|
| |
শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

জলতলের প্রত্নরত্ন: একটি চিঠি ও ঢাকার কালে খাঁ কামান

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:১৫ এএম
১৯৪ পঠিত
জলতলের  প্রত্নরত্ন: একটি চিঠি ও ঢাকার কালে খাঁ কামান
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:

মোগল আমলের ঢাকাকে মসজিদের শহরের মতো কামানের শহর বললে অত্যুক্তি হবে কি? সে আমলে এই ঢাকায় নির্মিত হয়েছে নানা আকারের ও নানা ধরনের কামান, যার সাক্ষী ইতিহাসের পাতায় রয়েছে। ঢাকা ও তার আশপাশে নানা স্থানে মাটির নিচে অতীতের মতো এখনো মোগল বা সুলতানি আমলের অনেক কামান পাওয়া যায়। ঢাকার ইতিহাসপ্রেমীরা আজও দুটি কামানের কথা স্মরণ করেন—একটি মীর জুমলার বিবি মরিয়ম কামান, যা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে অবস্থান করছে, অন্যটি বুড়িগঙ্গায় তলিয়ে যাওয়া বড় আকারের কামান, কালে খাঁ কামান। এই নামও হয়তো অনেকেই শুনে থাকবেন।

১৭৭৪ সালের ৮ জানুয়ারি ঢাকা থেকে লন্ডনে ড. হকারওয়ার্থের কাছে ঢাকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক কর্মকর্তা মি. জে সি স্বাক্ষরিত একটি চিঠি যায়। ওই কর্মকর্তা চিঠিতে তাঁর পুরো নাম লেখেননি। তিনি চিঠিতে লেখেন:

‘এই শহরের বিপরীত দিকে আমাদের ফ্যাক্টরি থেকে দক্ষিণ–পশ্চিম দিকে প্রায় ১৫০ গজ দূরে একটি ছোট দ্বীপ (নদীর চর) রয়েছে; সেখানে পড়ে আছে এযাবৎ আমার দেখা সর্ববৃহৎ একটি যুদ্ধাস্ত্র (কামান) ও দুটি পাথরের বল। সেগুলোর আকার দেখে প্রতীয়মান হয়, সেগুলো ওই কামানেরই গোলা। এটি একটি অনন্যসাধারণ নির্মিত বস্তু, যা দীর্ঘকাল ধরে এভাবেই পড়ে রয়েছে। কামানটি এখানে কে এনেছিল বা সেটি কোথা থেকে এখানে আনা হয়েছিল, সে বিষয়ে এখানকার সবচেয়ে বয়স্ক লোকটিও কোনো তথ্য দিতে পারেননি। এটি নিশ্চয়ই আদি কামান আবিষ্কারের মতোই। প্রাচীন এই কামান প্রথম দর্শনে মনে হবে ঢালাই করে নির্মিত, কিন্তু এর মুখের অংশ ও চেম্বার পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে যে এটি কতগুলো দণ্ড ও লোহার আংটার মাধ্যমে সংযোজিত করে নির্মাণ করা হয়েছে। আমি সতর্কতার সঙ্গে এর পরিমাপ নিয়েছি এবং এর একটি ড্রয়িং প্রস্তুত করে আপনার কাছে পাঠিয়েছি। আপনি যদি এটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন ও সাধারণের কাছে তুলে ধরবার উপযোগী মনে করেন, তবে আমি আশা করি, তা জেন্টলম্যান ম্যাগাজিনে প্রকাশ করা যেতে পারে। আমার স্মরণ হয় যে লন্ডন টাওয়ারে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে প্রদর্শিত একইভাবে নির্মিত কিছু কামান দেখেছিলাম, কিন্তু সেগুলো এখানে প্রাপ্ত কামানের মতো সুনির্মিত নয়।’

