ঢাকায় আট অঞ্চলে চলবে আট রঙের ই-রিকশা, চালকদের লাইসেন্স আপাতত নয়
গণমাধ্যম ডেক্স
রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে ঢাকাকে আটটি অঞ্চলে ভাগ করা হবে। প্রতিটি অঞ্চলের ই-রিকশার জন্য থাকবে আলাদা রং। এক অঞ্চলে নিবন্ধিত রিকশা অন্য অঞ্চলে চলতে পারবে না। তবে আপাতত ই-রিকশাচালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে চালকদের পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। নিবন্ধন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পর পর্যায়ক্রমে তাঁদের লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম আজ রোববার দুপুরে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানিয়েছেন।
ই-রিকশা চলাচলের নতুন বিধিমালার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামীকাল সোমবার থেকে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশন নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করতে পারবে। বর্তমানে যাঁরা এসব রিকশা চালাচ্ছেন, তাঁদের আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় চারটি করে মোট আটটি অঞ্চল করা হবে। প্রতিটি অঞ্চলের ই-রিকশার রং হবে আলাদা। কোন অঞ্চলে কতটি রিকশা চলবে, তা সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ আলোচনা করে নির্ধারণ করবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিধিমালা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় চলাচলকারী সব ই-রিকশা সরিয়ে দেওয়া হবে না। পর্যায়ক্রমে নিবন্ধন দেওয়া এবং অবৈধ ই-রিকশা অপসারণ করা হবে।
আট অঞ্চলে আলাদা রং, সংখ্যা নির্ধারণ পরে
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় চারটি করে মোট আটটি অঞ্চল করা হবে। প্রতিটি অঞ্চলের ই-রিকশার রং হবে আলাদা। কোন অঞ্চলে কতটি রিকশা চলবে, তা সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ আলোচনা করে নির্ধারণ করবে।
দুই যাত্রীর ধারণক্ষমতার ই-রিকশার নিবন্ধন ফি আট হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি চার হাজার টাকা। চার যাত্রীর ই-রিকশার ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফি ১০ হাজার ও বার্ষিক নবায়ন ফি পাঁচ হাজার টাকা। প্রতিবছর ফিটনেস সনদ নিয়ে নিবন্ধন নবায়ন করতে হবে।
ই-রিকশার নিবন্ধনের সংখ্যায় আপাতত কোনো সীমা রাখা হয়নি জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নিবন্ধন পেতে হলে বর্তমানে চলাচলকারী রিকশাগুলোকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ চলাচলের অঞ্চল, সড়ক, রং ও সংখ্যা চূড়ান্ত করবে।
এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চালানো যাবে না বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
আপাতত চালকদের লাইসেন্স নয়
বিধিমালায় চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্সের ব্যবস্থা থাকলেও এখনই তা কার্যকর করা হচ্ছে না জানিয়ে মীর শাহে আলম বলেন, একসঙ্গে লাখ লাখ চালক লাইসেন্স নিতে গেলে সেই চাপ সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনগুলোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা নিবন্ধনের প্রক্রিয়াটা আগে শুরু করি। নিবন্ধন প্রক্রিয়ার কিছুদূর এগিয়ে গেলে এটার জন্য আলাদা একটা প্রজ্ঞাপন জারি করে তখন ড্রাইভিং লাইসেন্সে যাব।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আপাতত রিকশার মালিকেরা চালকদের পরিচয়পত্র দেবেন। পরে পর্যায়ক্রমে তাঁদের লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে।
একজনের নামে সর্বোচ্চ পাঁচটি
মীর শাহে আলম বলেন, নতুন বিধিমালায় একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হয়েছে। একজন ব্যক্তি এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন মিলিয়ে মোট পাঁচটি রিকশা নিবন্ধন করতে পারবেন।
প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নম্বরপ্লেট দেওয়া হবে। এটি রিকশার দৃশ্যমান স্থানে রাখতে হবে। কিউআর কোডে নিবন্ধন নম্বর, মালিক ও চালকের তথ্য, নিবন্ধনকারী সিটি করপোরেশন এবং চলাচলের অঞ্চলের পরিচয় থাকবে বলেও জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
নিবন্ধনের তারিখ থেকে একটি ই-রিকশার ব্যবহারযোগ্য মেয়াদ হবে ১২ বছর। মেয়াদ শেষে নম্বরপ্লেটসহ নিবন্ধন বাতিল হবে।
দুই যাত্রীর ধারণক্ষমতার ই-রিকশার নিবন্ধন ফি আট হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি চার হাজার টাকা। চার যাত্রীর ই-রিকশার ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফি ১০ হাজার ও বার্ষিক নবায়ন ফি পাঁচ হাজার টাকা। প্রতিবছর ফিটনেস সনদ নিয়ে নিবন্ধন নবায়ন করতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক নিবন্ধন ফি একবারই দিতে হবে। এরপর প্রতিবছর নবায়ন ফি দিতে হবে। নম্বরপ্লেটের জন্য নেওয়া হবে এক হাজার টাকা। এসব অর্থ চালকের পরিবর্তে মালিককে পরিশোধ করতে হবে।
