|
| |
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

মাশরুম চাষ কি বাড়ছে, এটিই কি ব্যাঙের ছাতা?

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:৪৪ এএম
৩৫৮ পঠিত
মাশরুম চাষ কি বাড়ছে, এটিই কি ব্যাঙের ছাতা?
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবে যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা মাশরুমের মতো দেখতে 'ব্যাঙের ছাতা'কে অনেকে মাশরুম মনে করে থাকেন। গবেষকরা ব্যাখ্যা করেছেন বিষয়টা।

বাংলাদেশে মাশরুম গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, দেশে দেড়শর বেশি উপজেলায় মাশরুম চাষের জন্য চাষি ও উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে সারাদেশে এর চাষ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশা করা হচ্ছে।

গবেষকরা বলছেন, বাজারজাতকরণের সমস্যা আর রান্নার পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা না থাকার কারণে মাশরুম বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত জনপ্রিয়তা এখনো পায়নি।

যদিও ঢাকাসহ বড় শহরের ভালো মানের রেস্তোরাঁয় মাশরুমের নানা আইটেম বেশ জনপ্রিয়। আবার পিৎজ্জাসহ বিভিন্ন ধরনের ফাস্টফুডে মাশরুমের ব্যবহার ব্যাপক বেড়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থেই মাশরুমের উৎপাদন ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কতটা এমন প্রশ্নের জবাবে গবেষকরা বলছেন, মাশরুমের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র হলো- এর জন্য জমি, সার ও কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না।

আর এ কারণেই দেশে সাম্প্রতিককালে মাশরুমের বাণিজ্যিক চাষ যেমন বাড়ছে, তেমনি প্রতিনিয়তই চাষি ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে এ নিয়ে আগ্রহও বাড়ছে।

আবার কেউ কেউ চাষ শুরু করে বিভিন্ন সংকটের কারণে কয়েক বছর পর বন্ধ করে দিচ্ছেন এমন ঘটনাও ঘটছে।

ঢাকার সাভারে মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট দেশে মাশরুম চাষ সম্প্রসারণ ও চাষিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির উপপরিচালক ড. মো. ফেরদৌস আহমেদ বলছেন, দেশে এখন বছরে প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন মাশরুম উৎপাদিত হচ্ছে।

"আমরা একটি প্রকল্পের অধীনে ১৬০টি উপজেলায় চাষি কিংবা উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। তারা মাশরুম উৎপাদন ও বিপনন করবে। ফলে আশা করছি মাশরুম চাষ সামনে আরও জনপ্রিয়তা পাবে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

১৮ এপ্রিল ২০২৬কাসাভা উৎপাদন হচ্ছে দেশে কিন্তু বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কতটা৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩শরিফা কি বাজারের সবচেয়ে দামী ও সংবেদনশীল দেশি ফল?১০ অগাস্ট ২০২২End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বাংলাদেশের খুলনার ফুলতলা উপজেলার মাশরুম চাষি রফিকুল ইসলাম ২০১৮ সাল থেকে মাশরুম চাষ করছেন।

"ব্যাংকের সিকিউরিটির কাজ করতাম। পত্রিকায় নিউজ দেখে মাশরুম নিয়ে উৎসাহিত হয়েছিলাম। পরে বাড়ি এসে শুরু করি। এখন প্রতি মাসে তিন হাজার স্পন (যেখান থেকে মাশরুম উৎপন্ন হয়) উৎপাদন করি। প্রতিদিন গড়ে ১০ কেজি মাশরুম উৎপাদন হয় আমার ফার্মে। বাড়ির ৫ শতক জায়গায় শেড করে মাশরুম চাষ করছি। আমার সাথে আর দুজন কাজ করছেন এখানে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র হ্রাসকরণ প্রকল্পের 'অনন্য সম্ভাবনাময় ফসল মাশরুম' শীর্ষক বইতে বলা হয়েছে, এটি খাবার উপযোগী মৃতজীবি ছত্রাকের ফলন্ত অঙ্গ (ফ্রুটিং বডি), যা অত্যন্ত পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও ঔষধিগুণসম্পন্ন।

বইটিতে বলা হয়েছে, "ব্যাঙের ছাতা ও মাশরুম এক জিনিস নয়। বরং প্রাকৃতিকভাবে গজিয়ে ওঠা ছত্রাক হলো ব্যঙের ছাতা যা সাধারণত খাওয়ার অনুপযোগী, কিছু আবার বিষাক্তও বটে।"

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবে যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা মাশরুমের মতো দেখতে 'ব্যাঙের ছাতা'কে অনেকে মাশরুম মনে করে থাকেন।

ড. মো. ফেরদৌস আহমেদ বলছেন, মাশরুমের সুনির্দিষ্ট চাষ পদ্ধতি রয়েছে এবং এই চাষ পদ্ধতি খুবই সহজ।

"বাংলাদেশে ওয়েস্টার মাশরুম বেশি উৎপাদিত হয়, তবে এই জাতের মাশরুমেরও আবার কয়েকটা জাত আছে, যেগুলো ঋতু ভেদে কিংবা সারা বছর ধরে উৎপাদন করা সম্ভব," বলেছেন মি. আহমেদ।

মাশরুম চাষ প্রশিক্ষণের সাথে জড়িতরা বলছেন, ওয়েস্টার মাশরুম সারা বছর চাষ করা যায় এবং পদ্ধতি সহজ হওয়ায় ঘরে বসেই এর চাষ করা যায়। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় মাশরুম চাষের জন্য উপযোগী।

