|
| |
রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

ডিলিউশনশিপ থেকে ডিংক পর্যন্ত

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৩:২৩ এএম
১৭৬ পঠিত
ডিলিউশনশিপ থেকে ডিংক পর্যন্ত
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
জেন–জিদের সঙ্গে আগের প্রজন্মগুলোর প্রেম, বিচ্ছেদ বা সম্পর্ক–সংক্রান্ত যা পার্থক্য, তা মূলত অন্তর্জালের যথেচ্ছ আধিপত্যের কারণে ঘটেছে।

আপনার যদি জেন–জি সন্তান বা শিক্ষার্থী থেকে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, তাদের একটা আলাদা শব্দভান্ডার আছে। এই কিছুদিন আগে ফেসবুকে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পোস্ট দিয়েছেন, দেড় পৃষ্ঠার লেখায় একটিমাত্র শুদ্ধ বাক্য, ‘Shakespeare is the GOAT of English literature.’ আপনি জেন–জি ভোকাবুলারির সঙ্গে পরিচিত হলে বুঝবেন, GOAT হচ্ছে Greatest Of All Time-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। শুদ্ধ বাক্য লিখতে না পারলেও নিজেদের ভোকাবুলারি নিয়ে ভীষণ গর্বিত এই প্রজন্ম। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেসব বৈচিত্র্যকে তারা সংজ্ঞায়িত করেছে, সেগুলো আদৌ নতুন নয়।

এই প্রজন্মের সম্পর্ক–সংক্রান্ত বহুল ব্যবহৃত শব্দগুলোর কয়েকটি হচ্ছে সিচুয়েশনশিপ, ব্রেডক্রাম্বিং, সাইডচিক, ন্যানোশিপ, বেঞ্চিং, লাভ বম্বিং, ডিলিউশনশিপ, পকেটিং ইত্যাদি। একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে, ডিজিটাল দুনিয়ায়; অর্থাৎ কিনা অন্তর্জালের জন্য বিশেষায়িত কিছু শব্দ, যেমন আর বম্বিং বা অরবিটিংয়ের মতো সোশ্যাল মিডিয়া–সংশ্লিষ্ট কিছু জিনিস বাদে বাকিগুলো আগে থেকেই ছিল। ধরুন, রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা উপন্যাসের অমিত যখন কেতকীকে ঘড়ায় তোলা জল আর লাবণ্যকে জলাশয়ের সঙ্গে তুলনা করছিল, তখন সে কি আসলে সাইডচিক হিসেবে লাবণ্যর সঙ্গ চাচ্ছিল না? আর লাবণ্যও তো শোভনলালকে বেঞ্চিং করেই রেখেছিল। শরৎচন্দ্রের দেবদাস বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর পার্বতীকে লাভ বম্বিংয়ের চেষ্টা করেও পারল না, ওদিকে চন্দ্রমুখীকে ব্রেডক্রাম্বিং করেই রাখল আজীবন।

ধরুন, রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা উপন্যাসের অমিত যখন কেতকীকে ঘড়ায় তোলা জল আর লাবণ্যকে জলাশয়ের সঙ্গে তুলনা করছিল, তখন সে কি আসলে সাইডচিক হিসেবে লাবণ্যর সঙ্গ চাচ্ছিল না? আর লাবণ্যও তো শোভনলালকে বেঞ্চিং করেই রেখেছিল।

জেন–জিদের সঙ্গে আগের প্রজন্মগুলোর প্রেম, বিচ্ছেদ বা সম্পর্ক–সংক্রান্ত যা পার্থক্য, তা মূলত অন্তর্জালের যথেচ্ছ আধিপত্যের কারণে ঘটেছে। এখনকার ছেলেমেয়েরা স্টকিং বলতে বোঝায় সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল নীরবে অনুসরণ। ১৯৮০ বা ’৯০–এর দশকে এই স্টকিং ছিল বাস্তব। আমরা যারা নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে স্কুলে ছিলাম, তখন রিকশার পেছন পেছন সাইকেল নিয়ে বাসা পর্যন্ত আসা অনুরাগীদের ঠিকই দেখতাম। বাসার ল্যান্ডলাইনে ফোন করে ফেলত কিছু দুঃসাহসী, কিন্তু অন্য কেউ ফোন ধরলে কথা বলা সম্ভব হতো না।

