আখতার হুসেন প্রেরণা হয়ে থাকবেন সংগ্রামে, আদর্শে, প্রগতির যাত্রাপথে
গণমাধ্যম ডেক্স
ছড়াকার আখতার হুসেন তাঁর যে রচনার সম্পদ রেখে গেছেন, তা চিরকাল মানুষের মুক্তির পথযাত্রায় অনুপ্রেরণা জোগাবে। তাই শারীরিকভাবে চলে গেলও তিনি কখনো আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন না। তিনি থাকবেন সংগ্রামে, আদর্শে, প্রগতির পথযাত্রায় চিরকালের সঙ্গী হয়ে। আজ শুক্রবার বিকেলে আখতার হুসেনের নাগরিক শোকসভা ও স্মরণানুষ্ঠানে বক্তারা এভাবেই তাঁকে স্মরণ করলেন।
রাজধানীর সেগুনবাগিচার কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার দাদা ভাই সম্মেলনকক্ষে এই নাগরিক শোকসভা ও স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আখতার হুসেনের স্বজনেরা এই আয়োজন করেন। বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি যেসব সংগঠনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন, সেই কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও যুব ইউনিয়নের নবীন-প্রবীণ নেতা–কর্মী, সংগঠক, শিল্পীরা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। স্মৃতিচারণা, কাজের মূল্যায়ন আর সংগীত ও আবৃত্তির মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় গত ২৪ সেপ্টেম্বর প্রয়াত শিশুসাহিত্যিক, ছড়াকার, গীতিকবি, নাট্যকার, সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আখতার হুসেনের প্রতি।
অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল আখতার হুসেনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে। মঞ্চের সামনেই ছিল শিল্পী মাশুক হেলালের আঁকা তাঁর প্রতিকৃতি। সেখানে অর্পণ করা হয় পুষ্পস্তবক। খেলাঘর, উদীচী ও সাংস্কৃতিক ইউনিয়নের শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘আগুনের পরশমণি’।
আলোচনা ও স্মৃতিচারণা পর্ব শুরু হয়েছিল কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের চেয়ারপারসন কাজী মোজাম্মেল হোসেনের সভাপতিত্বে। প্রথমেই তাঁর জীবনী পাঠ করেন শিখা সেনগুপ্তা।
আলোচনায় উদীচীর একাংশের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম বলেন, আখতার হুসেন ১৯৬৮ সালে উদীচীর গঠন পর্বে যুক্ত ছিলেন। অনেক অসাধারণ নাটক রচনা করেছেন উদীচীর জন্য। তাঁর গান ও নাটকে প্রবল শক্তিমত্তার প্রকাশ ছিল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে সেই শক্তি আন্দোলন–সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করেছে। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁর এসব রচনা অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে। তিনি চলে গেলেও আমাদের সঙ্গে আছেন, থাকবেন।
কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের সাধারণ সম্পাদক প্রণয় সাহা বলেন, আখতার হুসেন তাঁর লেখায় ও সাংগঠনিক কাজে সারা জীবন চেষ্টা করেছেন শিশুরা যেন বড় হয়ে দেশকে ভালোবাসে, মানবিক গুণাবলি অর্জন করে, একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠতে পারে। সে কারণে তাঁর জীবন সম্পর্কে শিশু-কিশোরদের সামনে যত আলোচনা হবে, নতুন প্রজন্ম ততই সমৃদ্ধ হবে।
খেলাঘরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ বলেন, আখতার হুসেনের সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল অসাধারণ। খেলাঘর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার নেপথ্যে যে সংগঠকেরা ব্যাপক পরিশ্রম করেছিলেন, আখতার হুসেন ছিলেন তাঁদের অন্যতম। অসামান্য প্রতিভা ছিল তাঁর।
সভাপতির বক্তব্যে কাজী মোজাম্মেল হোসেন বলেন, তিনি সবার কাছে ছিলেন ‘আখতার ভাই’। ‘ভাই’ হতে পারেন সেই মানুষটি, যিনি সবচেয়ে আপন। যার কাছে স্বাচ্ছন্দ্যে যাওয়া যায়। আখতার ভাই তেমনই মানুষ ছিলেন। সহজ–সরল, অনাড়ম্বর আন্তরিক। তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসা কখনো শেষ হবে না।
আলোচনা পর্বে আরও অংশ নেন খেলাঘরের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রথীন চক্রবর্তী, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মাহির শাহরিয়ার প্রমুখ।
দ্বিতীয় পর্বে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। খেলাঘর ও ছাত্র ইউনিয়ন— এই দুই সংগঠনেরই দলীয় সংগীত লিখেছিলেন আখতার হুসেন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই খেলাঘরের কর্মীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করে তাদের দলীয় সংগীত ‘আমরা তো সৈনিক শান্তির সৈনিক’। পরের গানটি ছিল তাঁর লেখা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা’। সাংস্কৃতিক ইউনিয়নের শিল্পীরা পরিবেশন করেন ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’, ‘তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম’। শেষে ছিল ছাত্র ইউনিয়নের দলীয় সংগীত ‘আমরা তো ঐক্যের দৃঢ় বলে বলীয়ান’। যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামানের সঞ্চালনায় সৈয়দা রত্নার আবৃত্তি দিয়ে শেষ হয় শোক ও শ্রদ্ধার এই আয়োজন।
আখতার হুসেন প্রায় ছয় দশকের বেশি সময় ধরে শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান।
সূত্র: প্রথম আলো