বাংলাদেশের সংবিধানের গণতন্ত্র প্রতিবন্ধক বৈশিষ্ট্য
গণমাধ্যম ডেক্স
১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়। বিদ্যমান সংবিধান পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের সংবিধান: ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য ও ভবিষ্যৎ বই লিখেছেন আলী রীয়াজ। সংবিধান দিবস উপলক্ষে সেই বইয়ের কিছু চুম্বক অংশ প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।
১৯৭২ সালে প্রণীত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সংবিধান ১৭ বার সংশোধিত হলেও এর কিছু বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তিত থেকেছে। বাংলাদেশ এই সময়ে বিভিন্ন ধরনের শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। কিন্তু সংবিধানের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য এবং বিধান আছে, যেগুলো বহাল থাকার কারণে জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের পথে সংবিধানই প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছে।
নাগরিকের অধিকার সীমিতকরণ
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পেছনে যে দীর্ঘ সংগ্রাম তার মর্মবাণী হচ্ছে নাগরিকের সমতার অধিকার। ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে দেখা গেল যে নাগরিকদের এই অধিকারগুলো সুরক্ষিত হয়নি, বরং তা সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। যদিও সংবিধানের ২৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘মৌলিক অধিকারের সহিত অসামঞ্জস্য আইন বাতিল হইবে।’
সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ২৭ থেকে ৪৪ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অনুচ্ছেদে বর্ণিত শর্তসমূহ স্পষ্টত মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বলেই প্রতীয়মান হয়। ৩৬ থেকে ৩৯ অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকারসমূহ, যা প্রকৃতপক্ষে নাগরিক মৌলিক অধিকারের ভিত্তি বলেই বিবেচিত হতে পারে, সেগুলোকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, যা এগুলো সংবিধানে যুক্ত হওয়ার তাৎপর্যকেই অবসিত করে দিয়েছে। এগুলোকে বিভিন্ন রকমের শর্তসাপেক্ষ করা হয়েছে।
উদাহরণ হচ্ছে বিদ্যমান সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ। বলা হচ্ছে ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা’ ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে’ প্রয়োগযোগ্য। ৩৮ অনুচ্ছেদে সংগঠনের স্বাধীনতা ‘আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে’ কার্যকর।
এতে স্পষ্ট হচ্ছে তা হলো, ১৯৭২ সালের সংবিধানে মৌলিক অধিকারগুলোর দীর্ঘ তালিকা থাকলেও এবং ১০২ অনুচ্ছেদের ১ থেকে ৫ উপধারায় আদালতকে তা কার্যকর করার (আপাত) অধিকার দেওয়া হলেও স্পষ্টতই জনশৃঙ্খলা ও জনস্বার্থ শর্তসাপেক্ষ করার মধ্য দিয়ে তার কার্যকারিতায় প্রতিবন্ধক তৈরি করে রাখা হয়। সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মৌলিক অধিকার হরণ সম্ভব হয়।
নাগরিকের মৌলিক অধিকার সীমিতকরণের এসব বিধানের সঙ্গে সঙ্গে ১৯৭৩ সালে যুক্ত করা হয় ‘জরুরি অবস্থা’ জারির বিধান, যার আওতায় কার্যত নাগরিকদের সব মৌলিক অধিকার স্থগিত করে দেওয়া যায়।
১৯৭২ সালের সংবিধানে জরুরি অবস্থা জারির কোনো বিধান ছিল না, কিন্তু দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে ১৪১(ক) অনুচ্ছেদ যুক্ত করে দেশে জরুরি অবস্থা জারির ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া হয়। এতে বলা হয় যে রাষ্ট্রপতির কাছে ‘সন্তোষজনক ভাবে প্রতীয়মান’ হলেই যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা আছে তা হলে জরুরি অবস্থা জারি করা যাবে এবং এই সময়ে নাগরিকদের সংবিধানে প্রদত্ত অধিকার যা ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০ ও ৪২ অনুচ্ছেদে দেওয়া আছে তা সাময়িকভাবে রহিত করা যাবে। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জরুরি অবস্থা জারির জন্য রাষ্ট্রপতির আদেশে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের বিধান যুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু তাতে নাগরিকের অধিকার রক্ষিত হয় না।

► বাংলাদেশের সংবিধানের সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিত অনুচ্ছেদ হচ্ছে ৭০ অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদের লক্ষ্য হচ্ছে, যাতে কোনো সংসদ সদস্য তাঁর দল ত্যাগ করতে না পারেন।
► বাংলাদেশে বিচার বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার একটি অন্যতম দিক হচ্ছে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো রকম আইন বা নীতিমালা না থাকা।
ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ
বাংলাদেশের সংবিধানের বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম হচ্ছে ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ। সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে অভাবনীয় ক্ষমতা প্রদান করেছে। এ ব্যবস্থা ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময়ই করা হয়েছে। ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণের সূচনা হয়েছিল সংবিধান প্রণয়নের সময় শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাঁর দলের প্রশ্নহীন আনুগত্যের কারণে। ১৯৭৩ সালে সংসদ প্রতিষ্ঠার পরও অবস্থার কোনো বদল ঘটেনি, ফলে শুরু থেকেই মুজিব কোনো রকমের জবাবদিহি ছাড়াই ক্ষমতা ভোগ করতে থাকেন। সংবিধান প্রণয়নের সময় প্রধানমন্ত্রীর জবাবদিহির কোনো ব্যবস্থা না থাকাও তারই প্রতিফলন।
সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকে সাংবিধানিক ক্ষমতা দেওয়ায় বিস্ময়কর কিছু নেই। কিন্তু সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৫(৪-৬), ৪৮(৩) এবং ৭০(১-৪)-এর সংমিশ্রণে বাংলাদেশের পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা রূপ নেয়। ৫৫(৪-৬) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সরকারের পক্ষে নির্বাহী আদেশ জারি করার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হবেন রাষ্ট্রপতি।
এ ব্যাপারে কেউ আদালতে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না—নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে এ ধরনের দায়মুক্তি থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু এই দায়মুক্তির বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা নেয় অনুচ্ছেদ ৪৮(৩)-এর কারণে।
এই অনুচ্ছেদ অনুসারে, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ব্যতীত রাষ্ট্রপতিকে সমস্ত এবং প্রতিটি বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসারে প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়নসহ কাজ করতে হবে।
এখানে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধানের বিষয়টি স্মরণ করা যায়। যদিও আপাতদৃষ্টে রাষ্ট্রপতিকে এককভাবে এই ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছিল, ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে এটিও ব্যতিক্রম হিসেবে রাখা হয়নি। ফলে ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রীর হাতেই।
৭০ অনুচ্ছেদের শৃঙ্খল
বাংলাদেশের সংবিধানের সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিত অনুচ্ছেদ হচ্ছে ৭০ অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদের লক্ষ্য হচ্ছে, যাতে কোনো সংসদ সদস্য তাঁর দল ত্যাগ করতে না পারেন। সংবিধানে এই অনুচ্ছেদ যুক্ত করার পেছনে যুক্তি ছিল, এতে সরকারের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পাবে এবং অস্থিতিশীলতা এড়ানো যাবে। কিন্তু এই অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের কেবল সম্ভাব্য দলবদলকে বন্ধ করেছে তা নয়, বরঞ্চ সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতাকেই হরণ করেছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়, যদি কোনো সদস্য যে দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়েছেন তা থেকে ‘পদত্যাগ করেন’ অথবা ‘সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন’, তবে তাঁর আসন শূন্য হবে।
গণপরিষদে ৭০ অনুচ্ছেদ বিষয়ে আলোচনায় অনেকেই আপত্তি তোলেন এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছিলেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদের মধ্যে এমন একটা অগণতান্ত্রিক বিধান রাখা হয়েছে, যা পৃথিবীর আর কোনো সংবিধানে নেই। ...এই বিধান পাকিস্তানি ডিক্টেটর আইয়ুব খানের শাসনতন্ত্রেই শুধু আছে। ।’ একে গণতন্ত্রের ‘টুঁটি টিপে হত্যা’ বলেই তিনি মত দিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী এবং ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীতে এই অনুচ্ছেদের কিছু পরিবর্তন এবং সংযোজন করা হয়। কিন্ত উভয় ক্ষেত্রেই এটি আরও কঠোর করে তোলা হয়।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৫ ও ১৯৯১ সালে সংযোজিত বিষয়গুলো বাদ দিয়ে এই অনুচ্ছেদকে ১৯৭২ সালের সংবিধানের জায়গায় ফেরানো হয়েছে। ফলে বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে বলা যায় যে আমরা ১৯৭২ সালে যে পরিস্থিতিতে ছিলাম, সেখানেই প্রত্যাবর্তন করেছি।
এই অনুচ্ছেদের প্রতিক্রিয়া সাংবিধানিকভাবে যতটা বর্ণিত হয়েছে তার চেয়েও বেশি। দলের নেতৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত থাকায় এবং তিনিই সংসদ নেতা হওয়ার কারণে ক্ষমতার যে এককেন্দ্রীকরণ ঘটে তার সঙ্গে অনুচ্ছেদ ৭০-এর বিধান গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে হিমালয়সমান প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে দেয়।

ক্ষমতার ভারসাম্যের অনুপস্থিতি
সংসদীয় ব্যবস্থায় নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির জন্য যে দুই ধরনের ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করা হয় তার একটি হচ্ছে রাষ্ট্রপতির হাতে কিছু সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা প্রদান। আরেকটি ব্যবস্থা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর জবাবদিহির জন্য সংসদীয় কমিটিগুলোকে জোরদার করা। সাধারণত সংসদীয় ব্যবস্থায় এর যেকোনো একটি অনুসৃত হয়ে থাকে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ভারসাম্য ১৯৭২ সালের সংবিধানেই অনুপস্থিত ছিল। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি-শাসিত ব্যবস্থা চালু হলে প্রধানমন্ত্রী হয়ে পড়েন অকিঞ্চিৎকর। কিন্তু এর আগে এবং পরে সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির পদ কেবল আলংকারিক তা-ই নয়, একেবারেই ক্ষমতাহীন ও প্রধানমন্ত্রীর হাতের পুতুল মাত্র। এটাও লক্ষণীয় যে ১৯৭৫ সালে একদলীয় ব্যবস্থা চালুর আগের দুজন রাষ্ট্রপতি—আবু সাঈদ চৌধুরী এবং মোহাম্মদ উল্লাহ—তাঁদের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। ১৯৭৫-১৯৯০ কালে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় দৃশ্যত এবং কার্যত ক্ষমতা এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকে।
