|
| |
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

একটি দৃশ্য আমি সারা জীবন সঙ্গে নিয়ে যাব—বিদায়ী বক্তব্যে রোনালদো

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:৫০ পিএম
২০০ পঠিত
একটি দৃশ্য আমি সারা জীবন সঙ্গে নিয়ে যাব—বিদায়ী বক্তব্যে রোনালদো
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:

একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। পর্তুগালের হয়ে আর খেলবেন না ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি নিজেই দিয়েছেন এই ঘোষণা। পর্তুগিজ ভাষায় দেওয়া রোনালদোর বিদায়ী বক্তব্যের হুবহু বাংলা অনুবাদ তুলে ধরা হলো এখানে—

পর্তুগালের জনগণের উদ্দেশে বলছি, আমাদের জাতীয় দলের সাত নম্বর জার্সিটি ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসে গেছে। আমি কখনোই মনে করিনি জার্সিটি একান্তই আমার। তবে ২৩ বছর ধরে এটি পরার, এর মর্যাদা রক্ষা করার এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের স্টেডিয়ামে এই জার্সি গায়ে প্রতিনিধিত্ব করার সৌভাগ্য ও দায়িত্ব আমার ছিল। আজ সেটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার সময় এসেছে।

সিদ্ধান্তটি নেওয়া সহজ ছিল না। কারণ, কিছু সিদ্ধান্ত শুধু মস্তিষ্ক দিয়ে নেওয়া যায় না, সেগুলো নিতে হয় হৃদয় দিয়েও। ২০০৩ সালের আগস্টে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটিই চিরদিনের জন্য আমার জীবন বদলে দেয়।

জাতীয় দলে কাটানো সময়ের দিকে ফিরে তাকালে শুধু ম্যাচ, গোল, রেকর্ড কিংবা ট্রফির কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে মানুষদের কথা, মনে পড়ে অভিবাসীদের কথা, যাঁরা ৯০ মিনিটের জন্য হলেও পর্তুগালকে একটু বেশি কাছের বলে অনুভব করেছেন। মনে পড়ে লাখ লাখ পর্তুগিজ মানুষের কথা, যাঁদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কখনো দেখা হয়নি, অথচ তাঁরা আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছেন। কারণ, শেষ পর্যন্ত ফুটবল শুধুই একটি খেলার চেয়ে অনেক বড় কিছু। ফুটবল মানে মানুষ, ফুটবল মানে মানুষের আবেগ।

জাতীয় দলের হয়ে পুরো ক্যারিয়ারে আমি নিজের সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। আমি জিততে চেয়েছি, সেরা হতে চেয়েছি, ইতিহাস গড়তে চেয়েছি। নিজের কাছে সব সময়ই অনেক বেশি প্রত্যাশা ছিল। সব সময় আরও বেশি কিছু চেয়েছি, সব সময় বিশ্বাস করেছি, আমরা আরও দূর যেতে পারি। এই জার্সির জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি।

২০২৬ বিশ্বকাপের গ্যালারিতে রোনালদোর ছবি হাতে এক ভক্ত

কিছু বিকেল ও রাত ছিল নিখুঁত। এমন কিছু জয় এসেছে, যা কখনো ভুলব না। আবার এমন কিছু হারও আছে, যেগুলোর কথা মনে পড়লে আজও কষ্ট হয়। আমিও ব্যর্থ হয়েছি, আমিও কষ্ট পেয়েছি। এমন কিছু মুহূর্তও এসেছে, যখন পর্তুগালের মানুষ আমার কাছে যা গভীরভাবে প্রত্যাশা করেছিলেন, তা দিতে পারিনি। কিন্তু কখনো হাল ছাড়িনি। আর সবচেয়ে বড় কথা, পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করার গর্ব কখনো হারাইনি।

এই দীর্ঘ সময়ে আমি খুব সাধারণ কিছু বিষয় শিখেছি। গোলের স্মৃতি একসময় ফিকে হয়ে যায়, ট্রফি জাদুঘরে জায়গা পায়, রেকর্ডও একদিন ভেঙে যায়। কিন্তু এমন একটি বিষয় আছে, যা সময় কখনো মুছে দিতে পারে না—মানুষের হৃদয়ে আমাদের অবস্থান। আমি যদি কখনো আপনাদের আনন্দ দিতে পেরে থাকি, আমার কোনো একটি গোল যদি কখনো আপনাদের কাউকে কাউকে জড়িয়ে ধরার সুযোগ করে দিয়ে থাকে, কোনো দুশ্চিন্তা ভুলিয়ে দিয়ে থাকে কিংবা নিজেদের দেশ নিয়ে গর্বিত হওয়ার উপলক্ষ হয়ে থাকে, তাহলেই আমার সবকিছু সার্থক। পর্তুগিজ হওয়ার অর্থও তো এটাই—আমরা একসঙ্গে কষ্ট পাই, একসঙ্গে ঘুরে দাঁড়াই, আবার নতুন করে বিশ্বাস করতে শিখি।

