|
| |
রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

অনিয়মে জর্জরিত চসিকের শাহ আমানত মার্কেট যেন এক ‘মরণফাঁদ’

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:০৩ পিএম
৩১৮ পঠিত
অনিয়মে জর্জরিত চসিকের শাহ আমানত মার্কেট যেন এক ‘মরণফাঁদ’
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
নগরের প্রবেশদ্বার ও অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র ‘শাহ আমানত সিটি কর্পোরেশন সুপার মার্কেট’। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ইলেকট্রনিকস ও বিভিন্ন পণ্যের কেনাকাটায় এই মার্কেটে ভিড় জমান হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। অথচ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) নিজস্ব মালিকানাধীন এই গুরুত্বপূর্ণ বিপণিবিতানটি এখন...

নগরের প্রবেশদ্বার ও অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র ‘শাহ আমানত সিটি কর্পোরেশন সুপার মার্কেট’। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ইলেকট্রনিকস ও বিভিন্ন পণ্যের কেনাকাটায় এই মার্কেটে ভিড় জমান হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। অথচ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) নিজস্ব মালিকানাধীন এই গুরুত্বপূর্ণ বিপণিবিতানটি এখন অনিয়ম, দুর্নীতি ও চরম অব্যবস্থাপনার এক বিশাল আখড়ায় পরিণত হয়েছে। চারতলা ভবনের ওপর অবৈধভাবে একের পর এক তলা বাড়িয়ে পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তলার নির্মাণকাজ চালানোর এই মহোৎসব পুরো বন্দরনগরীকে এক ভয়ংকর ভূমিকম্প ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি ঠেলে দিয়েছে।
 
তথ্যসূত্র ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯৫ সালে তৎকালীন মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর আমলে মার্কেটটি চারতলা বিশিষ্ট বিপণিবিতান হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। তবে নির্মাণকাল থেকেই ভবনটির সম্প্রসারণ ও নকশা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। সে সময় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) যথাযথ অনুমোদন কিংবা ফায়ার সার্ভিসের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়াই ভবনটি গড়ে তোলা হয়েছিল।

৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর নগরবাসীর প্রত্যাশা ছিল, চসিক ও সিডিএর মতো সেবাধর্মী সংস্থাগুলো অতীতের সব অনিয়ম ও দুর্নীতি থেকে বেরিয়ে এসে জনস্বার্থ ও কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কিন্তু খোদ সিটি কর্পোরেশনের মালিকানাধীন মার্কেটে নিয়মবহির্ভূত বহুতল সম্প্রসারণের এই কর্মকাণ্ডে নগরবাসীর সেই প্রত্যাশা আজ চরম শঙ্কা ও আশঙ্কায় রূপ নিয়েছে।

শাহ আমানত সুপার মার্কেটে মূলত টেলিভিশন, বৈদ্যুতিক পাখা, মুঠোফোনসহ নানা ধরনের ইলেকট্রনিকস সামগ্রীর শত শত পাইকারি ও খুচরা দোকান রয়েছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথমে চারতলা ভবন নির্মিত হওয়ার পর পরবর্তীতে আরও দুই তলা বাড়িয়ে একে হুট করে ছয়তলা করা হয়। ছাদের শেষ প্রান্তে রডের ফিনিশিং দিয়ে ভবন সম্প্রসারণের কাজ সে সময় শেষ করা হয়েছিল। সে সময় ব্যবসায়ীদের ধারণা ছিল, এরপরে আর তলা বাড়ানো হবে না। কারণ, মাঝারি বা তীব্র মাত্রার ভূমিকম্পের সময় ভবনটির কাঠামোগত নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কিন্তু সম্প্রতি সেই পুরনো ও জরাজীর্ণ কাঠামোর ওপর জোড়াতালি দিয়ে আবারও সপ্তম তলার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ব্যবসায়ীরা জানান, এর আগে পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলা নির্মাণের সময়ও নকশাগত ত্রুটির কারণে তা রিট্রোফিটিং করতে হয়েছিল এবং সপ্তম তলা নির্মাণ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তখন এর কাজ বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান নিয়মের তোয়াক্কা না করে ষষ্ঠ তলার ছাদে বাড়তি লোহা না রেখেই ড্রিল মেশিন দিয়ে ছাদ ৫ ইঞ্চি ছিদ্র করে, কেমিক্যাল গাম দিয়ে রড ঢুকিয়ে রাতারাতি পিলার দাঁড় করানো হয়েছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া হোটেল জামানের ওপর কোনো ফাউন্ডেশন না থাকলেও সেখানেও প্রায় ৬০০ বর্গফুট আয়তনের আরেকটি স্থাপনা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং নকশা ও ডিজাইন বহির্ভূতভাবে দেওয়াল কেটে দরজা তৈরি করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, চসিকের বর্তমান প্রশাসককে ভুল বুঝিয়ে একটি অসাধু চক্র ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহল নিজেদের অবৈধ স্বার্থ হাসিলের জন্য এই জোড়াতালির নির্মাণকাজ চালাচ্ছে। নগরের প্রাণকেন্দ্রে একটি জনবহুল বাণিজ্যিক ভবনকে আক্ষরিক অর্থেই ‘মরণফাঁদে’ পরিণত করেছে। ভূমিকম্প বা বড় কোনো দুর্যোগ ঘটলে এই অপরিকল্পিত ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রসারণ পুরো মার্কেট ধসিয়ে দিয়ে শত শত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে বলে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থপতি ও নগর-পরিকল্পনাবিদরা।

