পরি, সিংহ, হরিণের নকশায় সাজানো জমিদারদের পালঙ্ক, লম্বা ১২৩ ইঞ্চি
গণমাধ্যম ডেক্স
জাতীয় জাদুঘরে ঢুকলে চোখে পড়ে ইতিহাসের নানা নিদর্শন। কোথাও প্রাচীন মুদ্রা, কোথাও পাথরের ভাস্কর্য, কোথাও আবার রাজা-বাদশাহদের ব্যবহার করা জিনিসপত্র। এসবের মধ্যে দর্শনার্থীদের আলাদা করে টানে প্রাচীন আমলের বিশাল সব পালঙ্ক। জাতীয় জাদুঘরের জাতিতত্ত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগের ৩১ ও ৩২ নম্বর কাঠের শিল্পকর্ম গ্যালারিতে প্রদর্শিত আসবাবগুলো যেন অতীতের শিল্পবোধ ও আভিজাত্যের সাক্ষী।
জাদুঘরের দেওয়া তথ্যমতে, দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি ভিড় হয় এই দুই গ্যালারিতে। শিশু থেকে প্রবীণ, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছেই কাঠের এই শিল্পকর্মের আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। পালঙ্কের চোখজুড়ানো কারুকাজ, বিশাল আকার কিংবা এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রাজকীয় জীবনের কৌতূহল—সব মিলিয়ে দর্শনার্থীদের কাছে কাঠের এসব শিল্পকর্ম বিশেষ আকর্ষণের বিষয়।
গত বুধবার বিকেলে জাতীয় জাদুঘরে পরিবার নিয়ে আসেন ব্যবসায়ী রাকিব হাসান। সন্তানদের পালঙ্ক দেখাচ্ছিলেন তিনি। এ সময় প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘বাচ্চারা তো পালঙ্ক দেখেনি, এখানে দেখাতে এসেছি। পরি, মৎস্যকন্যা, সিংহ, বাঘ দেখে ওরা অনেক খুশি হয়েছে।’
জমিদারদের ব্যবহৃত দুই পালঙ্ক
জাদুঘরের দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে নড়াইলের লোহাগড়া ও ফরিদপুরের জমিদারদের ব্যবহৃত দুটি পালঙ্ক। ফরিদপুরের জমিদারের ব্যবহৃত পালঙ্কটি ১৯৭৬ সালে সংগ্রহ করে জাতীয় জাদুঘর। উনিশ শতকে তৈরি এই পালঙ্কের দৈর্ঘ্য ১২৩ ইঞ্চি ও প্রস্থ ২৭ ইঞ্চি। এর স্তম্ভ ও কাঠামোয় মানুষের অবয়ব, নারীমূর্তি এবং সিংহ, হরিণ ও হাতির অবয়ব খোদাই করা আছে।
অন্যদিকে, নড়াইলের লোহাগড়ার জমিদারের ব্যবহৃত পালঙ্কটি ১৯৭৮ সালে সংগ্রহ করা হয় লোহাগড়ার ইতনা গ্রাম থেকে। এটির দৈর্ঘ্য ১২৫ ইঞ্চি, প্রস্থ ১০১ ইঞ্চি এবং উচ্চতা ১৩৩ ইঞ্চি। বিক্রেতার দেওয়া তথ্যমতে, এটি লোহাগড়ার জমিদারের ব্যবহৃত ছিল। পালঙ্কটির চার কোনায় রয়েছে বিশাল আকৃতির প্যাঁচানো নকশার চারটি কাঠের স্তম্ভ। পায়াগুলো পরির আদলে তৈরি। পেছনের অংশে রয়েছে উদ্ভিজ্জ, ফুলেল ও লতাপাতার নকশা।
নড়াইলের লোহাগড়ার জমিদারের ব্যবহৃত পালঙ্কটি ১৯৭৮ সালে সংগ্রহ করা হয় লোহাগড়ার ইতনা গ্রাম থেকে। এটির দৈর্ঘ্য ১২৫ ইঞ্চি, প্রস্থ ১০১ ইঞ্চি এবং উচ্চতা ১৩৩ ইঞ্চি।
দারুশিল্পের ঐতিহ্য

বাঙালি সংস্কৃতিতে লোকশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা দারুশিল্প বা কাঠের খোদাই শিল্প। অলংকৃত পালঙ্ক এই শিল্পের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। পালঙ্ক শুধু ঘুমানো বা বিশ্রামের আসবাব নয়, এর নকশায় প্রকাশ পেত কারিগরদের দক্ষতা ও শিল্পবোধ। সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের পাশাপাশি শিল্পীর নিজস্ব রুচির ছাপও থাকত এসব আসবাবে।
