|
| |
সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

ছাতিমের গন্ধে মন মাতে কেন

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:০০ এএম
৩৯৭ পঠিত
ছাতিমের গন্ধে মন মাতে কেন
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:

সন্ধ্যার দিকে হয়তো হাঁটতে বেরিয়েছেন, বাতাসে তখন হালকা হিম। হঠাৎ একটা ভারী ও মিষ্টি গন্ধ নাকে এসে লাগল। ওপরে তাকালে চোখে পড়বে বিশাল এক গাছ, যার ডালের প্রতিটি গিঁট থেকে পাতাগুলো ছাতার শিকের মতো চারদিকে ছড়িয়ে আছে। এটাই সেই ছাতিম গাছ, যা সপ্তপর্ণী নামেও পরিচিত। বিজ্ঞানীরা একে ডাকেন Alstonia scholaris নামে।

এই গাছ বেশ উঁচু হয়, ডাল বা পাতা ছিঁড়লে সাদা আঠালো কষ বেরিয়ে আসে। এক গিঁটে সাধারণত সাতটি পাতা থাকে বলেই এর নাম হয়েছে সপ্তপর্ণী। তবে এর ফুলগুলো কিন্তু একেবারে সাদামাটা, আকারে ছোট আর রংটা ফিকে সবুজাভ-সাদা।

এর গন্ধ নিয়ে অবশ্য মানুষের মতামত আলাদা। কারও কাছে এটি নেশাধরানো, আবার কারও কাছে মাথাধরানো। তবে এর গন্ধ যে কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়, সে কথায় প্রায় সবাই একমত। প্রশ্ন হলো, এত ছোট একটি ফুল থেকে এত জোরালো গন্ধ আসে কোথা থেকে?

ছাতিম ফুলগুলো কিন্তু একেবারে সাদামাটা, আকারে ছোট আর রংটা ফিকে সবুজাভ-সাদা

এই গন্ধের শুরুটা হয় মূলত পাপড়িতে। ফুলের পাপড়ির ওপরের স্তরের কোষে গাছ কিছু বিশেষ রাসায়নিক যৌগ তৈরি করে। এগুলো এতটাই হালকা যে সহজেই বাষ্প হয়ে বাতাসে মিশে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের বলা হয় উদ্বায়ী যৌগ। আমরা নাকে যে গন্ধ পাই, সেটা আসলে বাতাসে ভেসে বেড়ানো এই বাষ্পেরই কণা।

এক গিঁটে সাধারণত সাতটি পাতা থাকে বলেই এই ছাতিম গাছের নাম হয়েছে সপ্তপর্ণী। তবে এর ফুলগুলো কিন্তু একেবারে সাদামাটা, আকারে ছোট আর রংটা ফিকে সবুজাভ-সাদা।

ফুলের গন্ধে সাধারণত কয়েক দলের যৌগ থাকে। টারপিনয়েড তার মধ্যে একটি; যেমন লিনালুল, যা লেবুফুল আর ল্যাভেন্ডারের ঘ্রাণেও মেলে। আরেকটি দল হলো বেনজেনয়েড, যা গাছ তৈরি করে ফিনাইলঅ্যালানিন নামের অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে। ছাতিমের ফুলেও এ ধরনের যৌগ পাওয়ার কথা উঠে এসেছে কিছু গবেষণায়। তবে নমুনাটি কোথাকার বা তা কীভাবে মাপা হয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে গবেষণার ফল বদলে যেতে পারে। তাই নির্দিষ্ট করে ‘এই একটি যৌগই ছাতিমের গন্ধ তৈরি করে’—এমনটা বলার জো নেই। বরং কয়েক ডজন যৌগের সুনির্দিষ্ট মিশ্রণেই তৈরি হয় এর আসল গন্ধ। ব্যাপারটা অনেকটা রান্নার মশলার মতো; মশলা একই হলেও অনুপাত বদলে গেলে স্বাদ যেমন অন্য রকম হয়ে যায়, গন্ধের বেলাতেও ঠিক তা-ই ঘটে।

