মার্কিন নির্ভরতা কমাতে নতুন জোট গড়ল কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন
গণমাধ্যম ডেক্স
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা নির্ভরতা কমানো এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় নতুন জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ‘অ্যালায়েন্স ফর দ্য ফিউচার’ নামের এ জোটে একই ধরনের মূল্যবোধে বিশ্বাসী অন্য দেশগুলোকেও যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে দুই পক্ষ। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) মন্ট্রিয়লে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন এ ঘোষণা দেন। তাদের মতে, কানাডা ও ২৭ সদস্যের ইইউর মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের অংশীদারত্ব অভূতপূর্ব স্থিতিশীলতা ও সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
কার্নি বলেন, তাদের সমাজ নতুন নতুন সংকটের মুখে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক রীতিনীতির অবক্ষয় এবং বাণিজ্যকে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
দুই দিনের সম্মেলন শেষে ইউক্রেনের জন্য ৯ হাজার কোটি ইউরোর সহায়তা ঋণে অবদান রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কানাডা। নেতারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যৎ আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক হাজার কোটি ডলারের আরও সমন্বিত বাজার গড়ে তোলা, বাণিজ্য ও ভ্রমণের বিধিনিষেধ কমানো এবং শিক্ষার নতুন সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নতুন ভূরাজনৈতিক অংশীদার খুঁজছেন কার্নি। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর কানাডার অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে অটোয়ার।
গত অক্টোবরের মাঝামাঝি ইউক্রেনে স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড সেবার গতি কমিয়ে দিয়েছিলেন ইলন মাস্ক। এতে ইউক্রেনের সামরিক ও প্রতিরক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। কানাডার দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা মাস্ক দেশটির ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টির সমালোচক। এমনকি কানাডার কয়েকটি প্রদেশের বিচ্ছিন্ন হওয়ার পক্ষেও কথা বলেছেন তিনি।
কার্নি একাধিকবার সতর্ক করেছেন, কানাডার প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এমন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়, যাদের স্বার্থ দেশটির স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
এ নির্ভরতা কমানোর উদাহরণ হিসেবে কানাডার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান কোহিয়ার ইনকরপোরেশন এবং জার্মানির আলেফ আলফা জিএমবিএইচের পরিকল্পিত একীভূত হওয়ার কথা তুলে ধরেছেন কার্নি। একীভূত প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় থাকবে জার্মানির বার্লিন ও কানাডার টরন্টোতে। কোহিয়ারে সর্বোচ্চ ১৬০ কোটি কানাডীয় ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার।
কার্নি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ অন্য কোথাও, অচেনা কিংবা অবিশ্বাসযোগ্য কারও হাতে নির্ধারিত হওয়ার অপেক্ষায় তারা বসে থাকবেন না।
এ ছাড়া শুক্রবার ব্রাসেলস ও অটোয়া কানাডাকে ইউরোপের সুপারকম্পিউটিং নেটওয়ার্কে যুক্ত করার চুক্তি করেছে। এর ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল প্রশিক্ষণের জন্য ইউরোপের সুপারকম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ পাবেন কানাডীয় গবেষকেরা।
বৈশ্বিক ব্যবস্থা নতুন করে গড়ে তোলা কিংবা অনিশ্চয়তার মধ্যে একই মূল্যবোধের দেশগুলোর জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে সম্মেলনে।
ফন ডার লেয়েন বলেন, বাণিজ্য যখন অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন এর মূল্য দিতে হয় সাধারণ পরিবারগুলোকে। সুপারমার্কেটের পণ্য থেকে শুরু করে নতুন গাড়ি কেনার খরচ; সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ে। জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো পণ্যের নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারীরাও ক্রমে চাপ প্রয়োগের উপকরণে পরিণত হচ্ছে।
কার্নি বলেন, আরও বেশি প্রতিযোগিতা ও পণ্যের বিকল্প তৈরি হলে সরবরাহব্যবস্থায় নিশ্চয়তা বাড়বে। একই সঙ্গে দুই পক্ষ একসঙ্গে বিভিন্ন সংকটের ধাক্কা সামাল দিতে পারবে।
সম্মেলনে কানাডার ইইউর সহযোগী সদস্য হওয়ার সম্ভাবনাও আবার আলোচনায় আসে। ফন ডার লেয়েন বলেন, এ ধরনের সদস্যপদের কোনো পূর্বনজির নেই। তবে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে এর কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।
তিনি বলেন, এ অংশীদারত্ব অন্য কারও বিরুদ্ধে নয়, বরং নিজেদের সম্মিলিত শক্তি বাড়ানোর জন্য।
নেতারা সহযোগী সদস্যপদের ধারণায় সম্মত হলেও এর সুনির্দিষ্ট কাঠামো ২০২৭ সালের সম্মেলনে নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছেন। তবে ইইউর কয়েকটি সদস্যদেশ এ ধারণা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, আইনগতভাবে অস্পষ্ট এমন মর্যাদা অন্য দেশগুলোর কাছে ইইউর সদস্যপদ পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। জার্মানিসহ কয়েকটি দেশ সম্মেলনের ঘোষণার খসড়া থেকে এ শব্দবন্ধ বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স