১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। কার্যত ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। আগস্ট মাসে সংসদে দ্বাদশ সংশোধনী পাস এবং সেপ্টেম্বরে এই সংশোধনী বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হলে দেশে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। এতে রাষ্ট্রপতির হাতে যে অসীম ক্ষমতা ছিল তা অপসৃত হয় এবং তাঁর পুরোটাই অর্পিত হয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে।
১৯৭৫ সালের জানুয়ারি থেকে প্রধানমন্ত্রী যেমন একটি অকিঞ্চিৎকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হন, তেমনি দ্বাদশ সংশোধনীর পর রাষ্ট্রপতি পদও হয়ে পড়ে অকিঞ্চিৎকর। দ্বাদশ সংশোধনীর পর রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা হচ্ছে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, এর বাইরে অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ বাধ্যতামূলক।
এর সঙ্গে সংবিধানের ৭০ ধারা, যা সংসদে সার্বক্ষণিকভাবে সদস্যদের দলের কঠোর নিয়ন্ত্রণের নিগড়ে আবদ্ধ করে ফেলেছে; সেটি নিশ্চিত করেছে যেন সব সদস্য তাঁদের নিজ দল এবং নেতার কাছেই জিম্মি থাকেন। প্রধানমন্ত্রীর হাতে ১৯৭২ সালের সংবিধান, যাকে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছিলেন ‘অলৌকিক ক্ষমতা’ (নজরুল ২০২২, ১১০-১১৫), তারই চর্চা হচ্ছে অনুগত ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধিষ্ঠান। ১৯৯১ সাল থেকে সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে যাঁরা রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, রাজনীতিতে, শাসনব্যবস্থায় সাংবিধানিকভাবেই তাঁদের ভূমিকা রাখার কোনো ব্যবস্থা ছিল না, এখনো নেই।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্বাধীনতার অনুপস্থিতি
বাংলাদেশের সংবিধানে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, এগুলো হচ্ছে নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, মহা হিসাব নিরীক্ষক এবং নিয়ন্ত্রক। এর বাইরে অসংখ্য বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলোর মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ দেওয়ার সাংবিধানিক দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রপতির। কিন্তু সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবেই ইঙ্গিত দেয় যে এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের বাইরে যেতে পারবেন না। ফলে এগুলোর নিয়ন্ত্রণ কার্যত প্রধানমন্ত্রীর হাতেই। তার পরিণতি দলীয় সরকারের সময় কী হয়, তা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ইতিহাস এবং ভূমিকাই বলে দেয়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ কমিশনারদের নিয়োগে আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে ১১৮ অনুচ্ছেদে। কিন্তু সেই আইন এখনো প্রণীত হয়নি। ২০২২ সালে কমিশনার নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি গঠনের যে আইন তৈরি করা হয়েছে, তা প্রধানমন্ত্রী এবং দলের বাইরের বিবেচনায় গিয়ে কমিশনার নিয়োগের কোনো ব্যবস্থা করে না। একই অবস্থা হচ্ছে সরকারি কর্ম কমিশনের নিয়োগ প্রদানের ব্যবস্থায়।
রাষ্ট্রপতির নামে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাই বাস্তবায়িত হয়। কমিশনের সদস্যরা যেমন দলের প্রতি আনুগত্যের কারণে পদ লাভ করেন, তেমনি এই কমিশন যাঁদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সুপারিশ করেন তাঁদেরও দলের লোকই হতে হয়। ২০০৯ সালের পর এই প্রবণতা কতটা ব্যাপ্ত হয়েছিল তার প্রমাণ হচ্ছে চাকরিপ্রার্থীরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই তাঁদের আবেদনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কথা বলেছেন, কেননা ‘পুলিশ ভেরিফিকেশনের’ নামে বিরোধী দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া হতো।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ফাঁপা প্রতিশ্রুতি
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিষয়ে ১৯৭২-এর সংবিধানের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক ছিল ১১৬ অনুচ্ছেদ। এখানে বলা হয়েছিল ‘বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান, ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকিবে।’ এই অনুচ্ছেদে বিচারকদের সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে রাখলেও ফৌজদারি কার্যবিধিতে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তাদেরই নিয়োগ দেওয়ার বিধান বহাল রাখা হয়। ফলে বিচার বিভাগের ওপরে নির্বাহী বিভাগের আধিপত্যের ছায়া বহাল থাকে। ১১৬ অনুচ্ছেদ বদলে যায় ১৯৭৫ সালে। বিচারকদের রাষ্ট্রপতির কাছে ‘সোপর্দ’ করা হয় এবং বিচার বিভাগে চালু হয় রাষ্ট্রপতির একক শাসন। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শের শর্ত যোগ করা হয়, কিন্তু তা বিচার বিভাগকে স্বাধীনতা প্রদান করে না।