সন্ধ্যা নামলেই ছাতিমের গন্ধ বাড়ে, এই অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই আছে। এর কারণ অবশ্য একটি নয়। মানুষের মতো উদ্ভিদেরও নিজস্ব একটি জৈব ঘড়ি আছে, যাকে বলা হয় সার্কাডিয়ান ছন্দ। এই ছন্দের কারণেই অনেক ফুল দিনের নির্দিষ্ট সময়ে বেশি গন্ধ ছড়ায়। যেসব ফুলের অতিথি রাতের পতঙ্গ, তারা রাতেই বেশি গন্ধ ছড়ায়। ছাতিমের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা, যদিও এ নিয়ে একেবারে অকাট্য প্রমাণের কিছুটা অভাব রয়েছে।

মানুষের মতো উদ্ভিদেরও নিজস্ব একটি জৈব ঘড়ি আছে, যাকে বলা হয় সার্কাডিয়ান ছন্দ। এই ছন্দের কারণেই অনেক ফুল দিনের নির্দিষ্ট সময়ে বেশি গন্ধ ছড়ায়।

তবে এর পেছনে আবহাওয়ারও বড় হাত আছে। দুপুরে পরিবেশের গরম বাতাস ওপরের দিকে উঠে যায়, আর ফুলের গন্ধকেও সঙ্গে করে নিয়ে যায়। কিন্তু সন্ধ্যায় বাতাস ঠান্ডা ও স্থির হয়, বাড়ে আর্দ্রতা। গন্ধের কণাগুলো তখন মাটির কাছাকাছি স্তরে জমে থাকে। ছাতিম ফুল ফোটে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের দিকে, ঠিক এই হিম হিম আবহাওয়ার মধ্যেই। তার ওপর রাতে চারপাশের ধুলো, ধোঁয়া আর রান্নার গন্ধ কমে আসে। ফলে ছাতিমের মিষ্টি গন্ধটা আমাদের নাকে আলাদাভাবে ধরা পড়ে।

ছাতিমের ফুলগুলো থোকা বা গুচ্ছ হয়ে ফোটে

গাছ কিন্তু আমাদের মুগ্ধ করার জন্য এই গন্ধ ছড়ায় না। এক জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে থাকা গাছকে তার পরাগ অন্যের কাছে পৌঁছে দিতে পতঙ্গের ওপরই নির্ভর করতে হয়। ছাতিমের ফুলগুলো থোকা বা গুচ্ছ হয়ে ফোটে। উদ্ভিদবিদদের মতে, সেখানে মৌমাছি, মাছি আর রাতের নানা পোকা উড়ে আসে। পতঙ্গরা এই গন্ধের টানেই ছুটে আসে, মধু খায়, আর গায়ে পরাগ মেখে উড়ে যায় পরের ফুলে। পরাগায়ন শেষ হলেই ফুল ঝরে পড়ে। তখন ডালে ঝুলতে দেখা যায় সরু ও লম্বা জোড়া ফল, যার ভেতরে থাকে বীজ। ছাতিমের এই গন্ধটা আসলে পোকাদের উদ্দেশে গাছের এক নীরব ডাক, আমরা মানুষেরা কেবল তার অনাহূত শ্রোতা!

উদ্ভিদবিদদের মতে, ছাতিমের ফুলগুলোতে মৌমাছি, মাছি আর রাতের নানা পোকা উড়ে আসে। পতঙ্গরা এই গন্ধের টানেই ছুটে আসে, মধু খায়, আর গায়ে পরাগ মেখে উড়ে যায় পরের ফুলে।

তাহলে ছাতিমের গন্ধে আমাদের মন এত আচ্ছন্ন হয় কেন? মানুষের নাকে প্রায় চার শ ধরনের ঘ্রাণ-গ্রাহক রয়েছে। একটি নির্দিষ্ট যৌগ যেমন একাধিক গ্রাহকে সাড়া জাগাতে পারে, তেমনি একটি গ্রাহকও একাধিক যৌগে সাড়া দিতে পারে। ছাতিমের অনেকগুলো যৌগ একসঙ্গে নাকে প্রবেশ করলে গ্রাহকগুলোর সংকেতে মস্তিষ্কে একটি নির্দিষ্ট নকশা তৈরি হয়। মস্তিষ্ক সেই নকশা পড়েই চিনে ফেলে—আরে, এটা তো ছাতিমের গন্ধ!