কোভিড অতিমারির সময়ের লকডাউনের পর স্কুলের বাচ্চাদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল স্মার্টফোন। কাজেই আজকালকার ছেলেমেয়েদের অত ঝামেলা করতে হচ্ছে না, যোগাযোগ আক্ষরিক অর্থেই হাতের মুঠোয়। এই অবাধ ও নিরবচ্ছিন্ন যুক্ততা যেমন সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পথ সহজ করে দিয়েছে, তেমনি জীবনকে জটিল করেও তুলেছে। তাদের অনেক বিকল্প। একজনকে রেড ফ্ল্যাগ মনে হলে তাকে গৌস্টিং করে দিয়ে আরেকজনকে স্টক করে ফেলে, চাইলে পরে আবার জম্বিয়িং করবে বলে। একই সঙ্গে অনেকজনের সঙ্গে টকিং স্টেজে থাকা ডালভাত। অথচ আমাদের সময়ে প্রবল একনিষ্ঠ প্রেমিক–প্রেমিকাদের একটুখানি কথা বলার জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করতে হতো। কাউকে কাউকে হয়তো ব্যবহার করতে হতো প্রতিবেশীর বাড়ির ফোন।

এই অবাধ ও নিরবচ্ছিন্ন যুক্ততা যেমন সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পথ সহজ করে দিয়েছে, তেমনি জীবনকে জটিল করেও তুলেছে। তাদের অনেক বিকল্প। একজনকে রেড ফ্ল্যাগ মনে হলে তাকে গৌস্টিং করে দিয়ে আরেকজনকে স্টক করে ফেলে, চাইলে পরে আবার জম্বিয়িং করবে বলে। একই সঙ্গে অনেকজনের সঙ্গে টকিং স্টেজে থাকা ডালভাত।

ইদানীং অনেকেই বলছেন, জেন–জিদের মধ্যে অল্প বয়সে বিয়ে করার প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। ‘বিয়ের বয়স’ ধারণাটাই আপেক্ষিক। মাত্র ১০০ বছর আগেও আমাদের উপমহাদেশে বাল্যবিবাহই দস্তুর ছিল। রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তীর বয়স ১৭ ছিল আর তার স্বামীর ১৯। আরেকটু পিছিয়ে গেলে ইংল্যান্ডেও যৌবনের উদ্‌গম হওয়াই ছিল বিয়ে করার জন্য যথেষ্ট যোগ্যতা। শেক্‌সপিয়ারের জুলিয়েটও ১৬ বছর বয়সী—আমাদের হিসাবে বাচ্চা মেয়ে—কিন্তু চার্চে লুকিয়ে বিয়ে করে ফেলেছিল।

বিলম্বিত কৈশোরের, যা ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত ছেলে–মেয়েদের টিনেজার গণ্য করতে বলে, ধারণাটি অপেক্ষাকৃত নতুন। ১৮ হয়ে গেলে মেয়েদের বিবাহে আইনগত বাধা নেই। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এমন যে এইচএসসি পাস করে আন্ডারগ্রেডে ভর্তি হতে হতে বয়স ১৯ পেরিয়ে কারও কারও ২০–ও হয়ে যায়। আমাদের কাছে বাচ্চা মনে হলেও আসলে তারা প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ–তরুণী। যেহেতু এই প্রজন্ম কে কী ভাবল না ভাবল, তা তেমন একটা পাত্তা দেয় না। তাই তারা ছাত্রজীবনে বিয়ে করলেও তা লুকিয়ে রাখতে চায় না। তারা লুকাচ্ছে না বলেই আপনি জানছেন যে জেন–জিদের কেউ কেউ খুব আগ্রহ নিয়ে ছাত্রজীবনে বিয়ে করছে।

আমার এক প্রেমিকের বন্ধুযুগল, একই ক্লাসে পড়ে ছাত্র অবস্থায় লুকিয়ে বিয়ে করেছিলেন। পরে পাস করার পর বাড়ির সবার সামনে আবার বিয়ে করেন। এর কিছুদিন পর হয় বিয়ের রিসেপশন। সেই তৃতীয় অনুষ্ঠানে আপুটিকে বলতে শুনলাম, ‘উফ, আর ভাল্লাগতেছে না, এই এক ছেলেকে কয়বার বিয়ে করতে হইতেছে?’

