নিউগিনি প্রকল্পে হামলা: ধরা পড়েনি হামলার ‘সমন্বয়ক’ যুবরাজ
গণমাধ্যম ডেক্স
রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজ লিমিটেডের প্রকল্পে হামলার এক মাস পেরিয়ে গেছে। তবে এ হামলার অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে তদন্তে চিহ্নিত হওয়া মো. যুবরাজকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মিরপুরের ‘দুটি সন্ত্রাসী বাহিনী’র সদস্যদের নিয়ে হামলার সমন্বয় করেন ভাষানটেক থানা বিএনপির আহ্বায়ক মো. ইব্রাহিম ওরফে ‘কিলার’ ইব্রাহিমের বাহিনীর সদস্য যুবরাজ। ইব্রাহিমের হয়ে মিরপুর এলাকায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত তিনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, হামলার দিন দুপুরে ইসিবি চত্বরের একটি খাবারের দোকানে বসে ১৩ জন হামলার বিষয়ে পরিকল্পনা করেন। এ সময় মামলার এক নম্বর আসামি শাহরিয়ার মাহমুদ মো. ইব্রাহিমের সঙ্গে যোগাযোগ করে হামলার জন্য এক কোটি টাকার চুক্তি করেন। পরে ইব্রাহিম লোকজন সংগ্রহ করে হামলার দায়িত্ব দেন যুবরাজকে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে নিউগিনি প্রপার্টিজের আবাসন প্রকল্পে হামলা চালানো হয়। এ সময় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতেও ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। ঘটনার রাতেই হামলার বিবরণ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন সালমান। এরপর ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, হামলায় জড়িত আরও ৯ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। হামলার পরিকল্পনা ও সরাসরি অংশ নেওয়ার অভিযোগে এ পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আটজন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির গুলশান বিভাগের পরিদর্শক জেহাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, হামলায় শতাধিক ব্যক্তি অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অনেককে শনাক্ত করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে নিউগিনি প্রপার্টিজের আবাসন প্রকল্পে হামলা চালানো হয়। এ সময় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতেও ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। ঘটনার রাতেই হামলার বিবরণ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন সালমান। এরপর ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
এক কোটি টাকার চুক্তিতে সন্ত্রাসী বাহিনী

নিউগিনি আবাসন প্রকল্পে হামলার জন্য এক কোটি টাকা দিয়ে সন্ত্রাসী বাহিনী ভাড়া করার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, ভাষানটেক থানা বিএনপির আহ্বায়ক মো. ইব্রাহিম টাকার বিনিময়ে লোকজন পাঠিয়ে হামলা করান। এতে মিরপুরের মামুন বাহিনীর সদস্যদেরও যুক্ত করা হয়েছিল।
এ হামলা মামলায় গ্রেপ্তার শাহরিয়ার মাহমুদ ও বিকাশ চন্দ্র সরকারকে জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, ইসিবি চত্বরের একটি খাবারের দোকানে বসে হামলার পরিকল্পনা করার সময় শাহরিয়ার ও বিকাশ উপস্থিত ছিলেন। শাহরিয়ার মাহমুদ বর্তমানে জামিনে আছেন।
৩ নভেম্বর সরেজমিনে দেখা যায়, নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের ভেতরে কয়েকটি ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। শ্রমিকেরা কাজ করছেন। তবে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওটি এখনো মেরামত করা হয়নি। জিনিসপত্র মেঝেতে এলোমেলোভাবে পড়ে আছে।
ঢাকার মহাখালীর এসকেএস টাওয়ারের স্টার সিনেপ্লেক্সে ৩১ অক্টোবর একটি সিনেমার বিশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে সালমান মুক্তাদির বলেন, তিনি আর বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবেন না।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, হামলা করে ফটক ভেঙে চলাচলের রাস্তা বের করে দেওয়ার দায়িত্ব শাহরিয়ারকে দেওয়া হয়। এ কাজের জন্য তাঁকে উপহার হিসেবে ওই জমিতে যে ভবন করার কথা, সেটির একটি ফ্ল্যাট উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল মহিউদ্দিন চৌধুরীর। এ ছাড়া ভবন তৈরিতে ইট-বালু সরবরাহের কাজও তাঁকে দেওয়ার কথা ছিল।
ফ্ল্যাট উপহারের ‘প্রতিশ্রুতি’

প্রকল্পসংলগ্ন ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি হামলার তদন্তে উঠে এসেছে। এ জমি থেকে বের হওয়ার জন্য নিউগিনি প্রকল্পের রাস্তা ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে বিরোধ রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ৩৫ কাঠার মধ্যে মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীরও জমি আছে। তিনি এ জমিতে কন্ডোমিনিয়াম তৈরির চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু জমি থেকে চলাচলের কোনো রাস্তা নেই। সেখানে আবাসিক ভবন করে কোনো লাভ হবে না যদি নিউগিনি প্রকল্পের মালিক চলাচলের জন্য রাস্তা না দেন। তাই নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের মূল ফটক ভেঙে চলাচলের রাস্তা বের করতেই এ হামলার পরিকল্পনা করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, হামলা করে ফটক ভেঙে চলাচলের রাস্তা বের করে দেওয়ার দায়িত্ব শাহরিয়ারকে দেওয়া হয়। এ কাজের জন্য তাঁকে উপহার হিসেবে ওই জমিতে যে ভবন করার কথা, সেটির একটি ফ্ল্যাট উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল মহিউদ্দিন চৌধুরীর। এ ছাড়া ভবন তৈরিতে ইট-বালু সরবরাহের কাজও তাঁকে দেওয়ার কথা ছিল।
এ হামলার মামলায় মহিউদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাঁকে রিমান্ডে নিয়েছিল পুলিশ। পরে তিনি জামিন পান।
প্রকল্পমালিককে হত্যার হুমকির অভিযোগ
হামলার ঘটনার পর এবার নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের মালিক মো. নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়াকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাঁর দাবি, তাঁকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন জানিয়ে নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘জামিনে বেরিয়ে আসামিরা হুমকি দিচ্ছে। আবার বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। আমি জীবন নিয়ে শঙ্কায় রয়েছি।’ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন দাবি করে তিনি বলেন, তিনি একজন ব্যবসায়ী। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁকে বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে মামলা দেওয়া হয়েছিল। এখন ফ্যাসিস্ট আখ্যা দিয়ে মামলা দেওয়া হচ্ছে।
সূত্র: প্রথম আলো