|
| |
বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

ঋত্বিক ঘটক: চলচ্চিত্রকারদের চলচ্চিত্রকার

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:২৯ এএম
৪২৫ পঠিত
ঋত্বিক ঘটক: চলচ্চিত্রকারদের চলচ্চিত্রকার
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
১০১-এ ঋত্বিক

বাংলা চলচ্চিত্রের তিন কিংবদন্তি নির্মাতা সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন ও ঋত্বিক ঘটক। তবে তার মধ্যে জীবদ্দশায় যে স্বীকৃতি ও সম্মান ঋত্বিকের প্রাপ্য ছিল, তার অনেকটাই তিনি পেয়েছেন মৃত্যুর পর। নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, লেখক ও অভিনেতা হিসেবে তার প্রতিভা শুধু নিজের চলচ্চিত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতের পুনের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ায় (এফটিআইআই) শিক্ষকতার সময় তিনি তৈরি করেছিলেন একদল নির্মাতা, যাদের হাত ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্রে জন্ম নেয় নতুন ধারার সিনেমা। ২০১৮ সালে দিল্লিতে এক বিশেষ আয়োজনে মুখোমুখি হয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটকের দুই প্রাক্তন ছাত্র, নির্মাতা কুমার শাহানি ও সাঈদ আখতার মির্জা। উপলক্ষ ছিল তার বিখ্যাত বাংলা সিনেমা ‘মেঘে ঢাকা তারা’র ডিজিটাল পুনরুদ্ধার করা সংস্করণ প্রকাশ। বিশ্ব চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজ সংরক্ষণ ও প্রকাশের জন্য পরিচিত দ্য ক্রাইটেরিয়ন কালেকশন ছবিটির নতুন সংস্করণ প্রকাশ করে। অনুষ্ঠানে আলোচনায় মির্জা ছবিটির ‘বর্ধিত বাস্তবতা’ বা ‘এনহ্যান্সড রিয়ালিজম’ নিয়ে কথা বলেন। তার মতে, ঋত্বিক ঘটক ছবিটিতে অভিব্যক্তিবাদী উপাদান, যেমন স্তরবিন্যস্ত শব্দপ্রয়োগ, আর বাস্তবধর্মী অভিনয়ের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন। বিশেষ করে সুপ্রিয়া চৌধুরীর অভিনয় ছবিটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। অন্যদিকে কুমার সাহানি কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে ধারণ করা একটি দৃশ্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, ঋত্বিক কীভাবে দর্শককে তার আবেগঘন গল্পের এক ভিন্ন বাস্তবতায় নিয়ে যান, সেই দৃশ্য তার উদাহরণ। ১৯৭৬ সালে মাত্র ৫০ বছর বয়সে মারা যান ঋত্বিক ঘটক। তবে মৃত্যুর পর তার কাজের গুরুত্ব ও প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়েছে। শুধু বাংলা নয়, ভারতীয় চলচ্চিত্রের ভাষা ও নির্মাণশৈলী বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। এফটিআইআইয়ের শিক্ষক হিসেবে তিনি এমন অনেক নির্মাতাকে গড়ে তুলেছিলেন, যারা পরবর্তী সময়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের নতুন ধারার পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন। ষাটের দশকে এফটিআইআইয়ের উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ঋত্বিক। তার ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন কুমার সাহানি, মণি কাউল ও জন আব্রাহামের মতো নির্মাতা। বলিউডের জনপ্রিয় নির্মাতা সুভাষ ঘাইও তার কাছে অভিনয় শিখেছেন। ঘাইয়ের ডিপ্লোমা চলচ্চিত্র ‘ফিয়ার’ পরিচালনা করেছিলেন ঋত্বিক নিজেই। কুমার সাহানি ও মণি কাউল ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রচলিত নির্মাণরীতির বাইরে গিয়ে নতুন ভাষা তৈরি করেন। সাহানির চলচ্চিত্রে দৃশ্য ও আঙ্গিকের নিরীক্ষা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে মণি কাউল ঋত্বিকের চলচ্চিত্রের মহাকাব্যিক নির্মাণরীতি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তার মতে, মহাকাব্যিক চলচ্চিত্রে কাহিনি তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত হয় এবং চরিত্রের পাশাপাশি