|
| |
শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

অযত্ন ও অবহেলায় জৌলুশ হারিয়ে ঘাস–পাতায় ছেঁয়ে গেছে নকিপুর জমিদারবাড়ি

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:০০ এএম
৩৭৭ পঠিত
অযত্ন ও অবহেলায় জৌলুশ হারিয়ে ঘাস–পাতায় ছেঁয়ে গেছে নকিপুর জমিদারবাড়ি
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:

একসময় এখানে ছিল তিনতলা বিশাল প্রাসাদ। সারি সারি স্তম্ভ, খিলান আর কারুকাজে সাজানো ভবন। সামনে বিস্তীর্ণ মাঠ, পাশে বড় পুকুর, পাকা ঘাট, নহবতখানা আর জোড়া শিবমন্দির। জমিদারি ঐশ্বর্যের সেই স্মৃতি এখন ধ্বংসের পথে। ছাদের বড় অংশ ধসে পড়েছে। দেয়ালের পলেস্তারা খসে বেরিয়ে এসেছে ইট। কোথাও আগাছার আড়ালে হারিয়ে গেছে স্থাপনার চিহ্ন।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর সদর থেকে পূর্ব দিকে প্রায় দুই কিলোমিটার এগোলেই নকিপুর জমিদারবাড়ি। গত সোমবার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, পশ্চিম অংশের কিছু স্তম্ভ ও খিলান এখনো টিকে আছে। পূর্ব পাশের দীর্ঘ ভবনটির অধিকাংশ দেয়াল ধসে পড়েছে। একসময় ২১২ ফুট দীর্ঘ এই ভবনের চারপাশ এখন কলাগাছ, ঘাস ও আগাছায় ঢাকা।

জমিদারবাড়ির পাশের বাসিন্দা নয়ন হোসেন (২৫) ছোটবেলা থেকেই প্রাসাদের এই দশা দেখে আসছেন। তিনি বলেন, অন্তত ১০ বছর আগেও যদি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হতো, তাহলে স্থাপনাটির অনেকটাই রক্ষা করা সম্ভব হতো। সংরক্ষণ করা গেলে পুরো এলাকাটি দৃষ্টিনন্দন পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারত। নয়ন জানান, জমিদারবাড়ির ভেতরে আনোয়ারা বেগম (৫৬) ও ফাতেমা বেগম (৬২) নামের দুই নারী থাকেন। তাঁদের অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।

প্রাসাদের সামনের মাঠের দক্ষিণ পাশে পাশাপাশি দুটি শিবমন্দির। চারচালা ঘরের আদলে তৈরি মন্দির দুটি তুলনামূলক ভালো অবস্থায় আছে। তবে পুকুরের ঘাটসংলগ্ন অষ্টকোনা আকৃতির দোতলা নহবতখানার অধিকাংশই ধসে গেছে। টিকে আছে দেয়ালের কিছু অংশ আর ভিত্তির অবশিষ্টাংশ।

পরিত্যক্ত জমিদারবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন আনোয়ারা বেগম। গত সোমবার সকালে শ্যামনগর উপজেলার নকিপুরে

ইতিহাস ও গবেষণায় জমিদারবাড়ি

নকিপুর জমিদারবাড়ির ইতিহাস ও স্থাপত্য নিয়ে গবেষণা করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. শহিদুল ইসলাম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ফেলো সাথী খাতুন। তাঁদের গবেষণার শিরোনাম ‘মনুমেন্টস অ্যান্ড মেমোরি: দ্য আর্কিটেকচারাল ওয়ার্কস অব জমিদার হরিচরণ রায়’। এ বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক ব্রুকলিন রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিশিং ইনস্টিটিউটের জার্নাল অব অ্যানথ্রোপলজি অ্যান্ড আর্কিওলজি সাময়িকীতে এটি প্রকাশিত হয়।

১৯৫০ সালে জমিদারিপ্রথা বিলুপ্ত হলে হরিচরণ রায়ের উত্তরাধিকারীরা আর্থিক সংকটে পড়েন। ১৯৭১ সালে পরিবারের সর্বশেষ উত্তরাধিকারীরা কলকাতায় চলে গেলে বাড়িটি অযত্নে পড়ে থাকে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে থাকে। একসময়ের মূল্যবান সামগ্রীও চুরি ও লুটপাট হয়।