বিশ্বাস করুন, একটুও বানিয়ে বলছি না। আমার এক প্রেমিকের বন্ধুযুগল, একই ক্লাসে পড়ে ছাত্র অবস্থায় লুকিয়ে বিয়ে করেছিলেন। পরে পাস করার পর বাড়ির সবার সামনে আবার বিয়ে করেন। এর কিছুদিন পর হয় বিয়ের রিসেপশন। সেই তৃতীয় অনুষ্ঠানে আপুটিকে বলতে শুনলাম, ‘উফ, আর ভাল্লাগতেছে না, এই এক ছেলেকে কয়বার বিয়ে করতে হইতেছে?’ ওনারা জেন–জি হলে এত ঝামেলায় যেতেনই না। আমার এক ছাত্র ফার্স্ট বা সেকেন্ড ইয়ারে বিয়ে করে সবাইকে জানিয়ে দম্পতির মতো ঘুরে বেড়াত। শিক্ষকেরা জানলেও কুছ পরোয়া নেই।

জেন–জিদের এই আত্মবিশ্বাস আমার খুব ভালো লাগে। আমার মনে আছে, ছোটবেলায় বড়রা আমাদের অনেক উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে পার পেয়ে যেতেন। এখনকার বাচ্চাদের সঙ্গে সেটা সম্ভব হয় না। ওরা মুখের ওপর বলে দেয় কেন কথাটা ঠিক নয়। আমি একবার এক বড় বোনকে বলেছিলাম, ‘আমি আমার কন্যাকে বলব, আর যা–ই করো বাবা, জীবনে বিয়েশাদি কোরো না।’ শুনে আমার সেই বোন বললেন, ‘কেন তুই বলবি এই কথা? তোর জীবনে বিয়ের অভিজ্ঞতা ভালো নয় বলে যে ওরও হবে না, তেমন তো নয়।’

পরিসংখ্যান বলছে, সারা বিশ্বেই বিয়ের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। জেন–জিদের অনেকেই অবিবাহিত থাকবে। আমাদের মিলেনিয়ালদের মধ্যে পিপল প্লিজিং ব্যাপারটা ছিল। আমি অনেককেই বিশ্বাস করতে দেখেছি, বিয়ের প্রথাটা তার জন্য নয়। অথচ পরিবারের চাপে বিয়ে করেছে, বিবাহিত জীবন যাপন করছে। বিবাহিত জীবনের দায়িত্ব–কর্তব্য নিয়ে ক্লান্ত আর বিরক্ত। এহেন মূর্খতা জেন–জিদের মধ্যে নেই।

এ কথা শুনেই আমি সাবধান হয়ে গেলাম। আমার জেন–জি মেয়ে যদি বলে বসে, ‘বিয়ে আসলে টিকিয়ে রাখতে হয়। এটা একটা প্রতিষ্ঠান। তোমরা আসলে এই প্রতিষ্ঠানের উপযুক্ত ছিলে না। তোমরা ডেলুলু হয়ে বিয়ে করে ফেলেছিলে,’ তাহলে তো আমার মান–ইজ্জতের ফালুদা হয়ে যাবে।

পরিসংখ্যান বলছে, সারা বিশ্বেই বিয়ের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। জেন–জিদের অনেকেই অবিবাহিত থাকবে। আমাদের মিলেনিয়ালদের মধ্যে পিপল প্লিজিং ব্যাপারটা ছিল। আমি অনেককেই বিশ্বাস করতে দেখেছি, বিয়ের প্রথাটা তার জন্য নয়। অথচ পরিবারের চাপে বিয়ে করেছে, বিবাহিত জীবন যাপন করছে। বিবাহিত জীবনের দায়িত্ব–কর্তব্য নিয়ে ক্লান্ত আর বিরক্ত। এহেন মূর্খতা জেন–জিদের মধ্যে নেই। কেউ যদি আসলেই বিশ্বাস করে বিয়ে তার জন্য নয়, তাহলে সে হয়তো অপরাধবোধহীনভাবে মা–বাবাকেও বলবে এই কথা। ভালো সন্তান হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে গিয়ে একটি আদরবিহীন দাম্পত্যে থেকে অযথা বংশবিস্তার করে একটা আফসোসের জীবন কাটিয়ে যাবে না। কখনো তার মনে হবে না, তখন মা–বাবার কথায় বিয়েটা না করলে আজ একা একা চিল করে বেড়াতাম, ইউরোপে সোলো ট্রিপ দিতাম।

