হাত পাতবেন না বকুল আলী
গণমাধ্যম ডেক্স
২৭ অক্টোবর। রাজধানীর হাতিরঝিলের মধুবাগ সেতু থেকে মীরবাগের দিকে সড়কে অটোরিকশার ভিড়ের মধ্যে প্যাডেলচালিত রিকশা নিয়ে মগবাজারের দিকে এগোচ্ছিলেন বকুল আলী। কথা বলতে চাইলে হাসিমুখে বললেন, ‘বলেন, বলেন, কী কথা।’
রিকশা রাস্তার পাশে রেখে চালকের আসনে বসলেন। মাথার চুল সাদা, বুক পর্যন্ত নেমেছে লম্বা সাদা দাড়ি। পরনে মলিন বাদামি শার্ট, বুকপকেটের ওপরটা খানিক ছেঁড়া। ছবি তোলার কথা বলতেই রাজি হলেন। মুঠোফোনে নিজের ছবি দেখে বললেন, ‘ভালোই হইছে।’
বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জে। বয়স জানতে চাইলে বললেন, ৭৭ বছর। চেহারায় বয়সের ছাপ থাকলেও দেখে ততটা মনে হয় না। সে কথা বলতেই হাসলেন, কিছু বললেন না।
এই বয়সে রিকশা চালানোর মতো পরিশ্রমের কাজ কেন করেন, জানতে চাইলে বকুল আলী বললেন, ‘এইডাই পারি। মাইনষের কাছে যেন হাত না পাতি, এই জন্য কর্ম করি। আল্লাহ যে কয় ট্যাকা মিলায়, এইটা লাখ লাখ শুকুর।’
বয়স জানতে চাইলে বললেন, ৭৭ বছর। চেহারায় বয়সের ছাপ থাকলেও দেখে ততটা মনে হয় না। সে কথা বলতেই হাসলেন, কিছু বললেন না।
দিনের হিসাব
সেদিন সকালে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে মগবাজারে একজন যাত্রী নামিয়ে পেয়েছিলেন ৯০ টাকা। এরপর রিকশার কলকবজা বিগড়ে যায়। মধুবাগের এক গ্যারেজে মেরামতের ফাঁকে দুপুরের খাবার সেরে আবার রাস্তায় নামেন। মেরামতের খরচ রিকশামালিকের। বেলা তিনটায় আলাপের সময়ও দিনের আয় ১০০ টাকা ছাড়ায়নি।
রিকশার মালিককে সারা দিনের ভাড়া দিতে হয় ১০০ টাকা। গ্যারেজের মেসে থাকা আর দুপুর-রাতের খাবারে যায় ২০০ টাকা। নাশতা আর অন্যান্য খরচ মিলিয়ে আরও প্রায় ৫০ টাকা। অর্থাৎ দিনে সাড়ে তিন শ টাকা আয় না হলে চলে না। সাধারণত দিনে ৬০০–৭০০ টাকা আয় হয়।
মধুবাগের এক গ্যারেজে মেরামতের ফাঁকে দুপুরের খাবার সেরে আবার রাস্তায় নামেন। মেরামতের খরচ রিকশামালিকের। বেলা তিনটায় আলাপের সময়ও দিনের আয় ১০০ টাকা ছাড়ায়নি।

অটোর ভিড়ে প্যাডেল
যাত্রী কমে যাওয়ার কথা বলতে গিয়ে বকুল আলী বললেন, ‘বর্তমান বড় খারাপ অবস্থা। এই গাড়িতে মানুষ একটু কম চড়ে। তার উপ্রে বুড়া মানুষ দেখলি আরও কম উঠে।’
তাহলে অটোরিকশা কেন চালান না? তাঁর জবাব, ‘অটো চালালি হুট করি রাস্তাঘাটে পুলিশ ধরে। ১২০০ টাকা জরিমানা করে। আমি ২০০ ট্যাকা মারবের পারি না, ১২০০ ট্যাকা দিব কোথা থেকে।’
বকুল আলী ঢাকায় এসেছেন পাকিস্তান আমলে, কৈশোরে। তখন থেকেই রিকশা চালান, শুরু থেকেই এখনকার হাতিরঝিল এলাকার গ্যারেজ থেকে। একসময় যে পথে এক টাকায় যাত্রী নিতেন, সেই পথের ভাড়া এখন ২০-২৫ টাকা। ভাড়া বেড়েছে, কিন্তু খরচ বাদ দিয়ে হাতে থাকে সামান্যই।
তাই একটানা ১৫-২০ দিন ঢাকায় থাকেন। পাঁচ-ছয় হাজার টাকা জমলে ফিরে যান গ্রামে, সেখানে টুকটাক কাজ করেন। টাকা ফুরালে আবার ঢাকায় আসেন। গ্রামে তাঁর দুই বিঘা জমি আছে, তবে তাতে তেমন ফসল হয় না। কথা বলে বোঝা গেল, এগুলো পতিত জমি। প্রথম ঢাকায় আসার পর থেকে এভাবেই চলছে তাঁর জীবন।
শরীরের বয়স বেড়েছে, প্যাডেলচালিত রিকশার যাত্রী কমেছে, দিনের খরচের হিসাবও মাথার ওপর। তবু কারও কাছে হাত না পেতে নিজের খরচ নিজেই চালাতে চান বকুল আলী।

‘আমগো জীবন আমগোর’
বকুল আলীর দুই ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, ছেলেরাও আলাদা সংসার পেতেছেন। বড় ছেলে ঢাকায় থাকেন, তবে কোথায় থাকেন, বাবা জানেন না। ছেলে বাড়িতে গেলে মাঝেমধ্যে দেখা হয়। গ্রামের বাড়িতে বকুল আলীর স্ত্রী থাকেন। ছেলেরা খোঁজখবর নেন কি না, জানতে চাইলে অভিমানী কণ্ঠে বললেন, ‘ছেলেরা কয়, বড় করছ, এখন আমগো জীবন আমগোর।’
শরীরের বয়স বেড়েছে, প্যাডেলচালিত রিকশার যাত্রী কমেছে, দিনের খরচের হিসাবও মাথার ওপর। তবু কারও কাছে হাত না পেতে নিজের খরচ নিজেই চালাতে চান বকুল আলী।সেদিন বিকেল পর্যন্ত দিনের খরচও ওঠেনি, উঠবে কি না, তারও নিশ্চয়তা নেই। তবু কথা বলতে বলতে হাসছিলেন তিনি।
সূত্র: প্রথম আলো