পর্তুগালের সব সময় এমন তরুণদের প্রয়োজন, যারা স্বপ্ন দেখে; এমন খেলোয়াড়দের প্রয়োজন, যারা কখনো হাল ছাড়ে না; আর এমন নতুন প্রজন্মের প্রয়োজন, যারা বিশ্বাস করে, এর আগে কেউ যে উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি, সেখানেও পৌঁছানো সম্ভব। কারণ, যে দেশ নতুন নতুন বীর তৈরি করে যেতে পারে, সেই দেশ নিজের ওপর বিশ্বাস হারায় না।

জাতীয় দলের সতীর্থদের উদ্দেশে বিশেষ কিছু কথা বলতে চাই। প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি আলিঙ্গন, প্রতিটি তর্ক-বিতর্ক, মাঠে নামার আগে প্রতিটি নীরব মুহূর্ত, একসঙ্গে উদ্যাপন করা প্রতিটি জয় এবং আমাদের আরও শক্তিশালী করে তোলা প্রতিটি পরাজয়ের জন্য ধন্যবাদ। তোমাদের অধিনায়ক হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কিন্তু কোনো অধিনায়ক একা পথ চলতে পারে না। তোমরাও আমার গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এত বছর আমাদের সঙ্গে কাজ করা সব কোচ, কর্মকর্তা, চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট, কিট ম্যানেজার, কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। তোমাদের অনেককেই কখনো ছবিতে দেখা যায়নি। কিন্তু তোমরা না থাকলে সেই ছবিগুলো কখনোই তোলা সম্ভব হতো না।

আমার পরিবারের প্রতিও কৃতজ্ঞতা, তোমরা আমার সঙ্গে এই স্বপ্ন ভাগ করে নিয়েছ। আমার অনুপস্থিতি, ত্যাগ ও জাতীয় দলের প্রয়োজনে এমন কিছু মুহূর্তে তোমাদের নিজেদের প্রাপ্য সময়টুকুও ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারার জন্য ধন্যবাদ। আমি এত দূর আসতে পেরেছি, কারণ আমরা সব সময় একে অপরের হাত ধরে রেখেছি।

পর্তুগালের জনগণের উদ্দেশে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সব পর্তুগিজ মানুষের উদ্দেশে, শেষবারের মতো একটি কথা বলতে চাই, আর সেটি হলো একটি দৃশ্য আমি সারা জীবন সঙ্গে নিয়ে যাব—জাতীয় সংগীত শুরু হওয়ার মুহূর্তটি। আমি নিজের কণ্ঠ শুনতে পাই, সতীর্থদের দেখি, গ্যালারির দিকে তাকাই। দেখি শিশু, মা, বাবা, দাদা-দাদি ও নানা-নানিদের। দেখি সেই পর্তুগিজ মানুষদের, যাঁরা শুধু সেখানে উপস্থিত থাকার জন্য কত দূর থেকে ছুটে এসেছেন। আর সেই কয়েকটি মিনিটের জন্য আমরা আর আলাদা থাকি না। সেখানে কোনো ক্লাব নেই, কোনো রং নেই, কোনো শ্রেণি নেই, কোনো পেশা নেই, কোনো মতামতের ভিন্নতা নেই। সেখানে থাকে শুধু একটি আবেগ—পর্তুগাল। এই অনুভূতিই আমি সারা জীবন বয়ে বেড়াব।

আজ জাতীয় দলের হয়ে মাঠে আমার যাত্রার সমাপ্তি ঘটছে। মাথা উঁচু করেই বিদায় নিচ্ছি। যে পথ পাড়ি দিয়েছি, তা নিয়ে আমি গর্বিত এবং এই মানসিক শান্তি নিয়ে যাচ্ছি যে পর্তুগালের জন্য আমি নিজের সবটুকু দিয়েছি। কিন্তু কখনোই আপনাদের একজন হওয়া বন্ধ করব না। আপনাদের সঙ্গে পর্তুগালের প্রতিটি জয় নিয়ে উল্লাস করব এবং উদ্‌যাপনে শামিল হব।

বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার জন্য আমি সারা জীবন পরিশ্রম করেছি। আজ বুঝতে পারছি, সবচেয়ে বড় জয় ছিল বিশ্বের সেরা দেশটির প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা অর্জন করা। এই ২৩ বছরের জন্য ধন্যবাদ। আমার ওপর বিশ্বাস রাখার জন্য ধন্যবাদ। মাদেইরার ছোট্ট একটি ছেলে যখন বলের পেছনে ছুটত, তখন যে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল, সেই স্বপ্ন বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

সাত নম্বর জার্সিটি থেকে যাবে। এই জার্সি গায়ে পরার গর্ব চিরকাল আমারই থাকবে। পর্তুগাল চিরকাল আমার হৃদয়ে থাকবে।

বিদায়।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।

সূত্র: প্রথম আলো