জেন–জিদের সঙ্গে আগের প্রজন্মগুলোর প্রেম, বিচ্ছেদ বা সম্পর্ক–সংক্রান্ত যা পার্থক্য, তা মূলত অন্তর্জালের যথেচ্ছ আধিপত্যের কারণে ঘটেছে

সব প্রজন্মের সঙ্গেই পরবর্তী প্রজন্মের মতের পার্থক্য থাকে—ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, রুচি ইত্যাদির পার্থক্য থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অতীত হয় বর্তমানের চেয়ে কিছুটা ভালো। সতীদাহ কিংবা নারীর আজীবন ব্রহ্মচর্য নিশ্চয়ই উত্তম প্রথা ছিল না।

একটু আগেই আমি বলেছি, এই উপমহাদেশে বাল্যবিবাহ দস্তুর ছিল। তাই মনে হতে পারে, আমি বাল্যবিবাহের পক্ষে। অবশ্যই তা নয়। আমার নানির কাছে শুনেছি, ১১ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া একটা বাচ্চা মেয়ে কীভাবে তরুণ স্বামীর বিভিন্ন আচরণে বিরক্ত হয়ে বাড়ির বিভিন্ন কোণে লুকিয়ে থাকত। নানি মজা করে বললেও আমি শুনে শিউরে উঠেছি। আমার মায়েদের আমলে উনিশ–কুড়িতে বিয়ে হওয়া স্বাভাবিক বলে মনে হতো। আমাদের যুগে সেটা গিয়ে দাঁড়াল চব্বিশ–পঁচিশে। মানে, পড়ালেখা যেহেতু করছ, পাস না করে বিয়ে করলে কেমন দেখায়? অথচ যৌবন এক জ্বলন্ত আগুনের নাম। আমার সেই প্রেমিকের বন্ধুযুগল যেমন নিজেদের বিশ্বাস অনুযায়ী লুকিয়ে বৈধতা দিয়ে হলেও একান্তে সময় কাটানোর সুযোগ করে নিয়েছিলেন, আজকের প্রজন্মের কেউ কেউও তা নিচ্ছে। ইতিবাচক ব্যাপার হচ্ছে, এসব ক্ষেত্রে তারা বরং বেশ সাহসী। লুকোছাপার প্রয়োজন বোধ করছে না।

এই প্রজন্ম বিয়েকেও বৈধ সন্তান উৎপাদনের জন্য সমাজ–স্বীকৃত প্রথার জায়গা থেকে সরিয়ে এনে অনেকটা নিজের জন্য সুবিধাজনক আরামদায়ক উপায় হিসেবে নিতে জানে। সম্পর্কগুলোকে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারার মতো এটিও এদের একধরনের স্মার্টনেস বৈকি।

সত্যিই তো, বিয়ে মানেই সামাজিক বা ধর্মীয় আইন; অর্থাৎ কিনা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাপার। কেউ বিবাহিত কি না, সেটা একটা পাবলিক ইনফরমেশন। এই প্রজন্মের অনেকে সে জন্য ডিংক কাপলও হচ্ছে। দুজনই রোজগার করবে, বাচ্চাকাচ্চা নেবে না—এমন একটা জীবনপদ্ধতি বেছে নেওয়া যাকে বলে। এই প্রজন্ম বিয়েকেও বৈধ সন্তান উৎপাদনের জন্য সমাজ–স্বীকৃত প্রথার জায়গা থেকে সরিয়ে এনে অনেকটা নিজের জন্য সুবিধাজনক আরামদায়ক উপায় হিসেবে নিতে জানে। সম্পর্কগুলোকে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারার মতো এটিও এদের একধরনের স্মার্টনেস বৈকি।

সূত্র: প্রথম আলো