খাট ও পালঙ্কের বৈশিষ্ট্য অনুসারে বিভিন্ন নাম প্রচলিত ছিল। এর মধ্যে রয়েছে যাত্রাসিদ্ধি, সর্বসিদ্ধ, বিজয়া, অষ্টমঙ্গলা, জয়, মঙ্গল, প্রেয়ান, চিত্রকান্ত ও মঞ্চ। ‘যুক্তি কল্পতরু’ গ্রন্থে খাটকে দূরদর্শী, দীর্ঘদর্শী, দুর্লঙ্ঘ্য ও দুরাসদ—এই চার শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এসব শ্রেণির খাট রাজাদের জন্য সুখকর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলায় রাজা-বাদশাহ, জমিদার ও বিত্তশালীদের ঘরে পালঙ্ক ব্যবহার করা হতো। সে সময় ছেনি, হাতুড়ি ও বাটালি দিয়ে কাঠে ফুটিয়ে তোলা হতো নানা নকশা।
জাতীয় জাদুঘরের জাতিতত্ত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগের সাবেক কিপার (পরিচালক) জিনাত মাহরুখ বানুর ‘বাংলাদেশের দারুশিল্প’ বইয়ে বলা হয়েছে, খাট-পালঙ্কের নির্মাণে শাস্ত্রীয় প্রভাব থাকলেও অলংকরণে শিল্পীর নিজস্ব শৈলীর প্রকাশ ঘটেছে। পরবর্তী সময়ে বিদেশি বণিক ও পর্যটকদের আগমন এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর প্রভাবে বাংলার আসবাবশিল্পে পরিবর্তন আসে। উনিশ শতকের কয়েকটি পালঙ্কে ব্রিটিশ, রোমান, গ্রিক ও আরবি স্থাপত্য এবং শিল্পশৈলীর অনুকরণ দেখা যায়। তবে বাংলার সূত্রধরেরা এসব নকশায় নিজেদের শিল্পশৈলীও বজায় রেখেছিলেন।’
জিনাত মাহরুখ বানু বুধবার বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, যশোর, খুলনা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, ফরিদপুর ও সিলেট অঞ্চলে একসময় উচ্চমানের অলংকৃত পালঙ্ক তৈরি হতো। জমিদার ও বিত্তবানদের বাড়িতে মাসিক চুক্তিতে কাজ করতেন সূত্রধরেরা। একেকটি পালঙ্ক তৈরি করতে দুই থেকে তিন বছরও লাগত। দীর্ঘস্থায়ী ও শৈল্পিক পালঙ্ক তৈরিতে কাঠের নির্বাচন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত সেগুন, কাঁঠাল, গর্জন, জারুল ও মেহগনি কাঠ দিয়ে পালঙ্ক তৈরি করা হতো।
‘বাংলাদেশের দারুশিল্প’ বইয়ে পালঙ্কের বিভিন্ন অংশের অলংকরণে কারুশিল্পীদের দক্ষতার বর্ণনা রয়েছে। রাজকীয় পালঙ্কের পায়ায় সিংহের থাবার আদলে ‘সিংহপায়া’ তৈরি করা হতো। খাটের মাথা ও পায়ার দিকে কাঠ খোদাই করে ত্রিমাত্রিক ও দ্বিমাত্রিক নকশা ফুটিয়ে তোলা হতো। এসব নকশায় লতাপাতা, গোলাপ, কলকা, ময়ূর, হংসজোড়া ও পরির অবয়ব দেখা যেত।
কাঠের শিল্পকর্মের আরও সংগ্রহ

জাতীয় জাদুঘরের কাঠের শিল্পকর্ম গ্যালারিতে খাট-পালঙ্ক ছাড়াও কাঠের অলংকৃত সিন্দুক, বেড়া, দরজা, পালকি, ঢেঁকি, সিংহাসন, চেয়ার ও নারী ভাস্কর্য প্রদর্শিত রয়েছে। জাতিতত্ত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগের তথ্যমতে, বিভাগের স্টোরে ২১৪টি কাঠের শিল্পকর্ম রয়েছে। এর মধ্যে ৪৬টি নিদর্শন দুটি গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে।
জাদুঘরে যেভাবে সংরক্ষণ করা হয়: কাঠের তৈরি হওয়ায় আর্দ্রতার পরিবর্তন, ছত্রাক ও কীটপতঙ্গের আক্রমণে পালঙ্কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। দীর্ঘদিন এসব নিদর্শনের ঐতিহাসিক ও নান্দনিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, উপযুক্ত পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ জরুরি।
এ বিষয়ে জাতীয় জাদুঘরের জাতিতত্ত্ব ও অলংকরণ শিল্পকলা বিভাগের কিপার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আসমা ফেরদৌসি বলেন, ‘প্রতিটি নিদর্শন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। আমাদের নিজস্ব ল্যাব রয়েছে। সেখানে নিদর্শনগুলোর অবস্থা পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
সূত্র: প্রথম আলো