মি. জে সি তাঁর চিঠির শেষ অংশে ঢাকার ধ্বংসপ্রাপ্ত বিলীয়মান মোগল স্থাপত্যের সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছেন। তিনি এই কামানের বিস্তারিত মাপ লিপিবদ্ধ করে এবং একটি সেকশনাল ড্রয়িং করে তা ম্যাগাজিনে প্রকাশ করার জন্য লন্ডনের ড. হকারওয়ার্থের কাছে পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠি, কামানটির পরিমাপ ও সেকশনাল ড্রয়িং ম্যাগাজিনটির ওই বছরের ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। দুঃখজনক যে মি. হকারওয়ার্থ তা দেখে যেতে পারেননি। কারণ, তা প্রকাশিত হওয়ার আগেই তিনি মারা যান। ধরে নেওয়া যায় যে তিনি মৃত্যুর আগে সেই চিঠি ও ড্রয়িং জেন্টলম্যান ম্যাগাজিনে প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছিলেন।

মি. জে সি তাঁর চিঠির শেষ অংশে ঢাকার ধ্বংসপ্রাপ্ত বিলীয়মান মোগল স্থাপত্যের সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছেন। তিনি এই কামানের বিস্তারিত মাপ লিপিবদ্ধ করে এবং একটি সেকশনাল ড্রয়িং করে তা ম্যাগাজিনে প্রকাশ করার জন্য লন্ডনের ড. হকারওয়ার্থের কাছে পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠি, কামানটির পরিমাপ ও সেকশনাল ড্রয়িং ম্যাগাজিনটির ওই বছরের ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। দুঃখজনক যে মি. হকারওয়ার্থ তা দেখে যেতে পারেননি। কারণ, তা প্রকাশিত হওয়ার আগেই তিনি মারা যান। ধরে নেওয়া যায় যে তিনি মৃত্যুর আগে সেই চিঠি ও ড্রয়িং জেন্টলম্যান ম্যাগাজিনে প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছিলেন। মি. জে সির পুরো নাম জানা সম্ভব হয়নি। ম্যাগাজিনে তাঁকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে কর্মরত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ১৭৭৪ সালের ঢাকার ইংলিশ ফ্যাক্টরির কর্মকর্তাদের তালিকা থেকে তাঁর পুরো নাম পাওয়া যেতে পারে।

মি. জে সির চিঠিতে উল্লেখিত কামানটির বহুল প্রচলিত নাম কালে খাঁ কামান। এ নামের উৎস জানতে পারিনি। লেখক মুনতাসীর মামুন তাঁর একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন, এই কামানের নামকরণ কে করেছিল জানা যায়নি, লোকমুখে এই নাম প্রচলিত ছিল। সেই যুগে ঢাকায় কর্মরত কয়েকজন ব্রিটিশ সিভিলিয়ান কর্মকর্তার লেখায় এই কামানের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন ভারতের সার্ভেয়ার জেনারেল বিখ্যাত জেমস রেনেল, কর্মকর্তা রবার্ট লিন্ডসে এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকার বিখ্যাত কালেক্টর ও চিত্রশিল্পী চার্লস ডি-অয়লি। অবশ্য তাঁরা কালে খাঁর নামটি উল্লেখ করেননি। আমার সদ্যপ্রাপ্ত মি. জে সির পত্রটি কিছু কারণে অন্যান্য বর্ণনার চেয়ে অগ্রগণ্য মনে হয়। এটি এই বিষয়ে প্রথম প্রকাশিত ডকুমেন্ট। তিনি এখানে নানা পরিমাপের সঙ্গে প্রথম একটি ড্রয়িং সংযুক্ত করেছেন। বিষয়টি তিনি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন যে তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত করার উদ্দেশ্যে বিখ্যাত জেন্টলম্যান ম্যাগাজিনে প্রকাশের জন্য সব তথ্য ও ড্রয়িং লন্ডনে ড. হকারওয়ার্থের কাছে পাঠিয়েছিলেন।

