কী হইতে কী হইল
গণমাধ্যম ডেক্স
আমার কাছের কলিগ, ছোট ভাই নোয়েল। বাবা ওর নাম রাখতে চেয়েছিল নোবেল আর মা কোয়েল। এই নিয়ে বাধে দুজনের তীব্র ঝগড়া। এরপর মায়ের শান্তি প্রস্তাব, দুজনের কথাই থাক, নোবেলের ‘নো’ আর কোয়েলের ‘য়েল’, একসাথে নোয়েল।
গল্পটা প্রথমবার শুনে আমি উচ্চস্বরে হেসেছিলাম। নোয়েল খুব মজা করে গল্প বলতে পারে, সব সময় হাসিখুশি থাকে। তাই আজ ওর মনটা বিষণ্ন দেখে এগিয়ে গেলাম। চোখের নিচে কালি পড়েছে, বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।
‘কী হয়েছে, নোয়েল?’
নোয়েল মাথা তুলে বলল, ‘ভাই, পায়েলের সাথে আমার বিয়েটা ভেঙে গেছে।’
‘আরে বলো কী? কেন? তোমাদের এত দিনের প্রেম…’
‘আমাদের বাড়ি মোহাম্মদপুরে, তাই।’
‘মানে?’
‘পায়েলের পরিবার এই শুক্রবার এসেছিল আমাদের বাসায়। বিয়ের দিন–তারিখও ঠিক হয়েছিল। কিন্তু তারা ফেরার পথে ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে। আইফোন, টাকা, গহনা সব তো গেছেই। পায়েলের বাবার স্যান্ডো গেঞ্জিটা পর্যন্ত ছিনতাইকারী রেখে দিয়েছে।’
‘কিন্তু এতে তোমার দোষ কোথায়?’
‘পায়েলের মা–বাবা বলছে, মোহাম্মদপুরে মেয়ের বিয়ে দেবে না।’
‘আরে অন্য এলাকায় বাসা নাও।’
‘ভাই, অনেকভাবেই বোঝানোর চেষ্টা করছি। দেখি, কী হয়। দোয়া করবেন।’
সারা দিন নোয়েলকে একের পর এক বুদ্ধি দিতে লাগলাম, যাতে বিয়েটা জোড়া লাগে।
বসকে বলে একটু আগেভাগেই অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লাম। কারণ, আজকে সোনিয়ার সাথে নিউমার্কেটে যাওয়ার কথা। একটা অ্যাপে চালিত বাইকে চড়ে বসলাম। কিন্তু বাইকার উল্টাপাল্টা বাইক চালাচ্ছে, ব্রেক করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। একটু পর রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা রেঞ্জ রোভারে সজোর ধাক্কা দিল বাইক। ভাগ্যিস গাড়িতে কেউ ছিল না। রাস্তায় লুটিয়ে পড়লাম। কনুই আর হাঁটুর ছাল উঠে গেল আমার। তবু দ্রুত উঠে দাঁড়ালাম। কারণ, নিউমার্কেটে পৌঁছাতে দেরি হলে পিঠের ছালও আর থাকবে না।
বাইকারকে বললাম, ‘কী রে ভাই, বাইকের ব্রেক নাই?’
বাইকার মাথা চুলকে বলল, ‘সকাল থেকে ব্রেক কাজ করছে না। ভাবছিলাম, আপনাকে নামিয়ে দিয়ে ব্রেক ঠিক করতে যাব।’
‘এই সব কী কন? আরেকটু হলে তো নিউমার্কেটের বদলে গোরস্তানে নামিয়ে দিতেন।’
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে একটা সিএনজিতে উঠলাম।
নিউমার্কেটে পৌঁছে দেখলাম, সোনিয়া আমার অপেক্ষায় না থেকে কেনাকাটা শুরু করে দিয়েছে।
হঠাৎ পুরো মার্কেট ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল, সেই সঙ্গে বিকট শব্দ। আতঙ্ক আমাকে পেয়ে বসল। কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না। এত লোকের ভিড়ে সোনিয়াকেও হারিয়ে ফেলেছি। আমি বললাম, ‘সোনিয়া, সোনিয়া, আগুন আগুন।’ ভাগ্য ভালো সোনিয়াকে ধোঁয়ার মধ্যেই পেয়ে গেলাম। দ্রুত ওর হাত ধরে দৌড় দিলাম। যেভাবে হোক, আমাদের বাঁচতে হবে। সোনিয়া চিৎকার করে কী যেন বলছে, হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু আমি কিছুতেই ওকে ছাড়ছি না। ওর হাত শক্ত করে ধরে দৌড়েই যাচ্ছি। মিনিট তিনেক পর ধোঁয়া কমে এল, নিরাপদ জায়গা দেখে থামলাম।
হঠাৎ সোনিয়া বলল, ‘আগুন কই পেলেন? এটা তো মশার ওষুধ।’
গলাটা কেমন অন্য রকম লাগছে, ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, আমি অচেনা একটা মেয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছি।
হাত ছেড়ে দিয়ে চমকে বললাম, ‘স৵রি, আমি ভেবেছি আমার বউ।’
মেয়েটা কিছু বলতে যাচ্ছিল। এমন সময় সোনিয়া এসে হাজির, অনেক স৵রিটরি বলে মেয়েটাকে ম্যানেজ করল।
সোনিয়া ঝাঁজালো গলায় বলল, ‘তুমি নিজের বউকেও চেনো না! তোমার সাথে সংসার করব না আমি।’
এই বলে হাঁটা দিল উল্টো দিকে।
আমি নোয়েলকে ফোন দিলাম, ‘নোয়েল, আমারও বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। দোয়া কোরো।’
‘কী বলেন! আপনার হয়ে যাওয়া বিয়ে কীভাবে ভেঙে যাচ্ছে?’
‘বউ চিনতে ভুল করেছি।’
ফোন রেখে আমি সোনিয়ার পেছনে ছুটলাম। আজকে আমার খবর আছে।
সূত্র: প্রথম আলো