বহুলপ্রতীক্ষিত রামায়ণ সিনেমার পৌরাণিক সাজপোশাকে কেমন হলো রণবীর, সাই পল্লবী, যশ, কাজল, রাকুলপ্রীত, লারার এপিক লুক
গণমাধ্যম ডেক্স
আলোচনার তুঙ্গে এখন বিশাল বাজেট ও সময় নিয়ে তৈরি এপিক সিনেমা রামায়ণ-এ রণবীর কাপুর, সাই পল্লবী, যশ, কাজল, রাকুলপ্রীত, লারা দত্তের পোরাণিক সাজপোশাকের লুক।
নীতেশ তিওয়ারির বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমা ‘রামায়ণ: পার্ট ১’ নিয়ে দর্শকের আগ্রহের শেষ নেই। রাম, সীতা, রাবণ থেকে শুরু করে মন্দোদরী, কৈকেয়ী ও হনুমান, প্রতিটি চরিত্রের সাজসজ্জা নিয়েও চলছে আলোচনা। শুধু পোশাক নয়, চরিত্রগুলোর গয়না, চুলের সাজ ও মেকআপেও রাখা হয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা। প্রায় তিন বছরের প্রস্তুতি, গবেষণা ও নকশার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে সিনেমাটির এই বিশাল সাজসজ্জার আয়োজন।


সিনেমার প্রধান পোশাকের দায়িত্বে রয়েছেন ভারতের জনপ্রিয় ডিজাইনার জুটি রিম্পল ও হারপ্রীত নারুলা। ‘পদ্মাবত’ ও ‘হীরামান্ডি’র মতো কাজের জন্য পরিচিত এই জুটি পোশাকের নকশায় ভারতীয় ঐতিহ্য ও শিল্পকলাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। যুদ্ধের বর্ম তৈরির দায়িত্বে রয়েছেন অজয় কুমার। অন্যদিকে চরিত্রগুলোর বিশেষ গয়না তৈরি করেছে বিখ্যাত গয়না নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ট্রাইব আম্রপালি। অযোধ্যা, মিথিলা ও লঙ্কা, তিন রাজ্যের সংস্কৃতি ও পরিবেশ অনুযায়ী আলাদা করা হয়েছে চরিত্রগুলোর সাজসজ্জা।
রাম: রাজকীয় অথচ সংযত লুকে রণবীর
রণবীর কাপুরের রামের পোশাকে রয়েছে রাজকীয় আভিজাত্য ও সংযমের মিশেল। সূর্যবংশের পরিচয় ফুটিয়ে তুলতে পোশাকে রাখা হয়েছে সূর্যের মোটিফ ও প্রতিসম নকশা।

বনবাসের সময় তাঁর পোশাকে এসেছে পরিবর্তন। তখন দেখা যাচ্ছে প্রাকৃতিক রঙে রাঙানো সুতি ও খাদি কাপড়ের ধুতি-উত্তরীয়। যুদ্ধের দৃশ্যের জন্য তৈরি হয়েছে বিশেষ বর্ম।

চরামের গয়নায়ও রয়েছে সূর্যবংশের প্রতীকী উপস্থিতি। তাঁর জন্য ট্রাইব আম্রপালি তৈরি করেছে ৩৩৫ গ্রাম ওজনের একটি বিশেষ ব্রাসের হার। এটি তৈরিতে সময় লেগেছে প্রায় ১৮ মাস। নকশায় রয়েছে সূর্যমুখী ও পৌরাণিক কোদণ্ড ধনুকের অনুপ্রেরণা। রণবীরের চুল রাখা হয়েছে লম্বা ও কাঁধ পর্যন্ত কোঁকড়ানো। পরিচ্ছন্ন মুখাবয়বে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে রামের শান্ত ও সৌম্য রূপ।
সীতা: প্রকৃতির ছোঁয়ায় সরল সুন্দর সাই পল্লবী
সাই পল্লবীর সীতার সাজে প্রাধান্য পেয়েছে প্রকৃতি ও মিথিলার ঐতিহ্য। পোশাকে রয়েছে ফুল, লতাপাতা ও প্রাকৃতিক মোটিফ। বিয়ের দৃশ্যে বেনারসি সিল্কের শাড়িতে ব্যবহার করা হয়েছে জারদৌসি ও মারোডি কাজ।


বনবাসের পোশাকে এসেছে ভিন্নতা। সেখানে ভেষজ রঙে তৈরি লালচে মেরুন শাড়ির সঙ্গে রয়েছে সবুজ ব্লাউজ। এই ব্লাউজের আধুনিক সেলাই নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে।

সীতার গয়নায় রয়েছে প্রাচীন ভারতীয় অলংকারশৈলীর প্রভাব। মাথাপট্টি, ভারী ঝুমকা ও মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী থেকে অনুপ্রাণিত গয়নায় ফুটে উঠেছে ঐতিহ্য। মেকআপে রাখা হয়েছে স্বাভাবিকতা। সাধারণ খোঁপা কিংবা খোলা চুলে সীতার সরল সৌন্দর্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
রাবণ: ক্ষমতা ও অহংকারের প্রকাশ
যশের রাবণের পোশাকে রয়েছে গাঢ় রং, ভারী কাপড় ও অসম নকশার ব্যবহার। প্রাচীন লঙ্কার ভাস্কর্যশিল্পের সঙ্গে আধুনিক নকশার মিশ্রণে তৈরি হয়েছে তাঁর পোশাক।


