এমডি নিয়োগে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা দাবি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্তির প্রস্তাব
গণমাধ্যম ডেক্স
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের অবসান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) বিলুপ্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) নিয়োগে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পরিবর্তে অভিজ্ঞ সরকারি ব্যাংকারদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
তার অভিযোগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বহাল থাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর সুশাসন ও জবাবদিহি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যাংক খাতের এসব সমস্যা দূর করতে নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
গত ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পঞ্চম বৈঠকের আগে জমা দেওয়া একটি আলোচনাপত্রে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি। বিষয়টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উত্থাপন করার উদ্যোগ নিয়েছেন এই সংসদ সদস্য।
আলোচনা পত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগ নিয়ে সাম্প্রতিক কয়েকটি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংক থেকে কর্মকর্তা এনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও নির্বাচনের মানদণ্ড স্পষ্ট করার দাবি জানানো হয়েছে। সাউথইস্ট ব্যাংকের একজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালককে জনতা ব্যাংকের এমডি এবং যমুনা ব্যাংকের একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে আরেকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
তার প্রস্তাব, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি ও ডিএমডি নিয়োগ দিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করা যোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে সরকারি ব্যাংকারদের পদোন্নতির সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। আলোচনা পত্রে সোনালী ব্যাংকের এমডি নিয়োগসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের উদাহরণও তুলে ধরেন আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ।
এতে বলা হয়, গত ১৯ অক্টোবর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সোনালী ব্যাংকের এমডির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে। কিন্তু সাত দিনের মাথায় সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে তাঁকে দায়িত্বে বহাল রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। এমন সিদ্ধান্তকে প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ঘাটতি, অনিয়ম এবং নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তার প্রকাশ হিসেবে দেখছেন তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর প্রথমবার প্রকাশ্যে এর আগে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করার ঘোষণা দেন। একই মাসের ২৭ অক্টোবরও তিনি এ প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারেও বিষয়টি ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংসদ সদস্য।
এদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের বিভিন্ন নিয়োগ ও পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নিয়েও ব্যাংক খাতে সমালোচনা রয়েছে।
গত ৩০ আগস্ট দুদকের চার্জশিটভুক্ত আসামি আবুল এহতেশাম আব্দুল মোহাইমিনকে অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে গত বুধবার তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়। এ ছাড়া শিক্ষাজীবনে তৃতীয় বিভাগ এবং নিরীক্ষা আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কাজী আব্দুর রহমানকে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের এমডি নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
একইভাবে শিক্ষাজীবনে তৃতীয় বিভাগ থাকা সত্ত্বেও গোলাম মর্তুজার ডিএমডি হিসেবে পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব সিদ্ধান্ত নিয়োগ ও পদোন্নতির মানদণ্ড নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের আর্থিক দুরবস্থার পেছনেও রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা নিয়োগকে দায়ী করেছেন সংসদ সদস্য। তার মতে, নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব ও জবাবদিহির অভাবের কারণে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মেয়াদ ও অপসারণের বিষয়টি আইনের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। যাতে নির্বাহী বিভাগ ইচ্ছামতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে হস্তক্ষেপ করতে না পারে। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন করা এবং পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম মূল্যায়নে মূল কর্মসম্পাদন সূচক চালুর সুপারিশ করেছেন।
এ ছাড়া ব্যাংকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পৃথক করার প্রস্তাব রয়েছে তার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের নীতিমালার আলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মালিকানা সরকারের হাতে থাকলেও নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্ব স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংক থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ পদে কর্মকর্তা নিয়োগের ঘটনায় সরকারি ব্যাংকারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘদিন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করা কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করে বাইরে থেকে নিয়োগ দেওয়া হলে তাদের পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হবে। এতে ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের বিকাশও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ২০১০ সালের ৬ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গঠন করা হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং নীতিনির্ধারণের দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে বিভাগটি গঠিত হলেও এর কার্যকারিতা ও ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পরিচালনা পর্ষদ গঠনে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ বিভাগটির কার্যক্রমকে বিতর্কিত করেছে।
সূত্র: কালবেলা