বুয়েটের নকশা অনুযায়ী বদলাতে হবে কাঠামো
বর্তমানে চলাচলকারী ই-রিকশাগুলো বুয়েটের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত নকশা অনুযায়ী কাঠামোগত পরিবর্তন করে অনুমোদন নিতে পারবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষরসহ ফিটনেস সনদ লাগবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
লাখ লাখ রিকশার কাঠামো পরিবর্তনের সক্ষমতা বুয়েটের আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বুয়েট নিজে রিকশার কাঠামো পরিবর্তন করবে না; তারা নকশা দিয়েছে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিয়ে সেই নকশা অনুযায়ী রিকশা পরিবর্তন করবে।
নতুন ই-রিকশার নিবন্ধন ও নবায়নের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও ফিটনেস সনদের শর্ত মানতে হবে। নিবন্ধন বা নবায়ন ছাড়া কোনো ই-রিকশা সড়কে চলতে পারবে না।
সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার
বিধিমালা অনুযায়ী, ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় এই সীমা হবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার। প্রতিটি রিকশায় গতিমাপক বা দূরত্বমাপক যন্ত্র রাখতে হবে। আকারভেদে চালক ছাড়া সর্বোচ্চ দুই অথবা চারজন যাত্রী বহন করা যাবে।
জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বাস চলাচলের প্রধান সড়ক, ফুটপাত এবং প্রশাসনের নিষিদ্ধ করা সড়কে এসব রিকশা চলাচল করতে পারবে না। ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে সিটি করপোরেশন পার্কিংয়ের জায়গা নির্ধারণ করবে।
নিবন্ধন ছাড়া চলাচল, অতিরিক্ত গতি ও যাত্রী বহন, অননুমোদিত ব্যাটারি ব্যবহার, অনুমোদন ছাড়া মোটর বা কাঠামো পরিবর্তন এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত এলাকায় চলাচল অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ছাড়া যাত্রীর পরিবর্তে মালামাল পরিবহন, ট্রাফিক সংকেত অমান্য ও দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ
ই-রিকশার ভাড়া নিবন্ধন কার্যক্রমের পর নির্ধারণ করা হবে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মালিকপক্ষ, ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি করপোরেশন যৌথভাবে বসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ঠিক করবে। পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করা হবে।
ভাড়া নির্ধারণের আলোচনায় চালকদের রাখা হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেখানে মালিকপক্ষ থাকবে। ভাড়া নির্ধারণে চালকদের ভূমিকা নেই।
চার্জিং স্টেশনেরও অনুমোদন লাগবে
ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার কেন্দ্রগুলোও অনুমোদনের আওতায় আনা হবে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌরবিদ্যুতে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে পারবে, এমন কেন্দ্রকে সিটি করপোরেশন অনুমোদন বা ট্রেড লাইসেন্স দেবে।
চার্জিং স্টেশনে সৌরবিদ্যুৎ ও গ্রিডের বিদ্যুতের সমন্বিত ব্যবস্থা রাখার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। এর মাধ্যমে দিনের বেলায় উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়া এবং রাতে গ্রিডের বিদ্যুৎ দিয়ে ব্যাটারি চার্জ করা যাবে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে চার্জ দেওয়া হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেটরা তদারক করবেন।
পুরোনো বা অকার্যকর ব্যাটারি খোলা জায়গা, মাটি, জলাশয় কিংবা সাধারণ বর্জ্যের মধ্যে ফেলা বা পোড়ানো যাবে না। নতুন ব্যাটারি বিক্রির সময় বিক্রেতাকে পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ করে পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় পাঠাতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ব্যাটারি ভাঙা বা গলানো যাবে না বলেও মন্তব্য করেছেন প্রতিমন্ত্রী।
এক মাস পর অগ্রগতি জানাবে সরকার
রাজধানীতে বর্তমানে কতটি ই-রিকশা চলছে এবং পুরোনো রিকশাগুলোর কাঠামো পরিবর্তনের কাজ কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা বা সময়সীমা জানাননি প্রতিমন্ত্রী।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, এক মাস পর আবার সাংবাদিকদের সঙ্গে বসে কতটি নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে, কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং অবৈধ রিকশা কবে সরানো হবে, তা জানানো হবে।
আপাতত ১৩টি সিটি করপোরেশনে বিধিমালাটি কার্যকর হবে জানিয়ে মীর শাহে আলম বলেন, পৌরসভায় এ ব্যবস্থা চালু করতে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করতে হবে। এরপর অন্যান্য শহরের জন্য বিধিমালা করা হবে।
বর্তমান চালকদের উদ্দেশে মীর শাহে আলম বলেন, ‘আপাতত যে যেভাবে চলছে, চলতে থাকবে। নিয়ম মেনে পর্যায়ক্রমে আমরা নিবন্ধন দিতে থাকব এবং পর্যায়ক্রমে আমরা অবৈধ ব্যাটারিচালিত ই-রিকশাগুলি অপসারণের ব্যবস্থা করব।’
সূত্র: প্রথম আলো