লেখক চারুচন্দ্র মণ্ডলের ‘নকিপুর জমিদার বাড়ির ইতিহাস’ বইয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে গবেষণায় বলা হয়েছে, জমিদার হরিচরণ রায় চৌধুরী (১৮৬৬–১৯১৫) ছিলেন শ্যামনগর অঞ্চলের প্রভাবশালী জমিদার। মুর্শিদাবাদ থেকে এসে তাঁর পূর্বপুরুষেরা বর্তমান সাতক্ষীরায় বসতি গড়েন বলে ধারণা করা হয়। হরিচরণের পৃষ্ঠপোষকতায় এলাকায় পুকুর খনন, সড়ক ও খাল নির্মাণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মতো জনহিতকর কাজ হয়। ১৮৯৯ সালে তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত নকিপুর মাইনর স্কুল এখন নকিপুর হরিচরণ পাইলট উচ্চবিদ্যালয়।

অষ্টকোনা আকৃতির দোতলা নহবতখানার অধিকাংশই ধসে গেছে। গত সোমবার সকালে শ্যামনগর উপজেলার নকিপুরে

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ১৮৮৮ সালে জমিদার হরিচরণ রায় নকিপুরের জমিদারবাড়িটি তৈরি করেন। স্থানীয় মানুষের কেউ কেউ অবশ্য বাড়িটিকে ২০০ থেকে ৩০০ বছরের পুরোনো বলেন। তবে ঔপনিবেশিক স্থাপত্যবৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে গবেষকেরা এটিকে ঊনবিংশ শতকের শেষ ভাগের স্থাপনা বলে মনে করেন। ৯২ নম্বর নকিপুর মৌজার ২ দশমিক ৯২ একর জমির ওপর নির্মিত প্রাসাদটির জোড়া স্তম্ভ, খিলানসহ নানা বৈশিষ্ট্যে ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীর ছাপ আছে। চারুচন্দ্র মণ্ডলের বর্ণনা অনুযায়ী, ভবনে কক্ষ ছিল ৩৯টি: নিচতলায় ১৭, দ্বিতীয় তলায় ১৭ ও তৃতীয় তলায় ৫টি।

১৯৫০ সালে জমিদারিপ্রথা বিলুপ্ত হলে হরিচরণ রায়ের উত্তরাধিকারীরা আর্থিক সংকটে পড়েন। ১৯৭১ সালে পরিবারের সর্বশেষ উত্তরাধিকারীরা কলকাতায় চলে গেলে বাড়িটি অযত্নে পড়ে থাকে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে থাকে। একসময়ের মূল্যবান সামগ্রীও চুরি ও লুটপাট হয়।

জমিদারবাড়ির পেছনের একটি অংশ ভেঙে গেছে। গত সোমবার সকালে শ্যামনগরের নকিপুরে

নহবতখানা সম্পর্কে গবেষণায় বলা হয়, ঔপনিবেশিক আমলের জমিদারবাড়িতে এ ধরনের স্থাপনা খুব প্রচলিত না হলেও বাংলাদেশের স্থাপত্যের ইতিহাসে এর নজির আছে। স্থাপত্য ও প্রত্নতত্ত্ববিষয়ক গবেষক ও লেখক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার বর্ণনা উদ্ধৃত করে গবেষণায় বলা হয়, কোনো এলাকার রাজা বা সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির প্রাসাদে যেখানে সকাল–সন্ধ্যায় বাদ্যযন্ত্র বাজানো হতো, সেটিই নহবতখানা। নকিপুরের নহবতখানার একটি পুরোনো ছবি মিজানুর রহমানের ‘সাতক্ষীরার পুরাকীর্তি’ বইয়ে আছে।

জীর্ণ জমিদারবাড়ি। গত সোমবার সকালে শ্যামনগরের নকিপুরে

জমিদারবাড়িটির স্তম্ভ, খিলান, জোড়া শিবমন্দির ও অষ্টকোনা আকৃতির নহবতখানা স্থাপনাটিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে বলে উল্লেখ করেন গবেষক শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে নতুন প্রজন্ম সাতক্ষীরার ইতিহাস ও স্থাপত্য–ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে।

নকিপুর জমিদারবাড়ি ও এর সংলগ্ন স্থাপনা সংরক্ষণের বিষয়ে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক (ডিসি) কাউসার আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদগুলোর মধ্যে নকিপুর জমিদারবাড়ি অন্যতম। স্থাপনাটি সংরক্ষণের উদ্যোগ হিসেবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অধিদপ্তর থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। আশা করছি দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সূত্র: প্রথম আলো