প্রকৃতি, ইতিহাস ও নানা ভাবনার জন্যও জায়গা তৈরি করে। মালায়ালাম চলচ্চিত্রের বিদ্রোহী নির্মাতা জন আব্রাহামও ঋত্বিকের কাছ থেকে চলচ্চিত্রে ভাবনার বিভিন্ন স্তর তৈরি করার শিক্ষা পেয়েছিলেন। তার ‘আগ্রাহারাথিল কাজুথাই’ (১৯৭৭) ছবিতে সরল বর্ণনার পাশাপাশি রূপক ও বহুস্তরীয় ভাবনার ব্যবহার দেখা যায়। ঋত্বিকের চলচ্চিত্রে ব্যক্তিগত অনুভূতি, সামাজিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যেভাবে একসঙ্গে উঠে এসেছে, তা তার ছাত্রদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পরিচালক অপর্ণা সেন এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন ও ঋত্বিক ঘটককে বাংলা চলচ্চিত্রের তিন মহীরুহ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, চলচ্চিত্রের সামগ্রিক ধারাবাহিকতায় ঋত্বিক হয়তো সত্যজিতের মতো ছিলেন না, কিন্তু তার ফ্রেম, লোকেশন নির্বাচন ও ক্যামেরার লেন্স ব্যবহারের দক্ষতা ছিল অসাধারণ। তার ছবিতে এমন কিছু আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয়েছে, যা দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। এর অন্যতম উদাহরণ ‘মেঘে ঢাকা তারা’র নীতা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য হয়েও উদ্বাস্তু পরিবারের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে সে। একসময় অভিমান ও ক্ষোভ নিয়ে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার দৃশ্যে শোনা যায় দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের শব্দ। যেন নীতার এই চলে যাওয়ার মধ্যেই এক ধরনের দেবীত্বের ইঙ্গিত তৈরি করেন নির্মাতা। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষা খুঁজে পাওয়ার যে চেষ্টা চলছিল, ঋত্বিক ঘটক সেখানে তৈরি করেছিলেন এক স্বতন্ত্র নির্মাণরীতি। তার চলচ্চিত্রে দেশভাগ, উদ্বাস্তু জীবন, মানুষের সংকট, ইতিহাস ও ব্যক্তিগত যন্ত্রণা একাকার হয়ে উঠেছে। বাণিজ্যিক সাফল্য তার জীবনে খুব বেশি আসেনি। আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেও সেগুলোর মধ্যে মাত্র একটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়েছিল। অর্থাভাব ও ব্যক্তিগত নানা সংকটে তার বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র অসমাপ্ত থেকে যায়। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। তবে এসব সীমাবদ্ধতা তার শিল্পীসত্তার প্রভাবকে ম্লান করতে পারেনি। বরং তার ছাত্রদের হাত ধরে সত্তর ও আশির দশকে ভারতীয় চলচ্চিত্রে যে ‘নিউ ওয়েভ’ বা নতুন ধারার সূচনা হয়, তার পেছনে ঋত্বিকের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তার চলচ্চিত্রের দৃশ্যভাষা, শব্দের ব্যবহার, আবেগের গভীরতা ও গল্প বলার ধরন পরবর্তী প্রজন্মের নির্মাতাদের জন্য হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। আজ ভারতীয় চলচ্চিত্রে ঋত্বিক ঘটক ও সত্যজিৎ রায়ের অনুসারীদের একটি নিজস্ব বলয় রয়েছে। রুশ চলচ্চিত্রে আন্দ্রেই তারকোভস্কি ও সের্গেই আইজেনস্টাইনের প্রভাব যেমন স্বতন্ত্র, ভারতীয় চলচ্চিত্রেও তেমনই এক অনন্য অবস্থান ঋত্বিকের। জীবদ্দশায় সীমিত স্বীকৃতি পেলেও সময়ের সঙ্গে তার চলচ্চিত্রের আবেদন বেড়েছে। বাংলা ভাষা ও চলচ্চিত্র-অধ্যয়নের গণ্ডি পেরিয়ে তার কাজ ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক পরিসরে। বিভিন্ন চলচ্চিত্র সংস্থা ও সংগ্রহশালা তার চলচ্চিত্র ডিজিটালভাবে পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করছে। ফলে নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের কাছেও ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র হয়ে উঠছে অনুপ্রেরণার উৎস। এ কারণেই তাকে শুধু একজন প্রভাবশালী নির্মাতা নয়, বলা হয় ‘চলচ্চিত্রকারদের চলচ্চিত্রকার’। শাপেডিয়া