শুধু তাই নয়, ২০১৯ সালে নিচতলায় গাড়ি পার্কিংয়ের নির্ধারিত জায়গা জবরদস্তি করে দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে শহরজুড়ে সিডিএ বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করলেও সিটি করপোরেশন একটি সরকারি সংস্থা হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস অনেক সময় পাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন সিডিএ কর্মকর্তারা।

উন্নয়ন চার্জ, বরাদ্দের নামে কোটি টাকার দুর্নীতি ও পকেট ভারী করার বাণিজ্য:

মার্কেটটির অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও এস্টেট ব্যবস্থাপনার অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর চসিকের এস্টেট শাখা বিভিন্ন ব্যক্তির নামে দোকান বরাদ্দ দেয়। কিন্তু তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চরম গাফিলতি ও ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার কারণে নিবন্ধন খাতায় দোকান বরাদ্দপ্রাপ্ত অধিকাংশ ব্যক্তির শুধু নাম ছাড়া বিস্তারিত পরিচয়, স্থায়ী ঠিকানা কিংবা প্রামাণ্য নথি সংরক্ষণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। নথিপত্রে স্পষ্ট তথ্য না থাকার সুযোগে দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত মালিক ও বর্তমান ভাড়াটিয়াদের মধ্যে বিরোধ ও জটিল আইনি লড়াই চলছে। 

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান না করেই চসিকের এস্টেট শাখা নতুন নতুন ফ্লোর ও দোকান বরাদ্দের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে আর্থিক বাণিজ্যে লিপ্ত রয়েছে।

চসিকের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র ও সরকারি চিঠিপত্র পর্যালোচনা করলে শাহ আমানত সুপার মার্কেটের পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তলা সম্প্রসারণ নিয়ে কোটি কোটি টাকার হিসাবের গরমিলের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

২০২০ সালের চিত্র:

২০২০ সালের ২৪ মার্চ চসিকের তৎকালীন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ও উপসচিব মুফিদুল আলম স্বাক্ষরিত সরকারি পত্রে (স্মারক নং: ৪৬.১১.১৬০০.০০৩.১৮.০৩৫.১২-৩৩৬) উল্লেখ করা হয়, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তলার প্রতিটি ফ্লোর ২০ হাজার বর্গফুট ধরে মোট ৬০ হাজার বর্গফুটের বিপরীতে প্রতি বর্গফুট ১ হাজার ৬ শিল্প টাকা হারে ৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা উন্নয়ন চার্জ ধার্য করা হয়েছিল। 

ওই চিঠি অনুযায়ী, দরপত্রের সময় তিনটি ফ্লোরের আর্নেস্ট মানি বাবদ ২ কোটি ৪১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালের ৯ অক্টোবর আরও ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। সব মিলিয়ে পরিশোধিত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ কোটি ৯১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। চিঠিতে অবশিষ্ট ৬ কোটি ৭৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার ৫০ শতাংশ অর্থ ২০২০ সালের ৮ এপ্রিলের মধ্যে জমা দিয়ে লে-আউট অনুমোদনের তাগিদ দেওয়া হয়েছিল।

২০২৪ সালের চিত্র: 

পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২ মে চসিকের তৎকালীন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত অপর এক চিঠিতে (স্মারক নং: ৪৬.১১.১৬০০.০০৩.১৮.০৩৫.১২-৩৮৮) সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, কারিগরি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সপ্তম তলার ফ্লোর নির্মাণ বাদ দেওয়া হয়েছে। চসিকের সার্ভেয়ার দিয়ে পরিমাপ করে পঞ্চম তলা ১৭ হাজার ৮৬০ দশমিক ২৬ বর্গফুট এবং ষষ্ঠ তলা একই আয়তনের নির্ধারণ করা হয়। দুই ফ্লোরের মোট আয়তন দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৭২০ দশমিক ৫২ বর্গফুট। ওই চিঠিতে প্রতি বর্গফুট ১ হাজার ৬১০ টাকা হারে দুই ফ্লোরের মোট মূল্য ৫ কোটি ৭৫ লাখ ১০ হাজার ৩৭ টাকা ২০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। 

এর বিপরীতে দরপত্রের আর্নেস্ট মানি এবং পরবর্তী চারটি কিস্তিতে মোট ৪ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধিত দেখানো হয়। এতে দুই ফ্লোরের বিপরীতে অবশিষ্ট বকেয়া দাঁড়ায় ১ কোটি ৫৩ লাখ ৬০ হাজার ৩৭ টাকা ২০ পয়সা, যা ২০২৪ সালের ১২ মে-এর মধ্যে পরিশোধ করে চুক্তিপত্র সম্পাদনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, দাপ্তরিকভাবে সপ্তম তলার নির্মাণকাজ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ার পরও বর্তমানে ঠিকই সেখানে সপ্তম তলার কাজ পুরোদমে চলছে! এই লুকোচুরি ও লাখ লাখ টাকার হিসাবের গরমিল কার ইশারায় চলছে- তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। প্রধান প্রকৌশলীর কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি এস্টেট শাখায় যোগাযোগ করতে বলেন। তার ভাষ্য, বিষয়টি এস্টেট শাখা দেখভাল করে। ভবনের সম্প্রসারণ, দোকান বরাদ্দ ও উন্নয়ন চার্জের হিসাব বিষয়ে জানতে চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা উপসচিব এস এম সরওয়ার কামাল এবং সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তাকে একাধিকবার কল করা হলেও তারা কোনো সাড়া দেননি।

নকশা অনুমোদন ও নজরদারির চরম ঘাটতি:

যেখানে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সাধারণ বহুতল ভবন নির্মাণ নিয়েই নানা প্রশ্ন ওঠে, সেখানে খোদ চসিকের নিজস্ব মালিকানাধীন মার্কেটে একের পর এক তলা সম্প্রসারণের আইনি বৈধতা কোথায়- এমন প্রশ্ন তুলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের মতে, রাজস্ব আয় বা উন্নয়ন চার্জের হিসাবের পাশাপাশি ভবনের নকশা, কাঠামোগত নিরাপত্তা ও নির্মাণের অনুমোদন শতভাগ নিশ্চিত করা জরুরি। নকশা অনুমোদন এবং বাস্তব নির্মাণের মধ্যে অসংগতি থাকলে তা অবিলম্বে কঠোরহাতে যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

ভবন নির্মাণের অনিয়মের সঙ্গে নগর পরিকল্পনা ও বিভিন্ন সেবা সংস্থার পারস্পরিক সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে। 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), চট্টগ্রাম মহানগরের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নগরের উন্নয়ন ও পরিকল্পনার জন্য কাজ করে। কিন্তু সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, বিদ্যুৎ, রেলওয়ে, বন্দরসহ অসংখ্য সংস্থা নগরে কাজ করছে যাদের মধ্যে কোনো পরিকল্পিত ও কার্যকর সমন্বয় নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনুমোদিত নকশা করার পর নির্মাণের সময় সেটি ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করা হয়। কোথাও খোলা জায়গা রাখা হয় না, কোথাও নালা বা সড়কের জায়গা দখল করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। ডিএপি (বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা) আছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো সিডিএ এবং সিটি করপোরেশন নিজেরা কতটা ডিএপি অনুসরণ করে? কেউ আপত্তি করলে দেখে, অথবা বিশেষ আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে চোখ বন্ধ করে রাখে।’

