|
| |
শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

কী ঘটেছিল ৭ নভেম্বর

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:৩৬ পিএম
২৬৪ পঠিত
কী ঘটেছিল ৭ নভেম্বর
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ এক রক্তাক্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সেনানিবাসে সিপাহি বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে মাত্র চার দিনের ব্যবধানে পাল্টে যায় রাষ্ট্রক্ষমতা ও সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের সমীকরণ। গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। পতন ঘটে ৩ নভেম্বর...
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ এক রক্তাক্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সেনানিবাসে সিপাহি বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে মাত্র চার দিনের ব্যবধানে পাল্টে যায় রাষ্ট্রক্ষমতা ও সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের সমীকরণ। গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। পতন ঘটে ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানের। তবে এই পালাবদলের মধ্যেই নিহত হন খালেদ মোশাররফ, কর্নেল এ টি এম হায়দার ও কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর থেকেই দেশে রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা চলছিল। রাষ্ট্রক্ষমতা এবং সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সামরিক কর্মকর্তাদের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধ ক্রমেই তীব্র হচ্ছিল। সেই সংঘাতের ধারাবাহিকতায় নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঘটে একের পর এক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান। যার সবচেয়ে বড় বাঁক আসে ৭ নভেম্বর। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও জাতীয় চার নেতা হত্যা ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। এ সময় সেনাবাহিনীর একদল কর্মকর্তা বঙ্গভবনে অবস্থান করছিলেন। সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ও রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের মধ্যে ৩ নভেম্বর ভোরে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান ঘটে। এতে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি হন। একই দিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে। অভ্যুত্থানের পর খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেন। রাষ্ট্রপতি হন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। অন্যদিকে, ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা দেশ ছাড়েন। সেনানিবাসে অসন্তোষ, সিপাহি বিদ্রোহ ও ৭ নভেম্বর ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সহযোগী সংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। সংগঠনটির নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহের। সেনাসদস্যদের মধ্যে প্রচারপত্র বিলি, কর্মকর্তাদের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে স্লোগান এবং সেনাবাহিনীর প্রচলিত কাঠামো পরিবর্তনের দাবি জোরালো হতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ৬ নভেম্বর দিবাগত রাতে, ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে সেনানিবাসে শুরু হয় সিপাহি বিদ্রোহ। বিদ্রোহী সৈনিকেরা জিয়াউর রহমানের বাসভবনে গিয়ে তাকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করেন। সেনানিবাসে তখন ‘সিপাহি-সিপাহি ভাই ভাই’ এবং ‘জেনারেল জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’ স্লোগান শোনা যায়। পরে তাকে সেনানিবাসের একটি মেসে নিয়ে যাওয়া হয়। এই বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের অবসান ঘটে। সেনাবাহিনীর ক্ষমতার সমীকরণে আবারও বড় পরিবর্তন আসে। খালেদ মোশাররফসহ তিন কর্মকর্তা নিহত ৭ নভেম্বরের সবচেয়ে রক্তাক্ত ঘটনা ছিল তিন সেনা কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ড। বিদ্রোহের খবর ছড়িয়ে পড়লে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, কর্নেল এ টি এম হায়দার ও কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা বঙ্গভবন ছেড়ে শেরেবাংলা নগরের ১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে আশ্রয় নেন। সেখানে একপর্যায়ে তাদের হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও গভীর করে এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। তবে মুক্তির পর ৮ নভেম্বর থেকে জিয়াউর রহমান সেনানিবাসে সৈনিকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে শুরু করেন। বিভিন্ন সমাবেশে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন। বিকেলে চতুর্থ বেঙ্গলের লাইনের কাছে ঢাকা সেনানিবাসের সৈনিকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন তিনি। সে সময় সেনানিবাসের অধিকাংশ সৈনিক ছিলেন সশস্ত্র। জিয়াউর রহমান দৃঢ়কণ্ঠে তাদের অস্ত্র জমা দিয়ে নিজ নিজ ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সৈনিকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেন।  জিয়াউর রহমান ও আবু তাহেরের দ্বন্দ্ব জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও আবু তাহেরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও মুক্তির পরপরই তাদের সঙ্গে জিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থানের বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সেনাবাহিনীতে কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব কমানো, সৈনিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ ১২ দফা দাবি উত্থাপন করে। অন্যদিকে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রচলিত কাঠামো, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নেন। ফলে যে বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান মুক্তি পেয়েছিলেন, সেই বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান সংগঠক আবু তাহেরের সঙ্গে তার সম্পর্ক দ্রুত সংঘাতের দিকে গড়ায়। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন। আর আবু তাহেরকে ১৯৭৬ সালে সামরিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য নিয়ে মতভেদ ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনো মতভেদ রয়েছে। বিএনপি দিনটিকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করে। দলটির ভাষ্য, এই দিনেই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে নতুন রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত হয়। অন্যদিকে, কেউ দিনটিকে ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে দেখেন। আবার ইতিহাসের অন্য ব্যাখ্যায় এটি সিপাহি বিদ্রোহ কিংবা এক সামরিক অভ্যুত্থানের বিপরীতে আরেক সামরিক শক্তির উত্থান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নভেম্বরে এই পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রভাবমুক্ত হয়ে শক্তিশালী সত্তা লাভ করে। গণতন্ত্র অর্গলমুক্ত হয়ে অগ্রগতির পথে এগিয়ে যায়। এ দিন থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকে ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করছে বিএনপি। বিএনপি সরকারের আমলে এ দিনটিতে ছিল সরকারি ছুটি। তবে আওয়ামী লীগের শাসনামলে গত দেড় দশকেরও বেশি সময় দিবসটি স্বাচ্ছন্দ্যে উদযাপন করতে পারেনি বিএনপি। ২০২৬ সালে সরকার গঠনের পর এবারই দিনটিকে নানা আয়োজনের মাধ্যমে পালন করছে বিএনপি। 

সূত্র: কালবেলা