আদালত কর্তৃক পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে দিলে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরসহ শৃঙ্খলা বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শের বিধানও বাতিল হয়। পরে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা ফিরিয়ে আনা হয়।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সরাসরি না হলেও অংশত অগ্রগতি হচ্ছে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান সংবিধানে যুক্ত করা। উচ্চ আদালতের বিচারকদের ‘অসদাচরণ বা অক্ষমতার’ জন্য অভিশংসনের যে ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির এককভাবে ছিল তাঁর বদলে প্রধান বিচারপতি এবং দুজন জ্যেষ্ঠ বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে অর্পণ করা হয়, এই কাউন্সিল রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে অভিযোগের তদন্ত করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাতে পারবে বা রাষ্ট্রপতির পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত করতে পারবে। এটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করে না।
সেই সুযোগ তৈরি হয় ১৯৯৯ সালে ‘মাসদার হোসেন মামলা’র রায়ে। তাতে সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে ১২ দফা নির্দেশনা দেন, যার মধ্যে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন গঠন করার কথা বলা হয়েছিল। এই রায়ের আট বছর পর
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মূল নির্দেশনাটি বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু তাতেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি, কেননা বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা ম্যাজিস্ট্রেটের বিচারিক ক্ষমতা পেলেও বাস্তবে তাঁদের ওপর আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের বাস্তবিক নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকে।
বাংলাদেশে বিচার বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার একটি অন্যতম দিক হচ্ছে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো রকম আইন বা নীতিমালা না থাকা। ১৯৭৮ সালে সংবিধানে ৯৫(২)(গ) যুক্ত করা হয় যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ আইন দ্বারা নির্ধারিত যোগ্যতা অনুযায়ী হবে। এ বিষয়ে আদালতের পক্ষ থেকে একাধিকবার তাগাদা দেওয়া এবং আইন কমিশনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ সত্ত্বেও এই বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি।
বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের আধিপত্য অপসারণের ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নেওয়া দুটি পদক্ষেপে—২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের লক্ষ্যে উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাইপূর্বক প্রধান বিচারপতি কর্তৃক রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ প্রদানের উদ্দেশ্যে’ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং ৩০ নভেম্বর ২০২৫ সরকার সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ জারির মধ্য দিয়ে।
সচিবালয় গঠনের নির্দেশ আসে ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ কর্তৃক ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করে দেওয়া রায়ে। অধস্তন আদালত ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান এবং নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত সব প্রশাসনিক ও সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবে এই সচিবালয়।
এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বিচারকাজে নিয়োজিত বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা ও ছুটিবিষয়ক সব সিদ্ধান্ত ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় এই সচিবালয়ের হাতে থাকবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং সচিবালয়ের সচিব প্রশাসনিক প্রধান হবেন। কিন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে ত্রয়োদশ সংসদে এই দুই আইন রহিত করা হয়েছে। ফলে বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ আবারও নির্বাহী বিভাগের হাতেই ফিরে গেছে।
এখানে বিদ্যমান সংবিধানের যে বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচিত হয়েছে, তা শুধু বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপলাভের পথেই বাধা তা নয়, এগুলো সাংবিধানিকভাবেই এমন এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক নির্বাহী ব্যবস্থার তৈরি করে, যা বদলে না ফেলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা এক অসম্ভব সাধনা।
● আলী রীয়াজ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর।
সূত্র: প্রথম আলো