১৭৮৮ সালে প্রকাশিত জেমস রেনেলের বই মেমোয়ার অব আ ম্যাপ অব হিন্দুস্তান অর দ্য মুঘল এম্পায়ার এবং ১৮৪০ সালে প্রকাশিত রবার্ট লিন্ডসের বই এনেকডটস অব ইন্ডিয়ান লাইফ—এই দুটি বইয়ে লেখকদ্বয় কালে খাঁ কামানের বর্ণনা করেছেন। ১৭৭৪ সালে মি. জে সির লেখা বর্ণনা, বিশেষ করে তাঁর ড্রয়িং কামানটির প্রকৃত অবয়ব বুঝতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। কোনো বস্তুর পূর্ণ অবয়বের পর্যাপ্ত পরিমাপ থাকা সত্ত্বেও শুধু পরিমাপের ওপর নির্ভর করে প্রকৃত অবয়ব নির্মাণ করা প্রায় অসম্ভব। কারণ, তথ্য দিয়ে বাহ্যিক কাঠামোর ত্রিমাত্রিক ধারণা পাওয়া গেলেও তার অবয়ব নির্মাণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন কিছু দৃশ্যমান ড্রয়িং।

রেনেল ও লিন্ডসে কামানটির দৈর্ঘ্যসহ নানা অংশের মাপ ও ওজনের বর্ণনা দিয়েছেন। লিন্ডসে উল্লেখ করেছেন, কামানটির দৈর্ঘ্য ৩৪ ফুট। কিন্তু রেনেল ও মি. জে সির বর্ণনায় কামানটির দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ২২ ফুট সাড়ে ১০ ইঞ্চি ও ২২ ফুট ৬ ইঞ্চি। দুজনের পরিমাপ কাছাকাছি হওয়ায় আমরা ধরে নিতে পারি, কামানটির দৈর্ঘ্য ২২ ফুটের কিছু বেশি। কালেক্টর চার্লস ডি’ অয়লি তাঁর অ্যান্টিকুইটিজ অব ঢাকা বইতে রেনেলের বর্ণিত পরিমাপই উল্লেখ করেছেন। তাহলে আপাতত তিন ব্যক্তিকে পাওয়া যাচ্ছে, যাঁরা কামানটির পরিমাপ নিজেরাই সংগ্রহ করেছিলেন।

রেনেল ও লিন্ডসে কামানটির দৈর্ঘ্যসহ নানা অংশের মাপ ও ওজনের বর্ণনা দিয়েছেন। লিন্ডসে উল্লেখ করেছেন, কামানটির দৈর্ঘ্য ৩৪ ফুট। কিন্তু রেনেল ও মি. জে সির বর্ণনায় কামানটির দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ২২ ফুট সাড়ে ১০ ইঞ্চি ও ২২ ফুট ৬ ইঞ্চি। দুজনের পরিমাপ কাছাকাছি হওয়ায় আমরা ধরে নিতে পারি, কামানটির দৈর্ঘ্য ২২ ফুটের কিছু বেশি। কালেক্টর চার্লস ডি’ অয়লি তাঁর অ্যান্টিকুইটিজ অব ঢাকা বইতে রেনেলের বর্ণিত পরিমাপই  উল্লেখ করেছেন। তাহলে আপাতত তিন ব্যক্তিকে পাওয়া যাচ্ছে, যাঁরা কামানটির পরিমাপ নিজেরাই সংগ্রহ করেছিলেন।

