তরুণদের টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আশার আলো, ছয় মাসে রেমিশন ৫৪ শতাংশের
গণমাধ্যম ডেক্স
তরুণ বয়সে টাইপ ২ ডায়াবেটিস শনাক্ত হলে জীবনযাপনে পরিবর্তন এনে রোগের রেমিশন সম্ভব। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামে ছয় মাসে ৫৪ শতাংশ রোগীর উপশম হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বাড়ছে টাইপ ২ ডায়াবেটিস। সাধারণত এই রোগকে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে নতুন এক গবেষণা বলছে, পরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত ব্যায়ামের সমন্বয়ে অল্প বয়সে শনাক্ত হওয়া টাইপ ২ ডায়াবেটিসের রেমিশন সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, নিবিড় জীবনযাপন পরিবর্তন কর্মসূচি অনুসরণকারী ৫৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মাত্র ছয় মাসে রেমিশন পেয়েছেন। বিপরীতে প্রচলিত চিকিৎসা গ্রহণকারীদের মধ্যে এ হার ছিল ৪ শতাংশ।
গবেষণাটি ইউরোপিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য স্টাডি অব ডায়াবেটিসের (EASD) বার্ষিক সভায় উপস্থাপন করা হয়। পরে এটি প্রকাশিত হয় চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট রিজিওনাল হেলথ—আমেরিকাস-এ। কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাবেরী দাশগুপ্ত, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লেস্টারের অধ্যাপক থমাস ইয়েটস এবং তাঁদের সহকর্মীরা গবেষণাটি পরিচালনা করেন।
কম বয়সে ডায়াবেটিস কেন উদ্বেগের

অল্প বয়সে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের অবনতি দ্রুত ঘটতে পারে। পাশাপাশি হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকায় স্বাভাবিক আয়ু ও জীবনযাত্রার মানও প্রভাবিত হতে পারে।
রেমিশন বলতে বোঝায়, রক্তে শর্করার মাত্রা ডায়াবেটিস নির্ণয়ের সীমার নিচে নেমে আসা এবং কোনো গ্লুকোজ-কমানোর ওষুধ ছাড়াই সেই অবস্থা বজায় থাকা। তবে রেমিশন মানেই ডায়াবেটিস চিরতরে নিরাময় হওয়া নয়। এ অবস্থাতেও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও জীবনযাপনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি।
আগের গবেষণায় দেখা গেছে, খুব কম ক্যালরির খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করে অনেকের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের রেমিশন সম্ভব। নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানতে চেয়েছেন, এর সঙ্গে পরিকল্পিত ব্যায়াম যুক্ত করলে ফল আরও ভালো হয় কি না।
যেভাবে পরিচালিত হয়েছে গবেষণা

ইংল্যান্ড ও কানাডার তিনটি কেন্দ্রে—লেস্টার, মন্ট্রিয়ল ও এডমন্টনে—এই র্যান্ডমাইজড ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালিত হয়। এতে ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী, প্রাথমিক পর্যায়ের টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ও স্থূলতায় ভোগা ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁরা কেউই ইনসুলিন গ্রহণ করছিলেন না।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ৯৬ জন এতে অংশ নেন। তাঁদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এক দল প্রচলিত চিকিৎসা চালিয়ে যান। অন্য দলকে দেওয়া হয় নিবিড় জীবনযাপন পরিবর্তন কর্মসূচি।
এই কর্মসূচিতে ছিল প্রতিদিন ৮০০ থেকে ৯০০ ক্যালরি গ্রহণ এবং সপ্তাহে তিন দিন অ্যারোবিক ও রেজিস্ট্যান্স ব্যায়াম। এর মধ্যে দুই দিন ছিল বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে ব্যায়াম।
প্রথম ১২ সপ্তাহ ছিল ওজন কমানোর পর্যায়। এ সময় কঠোরভাবে ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পরবর্তী ১২ সপ্তাহে ওজন ধরে রাখার উপযোগী খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
২৪ সপ্তাহ পর অংশগ্রহণকারীদের রক্তে এইচবিএ১সি (HbA1c) পরীক্ষা করা হয়। রেমিশন নির্ধারণের জন্য শর্ত ছিল, এইচবিএ১সি ৬ দশমিক ৫ শতাংশের নিচে থাকতে হবে এবং অন্তত ১২ সপ্তাহ ধরে কোনো গ্লুকোজ-কমানোর ওষুধ গ্রহণ করা যাবে না।
ফলাফলে বড় পার্থক্য