সোনা ও কালো পাথরের গয়নায় ফুটে উঠেছে লঙ্কার ঐশ্বর্য। বিশাল মুকুট, বাহুবন্ধনী ও ভাস্কর্যধর্মী অলংকারে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর ক্ষমতা ও দম্ভ। লম্বা চুল, ঘন দাড়ি ও তীক্ষ্ণ চোখের সাজে রাবণের গম্ভীর উপস্থিতি আরও জোরালো হয়েছে।
মন্দোদরী: স্বর্ণলঙ্কারে মোড়ানো রানির সাজে কাজল
রাবণের স্ত্রী ও লঙ্কার রানি মন্দোদরীর চরিত্রে অভিনয় করছেন কাজল। তাঁর সাজে আছে রাজকীয় আভিজাত্যের পাশাপাশি গাম্ভীর্য ও বিষণ্ণতার ছাপ। গাঢ় মেরুন, রাজকীয় বেগুনি ও পান্না সবুজের মতো রঙের ভারী সিল্ক ও ব্রোকেডের পোশাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে লঙ্কার ঐশ্বর্য। পোশাকের পাড় ও আঁচলে রয়েছে সোনালি সুতার কারুকাজ।


মন্দোদরীর গয়নায় সোনার আধিক্য চোখে পড়ার মতো। স্তরে স্তরে সাজানো নেকলেস, চোকার, বড় ঝুমকা, মাথাপট্টি ও বাহুবন্ধনীতে রয়েছে প্রাচীন অলংকারশৈলীর ছাপ। রত্নখচিত গয়নায় রানির মর্যাদা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মেকআপে চোখের গাঢ় কাজল ও বড় লাল টিপ তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরও দৃঢ় করেছে। চুলে রয়েছে অলংকারখচিত রাজকীয় খোঁপা।
কৈকেয়ী: রাজকীয় দৃঢ়তায় লারা দত্ত
কৈকেয়ী চরিত্রটি একাধারে অযোধ্যার রানি, ভরত-জননী এবং একজন পরাক্রমশালী যোদ্ধা (যিনি দশরথের রথ চালনা করেছিলেন)। তাঁর পোশাকে ও গয়নায় এই সব কয়টি সত্ত্বাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। লারা দত্তের জন্য অযোধ্যার বাকি দুই রানির (কৌশল্যা ও সুমিত্রা) চেয়ে ভিন্ন ধাঁচের পোশাক তৈরি করা হয়েছে। তাঁর শাড়ির রং গাঢ় মেরুন, টেরাকোটা ও গাঢ় নীল। পোশাকের ফেব্রিক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে ভারী চান্দেরি এবং তসর সিল্ক। কাপড়ের মোটিফে রাজকীয় জ্যামিতিক নকশা ও যুদ্ধের ঢালের সিমেট্রি ব্যবহার করা হয়েছে, যা তাঁর দৃঢ় চেহারার সাথে মানিয়ে যায়।

তাঁর গলায় রাখা হয়েছে ভারী হাঁসুলি ও সোনার প্রাচীন ডিজাইনের নেকলেস। কানে চওড়া কানপাশা এবং কপালে নিখুঁত সূর্যমুখী নকশার মাথা পট্টি দেওয়া হয়েছে। এই গয়নাগুলো লারার রাজকীয় গ্রীবা ও ব্যক্তিত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

কৈকেয়ীর মেকআপে তাঁর চোখকে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও গম্ভীর করা হয়েছে। হালকা ব্রোঞ্জ টোনের মেকআপে খুব মানিয়েছে তাঁর চরিত্রটিকে।
শূর্পণখা: লঙ্কার বন্য সৌন্দর্য্যে রাকুল প্রীত সিং
শূর্পণখার চরিত্রটি রামায়ণের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য দায়ী। তাই পর্দায় তাঁর ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশনে একদিকে যেমন লঙ্কার রাজকীয় জাঁকজমক রয়েছে, অন্যদিকে রাক্ষসী সংস্কৃতির এক ধরনের বন্য ও প্রলুব্ধকর ভাব রাখা হয়েছে। রাকুল প্রীতের পোশাক বেশ সাহসী ও আধুনিক।


শূর্পণখার গয়নাগুলো সাধারণ সোনা বা হীরার নয়। লঙ্কার অন্ধকার রূপ ফুটিয়ে তুলতে কালো সোনা ও রুথেনিয়াম ব্যবহার করা হয়েছে। নকশাগুলো বেশ ট্রাইবাল ধরনের।মায়াবী মেকআপের মাধ্যমে রাকুল প্রীতের লুককে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করা হয়েছে। চোখে দেওয়া হয়েছে স্মোকি মেকআপ এবং ঠোঁটে গাঢ় বেরি বা ওয়াইন রঙের লিপস্টিক। লক্ষ্মণের হাতে নাক কাটার আগের লুকে তাঁর চুলগুলো খোলা, কোঁকড়ানো এবং কিছুটা অগোছালো রাখা হয়েছে, যা তাঁর বন্য স্বভাবকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলে।
ঐতিহ্য ও আধুনিক নির্মাণের মেলবন্ধন
সিনেমাটির সাজসজ্জার মূল লক্ষ্য কেবল চোখধাঁধানো রাজকীয় পরিবেশ তৈরি করা নয়, বরং ভারতীয় শিল্প, ভাস্কর্য ও পোশাকের ঐতিহ্যকে পর্দায় তুলে ধরা।

মন্দিরের অলংকরণ, প্রাচীন চিত্রকলা এবং রাজা রবি বর্মার পৌরাণিক চিত্রকর্ম থেকেও নেওয়া হয়েছে অনুপ্রেরণা। ফলে প্রতিটি চরিত্রের পোশাক ও গয়না হয়ে উঠেছে তার পরিচয়, সময় ও সংস্কৃতির অংশ।
সূত্র: বাজার ইন্ডিয়া, টাইমস অব ইন্ডিয়া
ছবি: ইন্সটাগ্রাম
সূত্র: প্রথম আলো