মি. জে সি ১৭৭৪ সালে ঢাকায় কর্মরত ছিলেন এবং সে সময় কামানটির পরিমাপ নিয়েছিলেন। রেনেল ও লিন্ডসে ঢাকায় আসেন ১৭৭৬ সালে; ধরে নিতে পারি তাঁরা সেই বছর বা তার পরে কোনো এক সময় কালে খাঁ কামানের পরিমাপ লিপিবদ্ধ করেছিলেন। অর্থাৎ এ পর্যন্ত জানা তথ্য অনুসারে, মি. জে সিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি সর্বপ্রথম কালে খাঁ কামানের পরিমাপ নিয়েছিলেন এবং ছবি এঁকেছিলেন। তাঁর মতো বিশদ পরিমাপ ও ছবি আর কেউ দেননি। তা ছাড়া তিনি তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেছেন যে তিনি কামানটির পরিমাপ নিয়েছেন সতর্কতার সঙ্গে। এসব কারণে আমি ব্যক্তিগতভাবে মি. জে সির পরিমাপটি গ্রহণ করতে আগ্রহী।

কালে খাঁ কামানটি যে বুড়িগঙ্গা নদীর একটি দ্বীপে পড়ে ছিল এবং দ্বীপটির ভাঙনের ফলে সেটি বুড়িগঙ্গায় তলিয়ে গিয়েছিল, প্রায় সবাই তা উল্লেখ করেছেন। রবার্ট লিন্ডসের মাধ্যমে জানতে পারি, ১৭৮০ সালে কামানটি নদীতে তলিয়ে যায়। লিন্ডসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনি এবং কোরি নামে তাঁর এক বন্ধু, যিনি যান্ত্রিক প্রকৌশল বিষয়ে দক্ষ ছিলেন, তাঁরা পরিকল্পনা করেছিলেন, দুজনে মিলে একটি নৌকা তৈরি করবেন এবং সে নৌকায় করে কামানটি কলকাতায় নিয়ে যাবেন। কিন্তু তাঁরা সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি, তার আগেই তাঁদের ঢাকা ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত ওপরওয়ালা বা প্রশাসনের অবহেলায় এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রত্নসম্পদ হারিয়ে যাওয়ায় লিন্ডসে আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন।

জেমস রেনেলের পরিমাপ ব্যবহার করে আমি কালে খাঁ কামানের একটি সম্ভাব্য ত্রিমাত্রিক অবয়ব নির্মাণ করেছিলাম। ২০০৬ সালে প্রথম আলোর ঈদসংখ্যায় ‘জলতলের প্রত্নরত্ন’ শিরোনামে আমার এক নিবন্ধে সেটি প্রথম প্রকাশিত হয়। একই পত্রিকার ২০১৯ সালের ঈদসংখ্যা ‘ঢাকার কামান’ নিবন্ধেও সেটি ব্যবহার করেছি। কিন্তু সেটি ছিল শুধু রেনেলের লিখিত পরিমাপের ওপর নির্ভর করে আমার আঁকা ড্রয়িং। মি. জে সির বিস্তারিত পরিমাপ ও সেকশনাল ড্রয়িং অবলম্বন করে আমি কালে খাঁ কামানের আবার অবয়ব তৈরি করেছি। আশা করছি, এটিই কামানটির প্রকৃত অবয়ব। সেটি এই লেখায় সংযুক্ত করেছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত বিবি মরিয়ম কামানের আকার আমাদের বিস্মিত করে। কালে খাঁ কামান বিবি মরিয়ম কামানের দ্বিগুণের বেশি দৈর্ঘ্যের এক অনন্য প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ, যেটি এখনো বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশে রয়ে গেছে। কামানটি কীভাবে উত্তোলন করা যেতে পারে, তার সম্ভাব্য একটি প্রক্রিয়া নিয়ে অন্যত্র লিখেছি।

সন্দেহ নেই, কালে খাঁ উদ্ধার হলে সেদিনের পত্রলেখক মি. জে সির মতো ঢাকাবাসীর জন্যও তা হবে বিস্ময়–জাগানিয়া ও গৌরবময় ইতিহাসের স্মারক বিশেষ।

শামীম আমিনুর রহমান: গবেষক, সংগ্রাহক ও স্থপতি

সূত্র: প্রথম আলো