|
| |
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

পাঙাশ মাছের গায়ে আঁশ নেই কেন

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:০০ এএম
১৭৮ পঠিত
পাঙাশ মাছের গায়ে আঁশ নেই কেন
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:

রুই, কাতলা কিংবা তেলাপিয়ার মতো বেশিরভাগ মাছে আঁশ থাকে। এসব মাছ বাজার থেকে কিনে আঁশ ছাড়াতে হয়। কিন্তু পাঙাশ মাছের বেলায় সে ঝামেলা নেই। এই মাছের গা মসৃণ, পিচ্ছিল। কিন্তু কেন এই মাছের গায়ে আঁশ থাকে না? মাছটি কি জন্ম থেকেই এমন, নাকি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আঁশ হারিয়ে যায়? চলুন, জানার চেষ্টা করি।

মাছের গায়ে আঁশ দেখলে মনে হতে পারে, এগুলো বুঝি শরীরের ওপর সাজিয়ে রাখা ছোট ছোট পাতলা টুকরো। আসলে আঁশ মাছের ত্বকেরই অংশ। বেশিরভাগ মাছের গায়ে আঁশ থাকে। এগুলো শরীরকে বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। পাথর, ডালপালা কিংবা অন্য কোনো শক্ত বস্তুর সঙ্গে ঘষা লাগলেও আঁশ কিছুটা সুরক্ষা দেয়। তবে সব মাছের আঁশের গঠন এক রকম নয়। কোনো মাছের আঁশ পাতলা ও নমনীয়, কোনো মাছের আবার আঁশের বদলে থাকে শক্ত হাড়ের মতো পাত।

প্রকৃতিতে অবশ্য আঁশহীন মাছও কম নেই। পাঙাশের পাশাপাশি ক্যাটফিশের অনেক প্রজাতির গায়েও আঁশ থাকে না। এই দলের মাছের মাথার কাছে গোঁফের মতো এক বা একাধিক শুঁড় থাকে। এগুলো দিয়ে মাছ আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য পেতে এবং খাবার খুঁজতে পারে।

মাছের গায়ে আঁশ দেখলে মনে হতে পারে, এগুলো বুঝি শরীরের ওপর সাজিয়ে রাখা ছোট ছোট পাতলা টুকরো। আসলে আঁশ মাছের ত্বকেরই অংশ। বেশিরভাগ মাছের গায়ে আঁশ থাকে।

বাংলাদেশের নদী ও মোহনায় পাওয়া যায় দেশি পাঙাশ (Pangasius pangasius)। আবার মাছের বাজারে চাষের যে পাঙাশ বেশি দেখা যায়, সেটি সাধারণত স্ট্রাইপড ক্যাটফিশ (Pangasianodon hypophthalmus)। প্রজাতি দুটি এক নয়, তবে দুটিই ক্যাটফিশ দলের মাছ। এই দলের বেশিরভাগ মাছের মতো পাঙাশেরও গায়ে আঁশ নেই।

কিন্তু আঁশ না থাকলেও এরা বাঁচে কীভাবে? আপনি যদি পাঙাশ মাছ হাতে নিয়ে দেখেন, তাহলে এর গায়ে একধরনের পিচ্ছিল আবরণ পাবেন। মিউকাসের কারণে এই পিচ্ছিল ভাবটা হয়। মাছের ত্বকের বিশেষ কোষ থেকে তৈরি হয় এই পদার্থ। শুধু পাঙাশ নয়, প্রায় সব মাছের শরীরেই মিউকাসের আবরণ থাকে। তবে আঁশহীন মাছের ক্ষেত্রে এই আবরণ ও ত্বকের গঠন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আঁশ না থাকলেও পাঙাশ মাছ বাঁচে কীভাবে?

মিউকাসকে মাছের শরীরের বাইরের একধরনের প্রহরী ভাবতে পারেন। এটি ত্বক ও বাইরের পানির মধ্যে একটি সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে। এর ফলে কিছু জীবাণু ও পরজীবীর পক্ষে ত্বকে আটকে থাকা কঠিন হয়। মাছের ত্বকের ক্ষতি কমাতেও এই আবরণ ভূমিকা রাখে। পানিতে সাঁতার কাটার সময় শরীরের ওপর পানির প্রবাহের সঙ্গে মিউকাসের সম্পর্ক রয়েছে বলেও গবেষণায় দেখা গেছে।

আপনি যদি পাঙাশ মাছ হাতে নিয়ে দেখেন, তাহলে এর গায়ে একধরনের পিচ্ছিল আবরণ পাবেন। মিউকাসের কারণে এই পিচ্ছিল ভাবটা হয়। মাছের ত্বকের বিশেষ কোষ থেকে তৈরি হয় এই পদার্থ।