গবেষণায় নিবিড় জীবনযাপন পরিবর্তন কর্মসূচির দলে থাকা ৫০ জনের মধ্যে ২৭ জন, অর্থাৎ ৫৪ শতাংশ রেমিশন পান। অন্যদিকে প্রচলিত চিকিৎসা নেওয়া ৪৬ জনের মধ্যে রেমিশন হয় মাত্র ২ জনের, যা ৪ শতাংশ।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রচলিত চিকিৎসার তুলনায় নিবিড় কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের রেমিশনের সম্ভাবনা ছিল প্রায় ২১ গুণ বেশি।
ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও দুই দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। নিবিড় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারীরা গড়ে ৮ দশমিক ৪ কেজি ওজন কমিয়েছেন। তাঁদের গড় ওজন ১০০ দশমিক ৭ কেজি থেকে কমে ৯২ দশমিক ৩ কেজিতে দাঁড়ায়। অন্যদিকে প্রচলিত চিকিৎসা গ্রহণকারীরা গড়ে মাত্র ১ দশমিক ২ কেজি ওজন কমিয়েছেন।
গবেষণায় গুরুতর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তবে নিবিড় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কোষ্ঠকাঠিন্য, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা ও ক্লান্তির মতো কিছু হালকা উপসর্গ দেখা গেছে।
কেমন ছিল খাদ্যতালিকা

নিবিড় কর্মসূচির অন্যতম প্রধান দিক ছিল নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস। প্রতিদিন ৮০০ থেকে ৯০০ ক্যালরি গ্রহণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। খাদ্যের পুষ্টি উপাদানের অনুপাত ছিল ৩০ শতাংশ প্রোটিন, ৫০ শতাংশ কার্বোহাইড্রেট ও ২০ শতাংশ চর্বি।
খাদ্যাভ্যাসটি কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছিল।
• প্রথম দুই সপ্তাহ: সব খাবারের পরিবর্তে বিশেষভাবে তৈরি পুষ্টিকর মিল রিপ্লেসমেন্ট পণ্য দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যে অপটিফাস্ট এবং কানাডায় প্রোটিডায়েট ব্যবহার করা হয়েছিল।
• তৃতীয় থেকে দ্বাদশ সপ্তাহ: একই ক্যালরিসীমা বজায় রেখে প্রতিদিন একটি সাধারণ খাবার খাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় সব উৎস মিলিয়ে ৬০ থেকে ৯০ গ্রাম প্রোটিন, এক পরিবেশন ফল এবং দুই পরিবেশন শর্করাবিহীন শাকসবজি রাখার লক্ষ্য ছিল।
• ১৩তম থেকে ২৪তম সপ্তাহ: দ্রুত ওজন কমানোর পর্যায় শেষে ওজন ধরে রাখার উপযোগী খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া প্রতিদিন অন্তত দুই লিটার ক্যালরিমুক্ত তরল পান করতে বলা হয়েছিল।
ওজন কমানোর পাশাপাশি পেশি রক্ষার গুরুত্ব

এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ওজন কমানোর সময় পেশি রক্ষা করা। সাধারণত দ্রুত ওজন কমানোর ক্ষেত্রে শরীরের চর্বির পাশাপাশি পেশিও কমে যেতে পারে। পরে ওজন ফিরে এলে পেশির তুলনায় চর্বি বেশি জমার আশঙ্কা থাকে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে বিপাকীয় স্বাস্থ্য ও শারীরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ কারণে গবেষকেরা খাদ্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং বা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম যুক্ত করেছিলেন। এ ধরনের ব্যায়াম পেশির শক্তি ও কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করে। অন্যদিকে অ্যারোবিক ব্যায়াম হৃদ্যন্ত্রের সক্ষমতা বাড়ায় এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করতে সাহায্য করে।
গবেষকদের মতে, ওজন কমানোর সময় পেশি সংরক্ষণ করা দীর্ঘ মেয়াদে বিপাকীয় স্বাস্থ্য, শারীরিক সক্ষমতা এবং রোগের গতিপথের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন সম্ভাবনা, তবে সতর্কতা জরুরি

গবেষকদের মতে, অল্প বয়সে শুরু হওয়া টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে স্বল্প ক্যালরির খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে পরিকল্পিত অ্যারোবিক ও রেজিস্ট্যান্স ব্যায়াম যুক্ত করার কার্যকারিতা এই গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এ ধরনের সমন্বিত কর্মসূচির কার্যকারিতা দেখানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে গবেষণাটি তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরে এবং মাত্র ছয় মাস ধরে পরিচালিত হয়েছে। তাই দীর্ঘ মেয়াদে রেমিশন কতটা বজায় থাকে, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, প্রতিদিন ৮০০ থেকে ৯০০ ক্যালরি গ্রহণ অত্যন্ত কম ক্যালরির খাদ্যাভ্যাস। এটি চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের নিবিড় তত্ত্বাবধান ছাড়া অনুসরণ করা নিরাপদ নয়। বিশেষ করে ডায়াবেটিসের ওষুধ গ্রহণকারীদের খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামে বড় পরিবর্তন আনার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
তরুণ বয়সে টাইপ ২ ডায়াবেটিস শনাক্ত হলে শুরু থেকেই ওজন নিয়ন্ত্রণ, সুষম খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শরীরচর্চার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নতুন এই গবেষণা জীবনযাত্রার পরিকল্পিত পরিবর্তনকে ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার একটি সম্ভাবনাময় উপায় হিসেবে তুলে ধরেছে।
লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ; এবং প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র।
সূত্র: প্রথম আলো