এছাড়া এটি চাষের জন্য উর্বর জমির প্রয়োজন হয় না এবং কোনো ধরনের সারেরও প্রয়োজন হয় না।

বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন

সাধারণত আট ধরনের মাশরুম দেখা যায়। যদিও মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট সাত ধরনের মাশরুম চাষের পরামর্শ দিচ্ছে। এর মধ্যে ওয়েস্টার ও কান জাতের মাশরুম সারা বছর চাষ করা যায়।

এছাড়া গ্রীষ্মকালে মিল্কি, স্ট্র ও ঋষি মাশরুম এবং শীতকালে বাটন ও শীতাকে জাতের মাশরুম চাষ করা যায়।

ড. ফেরদৌস আহমেদ বলছেন, কাঠের গুড়ি, ভুষি কিংবা ধানের খড় ব্যবহার করে মাশরুমের বীজ রোপণ করা যায়।

"গুড়ি, ভুষি বা খড় কেটে জীবাণুমুক্ত করে ব্যাগে স্পন বা বীজ মিশিয়ে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রাখা হয়। তিন সপ্তাহের মধ্যেই সাদা মাইসেলিয়াম বা মাশরুমের মূল ব্যাগে ছড়িয়ে পড়ে। মাইসেলিয়াম ছড়িয়ে পড়া ব্যাগগুলো আলো-বাতাসযুক্ত জায়গায় কিছুদিন রেখে পরিচর্যা করলেই মাশরুম বের হতে শুরু করে। সবমিলিয়ে ৪০ দিনের মধ্যেই মাশরুম ফলন পাওয়া যায়," বলছিলেন মি. আহমেদ।

মাশরুম নিয়ে গবেষণা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক আজিজুর রহমান। মি. রহমান বলছেন, "পুষ্টির দিক থেকে মাশরুম একটি সুপারফুড। কিন্তু সচেতনতা ও সহজলভ্যতার সংকটের কারণে এর সুফল আমরা নিতে পারছি না"।

"বাজারজাতকরণের সমস্যা, কুকিং মেথড (রান্নার পদ্ধতি) সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং নিরাপদ কি-না এই শঙ্কা থেকেও অনেকে মাশরুম নিয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারিভাবে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা প্রয়োজন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

আবার প্রযুক্তিগত দুর্বলতা থাকায় বিশেষ করে লোকাল ও প্রচলিত সাধারণ প্রযুক্তি বেশি ব্যবহার হওয়ায় বাংলাদেশে এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় মাশরুম উৎপাদন হচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি।

কয়েক বছর চাষ করে পরে সরে এসেছেন ওয়ালিউল মুক্ত নামে একজন উদ্যোক্তা। তিনি বলছেন, একদিকে বাজার ছোটো, আবার অন্যদিকে মাশরুমের জন্য যেই নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা দরকার সেটি বাংলাদেশে হয় না বলে আয় ধরে রাখাও কঠিন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে আশির দশকে জাপানি সংস্থা জাইকার সহযোগিতায় মাশরুম চাষ শুরু হয়েছিল। সরকারের একজন উপদেষ্টা থাইল্যান্ড থেকে বীজ এনে এখনকার হর্টিকালচার শাখায় দেওয়ার পর হর্টিকালচার সেন্টারে এর প্রথম চাষ শুরু হয়- এমন তথ্যও পাওয়া যায়।

এরপর জাপানি একজন বিশেষজ্ঞের নেতৃত্বে সোবহানবাগ হর্টিকালচার সেন্টার, সাভারে মাশরুম চাষ কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে জাপান দূতাবাসও সরাসরি এতে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়।

পরে ১৯৯৭-৯৮ সালে সরকার মাশরুম চাষ উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়ে রাঙামাটিতে প্রায় ৭.৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। এর আওতায় সেসময় ভারত থেকে দুটি জাতের মাশরুমের বীজ সংগ্রহ করে সেখানে দেওয়া হয়।

এরপর বিভিন্ন সময়ে সরকারের উদ্যোগে মাশরুম চাষ সম্পর্কে গবেষণা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হলে এ নিয়ে আগ্রহ বাড়তে থাকে।

মাশরুমের চাষকৃত স্পন প্যাকেট থেকে সদ্য তোলা মাশরুমই তাজা মাশরুম। তাজা, শুকনা ও পাউডার এই তিনভাবে মাশরুম খাওয়া হয়।

কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, তাজা মাশরুম বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে মজাদার অনেক খাবার তৈরি করা যায়। এটি অন্যান্য সবজির মতো এককভাবেও রান্না করা যায়, আবার যে কোন তরকারি বা সবজি, মাছ, মাংস, ডিম কিংবা নুডুলসের সাথে মিশিয়েও রান্না করা যায়।

এছাড়া মাশরুম সালাদ, মাশরুম স্যুপ, মাশরুম লাড্ডু, মাশরুম ভর্তা, মাশরুম পিঠা এবং মাশরুম চাও জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে।

ফেরদৌস আহমেদ বলছেন, বাংলাদেশের দামী রেস্তোরাঁগুলোতে ব্যবহৃত মাশরুম হলো বাটন মাশরুম এবং এগুলো বেশিরভাগই আমদানি করা হয়। তবে স্ট্রিট ফুডে ব্যাপকভাবে দেশে উৎপাদিত মাশরুম ব্যবহৃত হচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা