পারে; কিন্তু কাউকে কুপিয়ে হত্যা করার অধিকার কারও নেই।’
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘অনেকে বলার চেষ্টা করছে, শাকিল নিজেই অনেক ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিল। থাকতে পারে। তাই বলে কেউ কাউকে মেরে ফেলার অধিকার পায় না। আমরা বাংলাদেশে বারবার এমন ঘটনা ঘটতে দেব না।’
শাকিল হত্যার তদন্ত নিয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রতিমন্ত্রী। তার অভিযোগ, শাকিল গুরুতর আহত হওয়ার পরও তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশের গাফিলতি ছিল। পুলিশ তখনই শাকিলের বক্তব্য গ্রহণ করলে ঘটনার অনেক তথ্য দ্রুত জানা সম্ভব হতো। এ ছাড়া মামলার এজাহারে বাদীর উল্লেখ করা নাম বাদ দিয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে মামলা নথিভুক্ত করার বিষয়টিও আইনবহির্ভূত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে পুতুল বলেন, ‘বাদী নাম দিয়েছে, আপনি মামলা করতে পারবেন না দিস ইজ ইললিগ্যাল। এটা আপনারা করতে পারেন না। আমি পুলিশের সঙ্গে রাগারাগিও করেছি।’
নিহত শাকিলের বাবা রবিউল ইসলাম জানান, গত ১৪ অক্টোবর তার ছেলেকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর তিনি গুরুদাসপুর থানায় হত্যা চেষ্টা মামলা করেন। তার দাবি, নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের নির্দেশে আমেরিকাপ্রবাসী রাসেলের নাম মামলার এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পরে একই সংসদ সদস্যের নির্দেশেই সেই নাম বাদ দেওয়া হয়। গত সোমবার পর্যন্ত পুলিশ কোনো অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রবিউল ইসলামের সন্দেহ, সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুর পাশাপাশি আমেরিকাপ্রবাসী রাসেলও তার ছেলে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারিত হবে।
প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, ‘আমরা সবাই চেষ্টা করেছি শাকিল বেঁচে থাকুক। কিন্তু অনেকে চেয়েছে শাকিল না থাকুক। কারণ, শাকিল বেঁচে থাকলে হয়তো অপরাধীদের নামগুলো আরও দ্রুত চলে আসত।’
তিনি বলেন, গুরুদাসপুরে বিএনপি নেতা মবিদুল এবং বড়াইগ্রামের বনপাড়ায় সানাউল্লাহ নুর বাবুকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হলেও এখন পর্যন্ত বিচার হয়নি। তবে শাকিল হত্যার বিচার ঝুলে থাকবে না বলে আশ্বাস দেন তিনি।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা না করার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জানাজার পর কিছু জায়গায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক, তার পরিচয় অপরাধী। আইন অনুযায়ী তার সাজা নিশ্চিত করতে হবে। শাকিলের বাবা-মায়ের কাছে অন্তত বিচার নিশ্চিত করার জবাব দিতে চান বলেও জানান তিনি।
এর আগে প্রতিমন্ত্রী নিহত শাকিলের কবর জিয়ারত করেন। এ সময় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম, সহসভাপতি নিজামুদ্দিন ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোমিনুল ইসলাম জিষান উপস্থিত ছিলেন। পরে তাঁরা শাকিলের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানান।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হেলমেট পরা কয়েকজন সশস্ত্র দুর্বৃত্তের হামলার শিকার হন পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম। এ সময় তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) ভর্তি করেন।
হামলার পাঁচ দিন পর ১৯ অক্টোবর শাকিলের বাবা রবিউল ইসলাম গুরুদাসপুর থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। হাসপাতালে ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৬ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে শাকিলের মৃত্যু হয়।
শাকিলের মৃত্যুর দিন রাত ১০টার দিকে সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে আটক করে পুলিশ। পরদিন ২৭ অক্টোবর হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। একই ঘটনায় যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি মিন্টুকে সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কার করে।
এদিকে শাকিল হত্যাকাণ্ডে মিন্টুর পাশাপাশি আমেরিকাপ্রবাসী রাসেলের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে এমন সন্দেহ থেকে জানাজায় অংশ নেওয়া কিছু লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে কয়েকটি দোকানপাটে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। জানাজায় বক্তব্য দিতে গিয়ে জনরোষের মুখেও পড়েন সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ।
এরপর বুধবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের একটি অশ্লীল ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাকে অশ্লীল যৌন অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে ভিডিওটির সত্যতা ও প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
অন্যদিকে সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ ও তার ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ বলে দাবি করেছেন।
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স