পাহাড় কাটা ও পুকুর-দীঘি ভরাটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, শুধু একটি মার্কেট নয়, চট্টগ্রামের আদালত ভবন পাহাড়ের ওপর প্রায় ১৮৯০ থেকে ১৮৯২ সালের দিকে নির্মিত হয়েছিল। পরে সিডিএ নিউ মার্কেট করার জন্যও পাহাড় কেটেছে। জেলা পরিষদ, সিভিল সার্জন কার্যালয়, ওয়াসার পানি অবকাঠামোসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা অপরিকল্পিতভাবে হয়েছে। কলকাতার মতো পুরোনো ঘন শহরেও পর্যাপ্ত মাঠ-পার্ক ও ফাঁকা জায়গা রয়েছে, অথচ চট্টগ্রামে পাঁচ ফুট বাই পাঁচ ফুট জায়গা পেলেও ড্রেনের পাশে মার্কেট করার কথা চিন্তা করা হয়। এখানে একটি সম্পূর্ণ মার্কেটকেন্দ্রিক অনিয়মের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

অনুমোদনহীন এই অবৈধ নির্মাণের বিষয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অথরাইজড অফিসার-২ তানজিব হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘যেহেতু এটি সরকারি ভবন এবং সিটি করপোরেশনের নিজস্ব স্থাপনা, তাই এ বিষয়ে আলোচনা করতে হবে। আপনারা বিষয়টি সিটি করপোরেশনের সঙ্গেও কথা বলতে পারেন। আর যদি সেখানে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে সেটি তদন্ত করার জন্য আমি লোক পাঠাব। আমি বর্তমানে ছুটিতে আছি, তারপরও সেখানে আমাদের টিম পাঠিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’

সিডিএর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘অতীতে নিয়মিত অভিযান ও মনিটরিং না থাকায় নকশাবহির্ভূত নির্মাণ ও পার্কিং দখলের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ না হলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না, আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনবল সংকট রয়েছে তাই সব কাজ একসঙ্গে হাতে নেওয়া যাচ্ছে না, তবে ইনশাআল্লাহ মাঠপর্যায়ে ইতোমধ্যে সফলতা আসতে শুরু করেছে।’

স্থপতি ও নগর-পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান সতর্ক করে বলেন, বন্দরনগরী চট্টগ্রামে অসংখ্য ভবন নির্মাণাধীন থাকলেও সবগুলো যথাযথ বিল্ডিং কোড, অভিজ্ঞ কনসালট্যান্ট ও বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়নি ও হচ্ছে না। বিশেষ করে নগরীর বড় একটি অংশের মাটি নরম হওয়ায় যথাযথ সয়েল টেস্টের ভিত্তিতে ফাউন্ডেশন ডিজাইন না করলে ভবনগুলো ভূমিকম্পে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়তে পারে। ভবনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা রড-সিমেন্টসহ নির্মাণ সামগ্রীর মানের ওপরও সরাসরি নির্ভরশীল। নগরীর ভবন ও স্থাপনার প্রায় ৯০ শতাংশই নকশা বহির্ভূতভাবে নির্মিত। বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড-১৯৯৩ অনুসরণ ও ভূমিকম্প প্রতিরোধী নিয়ম প্রয়োগ করলে নির্মাণ ব্যয় মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, অথচ সামান্য খরচের বা লোভের কারণে পুরো জীবন ঝুঁকিগ্রস্ত করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রামে ভূমিকম্প ঝুঁকির অন্যতম প্রধান কারণ হলো পুরোনো জরাজীর্ণ ভবন, অপরিকল্পিত ও ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ, নিম্নমানের উপকরণে বহুতল ভবন নির্মাণ এবং নির্বিচারে পাহাড়-টিলা কাটা ও পুকুর-দীঘি ভরাট করে স্থাপনা গড়ে তোলা। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবানসহ বিভিন্ন শহর ও শহরতলীতে এ ধরনের বেপরোয়া নির্মাণ ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। একইসঙ্গে ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও উদ্ধার উপকরণেরও ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। আবহাওয়া অফিস, ফায়ার সার্ভিস, গ্যাস বিতরণ, বিদ্যুৎ বিভাগ, হাসপাতাল, সিটি করপোরেশনসহ সরকারি-বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকের কাছেই ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি উদ্ধারকাজ পরিচালনার প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জাম পর্যাপ্ত নেই।’

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স