এরপর যা ঘটে, সেটাই আসল বৈজ্ঞানিক ম্যাজিক! গন্ধের সংকেতটি আমাদের ঘ্রাণ-বাল্ব হয়ে প্রায় সরাসরি মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা আর হিপোক্যাম্পাসে গিয়ে পৌঁছায়। মস্তিষ্কের এই দুটি অংশ মানুষের আবেগ আর স্মৃতি সামলায়। চোখ বা কানের সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছানোর পথ এতটা সংক্ষিপ্ত নয়।

অনেকের কাছেই ছাতিম মানে শীত আসার ঠিক আগমুহূর্তের স্মৃতি

ঠিক এ কারণেই চেনা কোনো গন্ধ হঠাৎ করেই আমাদের মনে করিয়ে দেয় ছোটবেলার স্কুলমাঠ, পুজোর ছুটি বা প্রিয় কারও মুখ। অনেকের কাছেই ছাতিম মানে শীত আসার ঠিক আগমুহূর্তের স্মৃতি। গন্ধটা নাকে আসামাত্রই পুরোনো সেই দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

স্কুলের সঙ্গে এই গাছটির বেশ পুরোনো একটি সম্পর্কও আছে। ছাতিমের হালকা কাঠ দিয়ে একসময় শিক্ষার্থীদের লেখার স্লেট বা ব্ল্যাকবোর্ড বানানো হতো। তাই ইংরেজিতে একে বলা হয় ব্ল্যাকবোর্ড ট্রি। আর এর প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে scholaris শব্দটি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনের ছাতিমতলাও অত্যন্ত বিখ্যাত। সেখানে বসে ধ্যান করতেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, আর শান্তিনিকেতন আশ্রমের সূচনাও হয়েছিল সেখান থেকেই।

স্কুলের সঙ্গে এই ছাতিমের বেশ পুরোনো একটি সম্পর্কও আছে। ছাতিমের হালকা কাঠ দিয়ে একসময় শিক্ষার্থীদের লেখার স্লেট বা ব্ল্যাকবোর্ড বানানো হতো। তাই ইংরেজিতে একে বলা হয় ব্ল্যাকবোর্ড ট্রি।

কিন্তু সবার তো আর এই গন্ধটা ভালো লাগে না। কারও কারও মাথা ধরে যায়। গাছের ঠিক নিচে বা বদ্ধ জায়গায় গন্ধের কণাগুলো অনেক ঘন হয়ে থাকে। ঘ্রাণের একটা অদ্ভুত নিয়ম আছে—একই যৌগ বাতাসে কম মাত্রায় থাকলে তা মিষ্টি লাগে, আর বেশি মাত্রায় থাকলে ভারী ও অস্বস্তিকর ঠেকে। রজনীগন্ধা বা জুঁই ফুলের বেলাতেও এ কথাটা খাটে। এর সঙ্গে আবার জড়িয়ে আছে ঘ্রাণ-গ্রাহকের জিনের সামান্য তফাত, যে কারণে একই গন্ধ একজনের কাছে মোহনীয় সুবাস মনে হয়, তো অন্যজনের কাছে মনে হয় ভীষণ বাড়াবাড়ি। আর সেই সঙ্গে যুক্ত হয় মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি। ছাতিমতলায় কারও শৈশবের ভালো কোনো দিন জড়িয়ে থাকলে গন্ধটা তাঁর কাছে মধুর লাগবেই। আবার অসুখ বা দুশ্চিন্তার কোনো সময়ের সঙ্গে গন্ধটি জড়িয়ে থাকলে উল্টোটাও হতে পারে।

কাজেই ছাতিমের মনমাতানো গন্ধের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো একটি কারণ নেই। ফুলের পাপড়ির বিচিত্র যৌগের মিশ্রণ, গাছের নিজস্ব জৈব ঘড়ি, সন্ধ্যার স্থির ঠান্ডা বাতাস, পতঙ্গের পরাগায়নের প্রয়োজন এবং সর্বোপরি আমাদের নাক ও মস্তিষ্কের অদ্ভুত সংযোগ—সবকিছুর এক অপূর্ব সম্মিলনেই তৈরি হয় চমৎকার এই অভিজ্ঞতা।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: প্রথম আলো