সৃজনশীল হতে চাইলে এই কৌশল কাজে লাগতে পারে
গণমাধ্যম ডেক্স
সারা দিন পড়াশোনা বা কাজ করে ক্লান্ত লাগছে? কোনো নতুন আইডিয়া বা সৃজনশীল কাজের উপায় খুঁজছ, কিন্তু মাথা কাজ করছে না? তাহলে এ কৌশল তোমার জন্য। একটু বিরতি নিয়ে হাতের মুঠোয় হালকা কিছু ধরে সামান্য সময় ঘুমিয়ে দেখতে পারো। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এই হালকা ঘুম তোমার মাথায় নতুন বুদ্ধি ও সৃজনশীল আইডিয়া এনে দিতে পারে।
হাতে ভারী কিছু নিয়ে ঘুমালে কি আসলেই সৃজনশীলতা বাড়ে
ইন্টারনেটে প্রচলিত আছে, টমাস এডিসন, টেসলা, আইনস্টাইন ও সালভাদর দালির মতো বিখ্যাত মানুষেরা হাতে ভারী কিছু নিয়ে ঘুমাতে যেতেন। ঘুমের সময় হাতে কোনো জিনিস ধরে রাখলে তা যখন মেঝেতে পড়ে শব্দ হতো, তখন তাঁদের ঘুম ভেঙে যেত। ফলে তাঁদের ঘুমের মধ্যে যে অদ্ভুত সব স্বপ্ন বা অবচেতন মনের ভাবনাগুলো দেখত, সেগুলো পুরোপুরি ভুলে যাওয়ার আগেই মনে রাখতে পারত। তবে ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে কেবল চিত্রশিল্পী সালভাদর দালিই নিয়মিত এ নিয়ম মেনে চলতেন। বর্তমান যুগের বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, সালভাদর দালির এই অদ্ভুত অভ্যাসের পেছনে সত্যিই বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক কারণ রয়েছে।
শিল্পের কারুকার্য নিয়ে লেখা ‘ফিফটি সিক্রেট অব ম্যাজিক ড্রাফটসম্যানশিপ’ বইয়ে সালভাদর দালি চাবি নিয়ে ঘুমানোর একটি পদ্ধতির কথা বলেছেন। এতে একটি শক্ত চেয়ার, একটি ভারী চাবি আর নিচে রাখা প্লেটের প্রয়োজন হয়। ঘুমের ঘোরে হাত থেকে চাবি পড়ে শব্দ হলে মানুষ জেগে ওঠে। দালির মতে, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এই ঘুম থেকেও দারুণ সব সৃজনশীল ধারণা পাওয়া সম্ভব।

বিজ্ঞান কী বলছে
এই অভ্যাসের পেছনে রয়েছে স্নায়ুবিজ্ঞানের দারুণ এক ভিত্তি, যা জড়িত ‘এন১’ (N1) নামের ঘুমের প্রথম স্তরের সঙ্গে। এটি হলো নন-আরইএম (non-REM) ঘুমের সবচেয়ে হালকা পর্যায়। এই সময়ে শরীরের পেশিগুলো ঢিলে হয়ে যায় এবং মস্তিষ্ক সাম্প্রতিক নানা অভিজ্ঞতার কথা দিয়ে অদ্ভুত সব স্বপ্ন তৈরি করতে শুরু করে। যাঁরা এই পর্যায় থেকে জেগে ওঠেন, তাঁরা প্রায়ই বলেন যে তাঁরা আসলে ঘুমানইনি। অথচ এই সামান্য সময়ে ঘটে যাওয়া ‘মাইক্রোড্রিম’ বা অতি ক্ষুদ্র স্বপ্নগুলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জটিল সব দৃশ্য তৈরি করে ফেলতে পারে।
বিজ্ঞানীরা ভেবে দেখলেন, এই হালকা ও ভাসমান মানসিক অবস্থা কি মানুষের সৃজনশীলতা বাড়াতে পারে? তারা ‘নারকোলেপ্সি’ নামের একটি ঘুমের ব্যাধির ওপর গবেষণা করে দেখলেন, এই সমস্যায় ভোগা মানুষেরা সৃজনশীলতার নানা পরীক্ষায় অন্যদের চেয়ে অনেক ভালো ফল করেছে।

পরীক্ষা ও ফলাফল
গবেষকেরা বিষয়টি সরাসরি পরীক্ষা করার জন্য একটি গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে দিলেন, যার একটি গোপন শর্টকাট বা সংক্ষিপ্ত পথ ছিল। যাঁরা ৩০ বারের মধ্যেও সেটি বের করতে পারেননি, তাঁদের একটি অন্ধকার ঘরে ২০ মিনিট বিশ্রাম নিতে বলা হলো। এ সময় তাঁদের হাতে একটি প্লাস্টিকের বোতল ধরিয়ে দেওয়া হলো, যাতে ঘুমিয়ে পড়লেই বোতলটি হাত থেকে পড়ে যায়।
গবেষণায় দেখা গেল, হালকা ঘুমের ‘এন১’ পর্যায়ে যাওয়ার পর যাঁদের হাত থেকে বোতল পড়ে গিয়েছিল এমন ২৪ জনের মধ্যে ২০ জনই (৮৩ শতাংশ) সেই গোপন শর্টকাটটি খুঁজে বের করতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে যাঁরা জেগেই ছিলেন, তাঁদের ৫৯ জনের মধ্যে মাত্র ১৫ জন (৩০ শতাংশ) সেটি বের করতে পেরেছিলেন। এই হালকা ঘুমে মাত্র ১৫ সেকেন্ড থাকাটাও দারুণ কাজ করেছিল। তবে কেউ যদি একদম গভীর ঘুমে চলে যেত, তবে আর এই সুবিধা পাওয়া যেত না।
তবে সালভাদর দালির বর্ণনার মতো ঘুম ভেঙে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই কেউ কোনো ম্যাজিক আইডিয়া পেয়ে যান বিষয়টি তেমন নয়। যাঁরা ঘুমিয়েছিলেন, তাঁদের সমস্যাটি সমাধান করতে আরও বেশ কয়েকবার চেষ্টা করতে হয়েছিল। ঘুমের ভেতর তাঁরা সরাসরি অঙ্কটি নিয়ে ভেবেছিলেন এমনও নয়। এন১ পর্যায় থেকে জেগে ওঠা এবং হঠাৎ মাথা কাজ করার এ সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি রহস্যময়। কেন ঘুম ভেঙে যাওয়ার ঠিক পরপরই আমরা সবচেয়ে সৃজনশীল হয়ে উঠি, তার উত্তর খুঁজতে এখনো গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) গবেষকেরা।
সূত্র: পপুলার সায়েন্স
সূত্র: প্রথম আলো