একজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, রামদা হাতে কয়েকজন
গণমাধ্যম ডেক্স
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে সাংবাদিকসহ কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন। আজ শনিবার বিকেল সোয়া চারটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত উপজেলার সদরের বিজনা সেতু এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষের একাধিক ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে হেলমটধারী এক ব্যক্তিকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে প্রতিপক্ষকে ধাওয়া দিতে দেখা যায়। তাঁর আশাপাশের লোকজনের হাতে ছিল লাঠিসোটা। প্রতিপক্ষের লোকজনের হাতেও লাঠিসোটা দেখা যায়।
পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের সময় কয়েকজনের হাতে ছিল রামদা ও ছুরি। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে কয়েকবার ককেটল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।

উপজেলা বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের বিষয়ে সন্ধ্যা সাতটায় কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী মোহাম্মদ রাশেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে। উভয় পক্ষকে নিরাপত্তা দিতে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। ককটেল বিস্ফোরণের ঘটেছে কি না, বলতে পারব না। কারণ, সংঘর্ষ নিয়েন্ত্রণে আমি দৌড়ঝাঁপের মধ্যে ছিলাম।’
উপজেলা বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনে বিএনপির নেতৃত্ব দুই ভাগে বিভক্ত। দুই পক্ষই পৃথকভাবে দলীয় কর্মসূচি পালন করে আসছে। একটি পক্ষ সংসদ সদস্য (এমপি) মুশফিকুর রহমানের অনুসারী। এই পক্ষে আছেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি মোহাম্মদ ইলিয়াস, কসবা উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. ইকলিল আযম, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. কামাল উদ্দিন ও পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি আশরাফ আলীসহ অনেকে।
অপর পক্ষের নেতৃত্বে আছেন জেলা বিএনপির সদস্য কবির আহমেদ ভূঁইয়া। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন কসবা উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফখরুদ্দিন আহমেদ খান ও সাধারণ সম্পাদক শরিফুল হকসহ তাঁদের অনুসারীরা। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কবির আহমেদ ভূঁইয়া প্রথমে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন। পরে মুশফিকুর রহমানকে দলীয় প্রার্থী করে বিএনপি।

একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও উপজেলা বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে জেলা বিএনপির নেতা কবির আহমেদ ভূঁইয়ার অনুসারীরা আজ শনিবার বিকেলে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়। বেলা তিনটার পর তাঁরা আড়াইবাড়ি দরবার শরিফ মাঠ ও কদমতলী এলাকায় জড়ো হতে থাকেন।
অপর দিকে গত বুধবারের একটি ঘটনার প্রতিবাদে সমাবেশের ডাক দেন এমপি মুশফিকুর রহমানের অনুসারীরা। এ জন্য তাঁর অনুসারী ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা কসবা পুরাতন বাজার এলাকায় একই সময়ে জড়ো হন। এর আগে কসবা উপজেলা ও পৌর ছাত্রদল কমিটি নিয়ে গত বুধবার দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও মারামারি হয়।
সংঘর্ষ শুরু যেভাবে
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে কসবা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুল হকের নেতৃত্বে আজ বিকেলে আড়াইবাড়ি দরবার শরিফের মাঠ থেকে একটি শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি উপজেলার কদমতলী মোড়ে শেষ হয়। এরপর সেখানে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা চলছিল। একই সময়ে এমপির অনুসারীরা কদমতলী এলাকায় এলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
দুই পক্ষের মধ্যে ঘণ্টাব্যাপী দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ চলে। এ সময় সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বাজারের দোকানপাটও বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।
সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সংঘর্ষের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মোহনা টিভির উপজেলা প্রতিনিধি হারুনুর রশিদ আহত হয়েছেন।

আহত আরও যাঁদের নাম পাওয়া গেছে, তাঁরা হলেন কসবা উপজেলার বিনাউটি ইউনিয়ন যুবদল জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রাসেল মিয়া, উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক শিমুল মিয়া, কাইয়ুমপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি জুয়েল বাদশা, পৌর ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শফিক মিয়া, মেহারী ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি প্রার্থী মেদেহী হাসান। তাঁরা জেলা বিএনপির সদস্য কবির আহমেদের অনুসারী।
সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমানের অনুসারী কয়েকজনও আহত হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের নাম জানা যায়নি।
আহত নেতা–কর্মীরা কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
সংসদ সদস্যের অনুসারী জেলা বিএনপির সহসভাপতি মোহাম্মদ ইলিয়াস প্রথম আলোকে বলেন, ১ নভেম্বর কসবা উপজেলা ও পৌর ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটিতে ছাত্রদলের প্রকৃত নেতা–কর্মীদের রাখা হয়নি। পদবঞ্চিত নেতা–কর্মীরা আজ প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। আগামীকাল ৮ নভেম্বর উপজেলা পর্যায়ে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালনের জন্য কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। এর মধ্যে কবির আহমেদের অনুসারীরা উপজেলার আড়াইবাড়ি থেকে কদমতলী পর্যন্ত মহড়া দেয়। এ নিয়ে পাল্টপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকলে নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এতে নেতা–কর্মীরা আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে কবির আহমেদের অনুসারী কসবা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘র্যালির পর সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করার সময় মুশফিকুর রহমানের অনুসারীরা আমাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় তাঁরা আমাদের উদ্দেশ করে বোমা নিক্ষেপ ও গুলি করেছে। পুলিশ আমাদের কোনো নিরাপত্তা দেয়নি। তারা প্রতিদিনই আমাদের ছেলেদের পাইলে পিটায়। আমাদের অন্তত ১৭ জন আহত হয়েছে।’
সূত্র: প্রথম আলো