তবে মিউকাস কোনো জাদুর বর্ম নয়। এটি সব জীবাণু বা পরজীবীকে ঠেকাতে পারে না। আঁশহীন মাছেরও রোগ হতে পারে, শরীরে আঘাত লাগতে পারে। তাই পাঙাশের গায়ে আঁশ নেই বলে তার শরীর অরক্ষিত, এমন ভাবার কারণ নেই। পাঙাশের ত্বক, মিউকাসের আবরণ এবং শরীরের অন্যান্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মিলেই সুরক্ষা তৈরি হয়।

একটা বিষয় লক্ষ করুন। আমাদের শরীরের বাইরের আবরণও ত্বক। ত্বক না থাকলে শরীরের ভেতরের নরম অংশ সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতো। মাছের ক্ষেত্রেও ত্বক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আঁশ থাকুক বা না থাকুক, ত্বক শরীরকে বাইরের পরিবেশ থেকে আলাদা করে রাখে।

তাহলে পাঙাশের আঁশ হারাল কীভাবে? আসলে যেকোনো প্রাণীকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকতে হলে নানা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। কোনো বৈশিষ্ট্য টিকে থাকে, কোনোটি বদলে যায়, আবার কোনোটি হারিয়েও যেতে পারে। মাছের আঁশের ক্ষেত্রেও এমন পরিবর্তন ঘটেছে।

ত্বক না থাকলে শরীরের ভেতরের নরম অংশ সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতো। মাছের ক্ষেত্রেও ত্বক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আঁশ থাকুক বা না থাকুক, ত্বক শরীরকে বাইরের পরিবেশ থেকে আলাদা করে রাখে।

২০১৬ সালে নেচার কমিউনিকেশন সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় চ্যানেল ক্যাটফিশের জিনোম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আঁশ তৈরি করতে ভূমিকা রাখা এসসিপিপি পরিবারের কিছু জিন এই মাছের মধ্যে নেই। গবেষকেরা মনে করেন, এই পরিবর্তন ক্যাটফিশের আঁশ হারানোর ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করে।

তবে এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। গবেষণাটি করা হয়েছিল চ্যানেল ক্যাটফিশ নিয়ে, পাঙাশ নিয়ে নয়। তাই চ্যানেল ক্যাটফিশের আঁশ না থাকার নির্দিষ্ট জিনগত কারণই যে পাঙাশের ক্ষেত্রেও হুবহু একই, এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। পাঙাশের আঁশহীন শরীর ক্যাটফিশ দলের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মেলে, কিন্তু ঠিক কোন জিনগত পরিবর্তনে তার পূর্বপুরুষদের আঁশ হারিয়েছিল, তা বলতে হলে পাঙাশকে নিয়েই নির্দিষ্ট গবেষণার প্রয়োজন।

প্রকৃতির ইতিহাসে এমন পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। মাছের ত্বকের গঠন সব বংশে একইভাবে বদলায়নি। কিছু ক্যাটফিশের শরীর আঁশহীন, আবার কিছু প্রজাতির গায়ে হাড়ের তৈরি শক্ত পাতের মতো আবরণ রয়েছে।

এখানে আরেকটি মজার প্রশ্ন আসে। আঁশ যদি সুরক্ষা দেয়, তাহলে পাঙাশের পূর্বপুরুষদের আঁশ হারানোর দরকার হলো কেন? আঁশ না থাকাই কি পাঙাশের সুবিধা?

পাঙাশের আঁশহীন শরীর ক্যাটফিশ দলের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মেলে, কিন্তু ঠিক কোন জিনগত পরিবর্তনে তার পূর্বপুরুষদের আঁশ হারিয়েছিল, তা বলতে হলে পাঙাশকে নিয়েই নির্দিষ্ট গবেষণার প্রয়োজন।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আঁশহীন শরীরের কিছু সম্ভাব্য সুবিধা থাকতে পারে। যেমন, আঁশের বদলে ত্বকের গঠন ও পুরুত্ব বদলে গেলে শরীরের সঙ্গে বাইরের পরিবেশের আদান-প্রদানের ধরনও বদলাতে পারে। কিছু গবেষণায় আঁশহীন মাছের ত্বক দিয়ে গ্যাসের আদান-প্রদান সহজ হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। আবার ত্বকের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এসব সুবিধা সব আঁশহীন মাছের ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করে, এমন প্রমাণ নেই।

কিছু গবেষণায় আঁশহীন মাছের ত্বক দিয়ে গ্যাসের আদান-প্রদান সহজ হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে

প্রকৃতি আগে থেকে ঠিক করে রাখে না যে কোনো মাছের আঁশ থাকবে, আর কোনো মাছের থাকবে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শরীরে পরিবর্তন ঘটে। সেই পরিবর্তনের কিছু টিকে যায়, কিছু হারিয়ে যায়। দীর্ঘ সময়ের শেষে আমরা দেখি, একই পানিতে কিছু মাছের আঁশ আছে, কিছু মাছের নেই।

লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: নেচার কমিউনিকেশন্স ও ফ্রেশ ওয়াটার বায়োডাইভার্সিটি পোর্টাল অব বাংলাদেশ

সূত্র: প্রথম আলো