|
| |
শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

লভ্যাংশ করের নতুন সমীকরণ: উদ্যোক্তাদের করভার কমলেও ছোট বিনিয়োগকারীর কী হবে

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:১৫ এএম
৩২১ পঠিত
লভ্যাংশ করের নতুন সমীকরণ: উদ্যোক্তাদের করভার কমলেও ছোট বিনিয়োগকারীর কী হবে
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:

বাংলাদেশে এত দিন ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড আয়ের ওপর করকাঠামো বেশ জটিল ও উচ্চ করভারের ছিল। লভ্যাংশ আয়কে সাধারণ আয়ের সঙ্গে যোগ করে উচ্চ আয়ের করদাতাদের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়মিত হারে কর দিতে হতো। যাদের সারচার্জ প্রযোজ্য, তাদের জন্য করহার ৩৭ থেকে ৩৮ শতাংশ হতে পারে।

অর্থাৎ ১০০ টাকা লভ্যাংশ আয় করলে ৩৭–৩৮ টাকা কর দিতে হতো। পাশাপাশি উৎসে কর কর্তন ছিল ‘ন্যূনতম কর’। ফলে অতিরিক্ত কেটে রাখা কর কখনো সমন্বয় বা ফেরত পাওয়ার সুযোগ ছিল না।

অর্থ আইন ২০২৬–এর মাধ্যমে ২০২৬–২৭ করবর্ষ থেকে এ ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে। আয়কর আইনের সপ্তম তফসিল অনুসারে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার লভ্যাংশ আয়ের ওপর করের হার এখন সরাসরি ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎসে কেটে রাখা কর আর চূড়ান্ত ন্যূনতম কর নয়, এটি এখন অগ্রিম আয়কর হিসেবে গণ্য হবে।

উদ্যোক্তা ও শীর্ষ করদাতাদের জন্য এটি স্বস্তিদায়ক হলেও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি নতুন এক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

১. উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের বড় স্বস্তি: বেতন বনাম লভ্যাংশ

কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা, উদ্যোক্তা এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের জন্য এই সংশোধনী কর পরিকল্পনার এক চমৎকার দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

আগের নিয়মে পরিচালকেরা কোম্পানি থেকে লভ্যাংশ না নিয়ে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা নিতে বেশি আগ্রহী হতেন। কারণ, বেতন ও সুযোগ-সুবিধা খরচ হিসেবে দাবি করা যায় এবং কোম্পানির করভার কমে যায়।

নতুন নিয়মে সমীকরণ বদলে গেছে

ব্যক্তিগত করভারের নাটকীয় হ্রাস: একজন শীর্ষ উদ্যোক্তা, যিনি তাঁর বেতনের ওপর সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ হারে কর দিতেন। তিনি এখন কোম্পানি থেকে লভ্যাংশ নিলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মাত্র ১৫ শতাংশ কর দেবেন। অর্থাৎ ব্যক্তিগত করভার প্রায় অর্ধেক কমে যাবে।

করপোরেট করের ভিত্তি সম্প্রসারণ: কোম্পানি কেবল কর-পরবর্তী মুনাফা থেকেই লভ্যাংশ দিতে পারে। ফলে কৃত্রিমভাবে অতিরিক্ত খরচ বা অযৌক্তিক উচ্চ পরিচালন–সুবিধা না দেখিয়ে পরিচ্ছন্ন মুনাফা থেকে লভ্যাংশ প্রদানে উৎসাহিত হবেন উদ্যোক্তারা। এতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রথমে করপোরেট কর পাবে, এরপর ব্যক্তিশ্রেণিতে ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ কর পাবে।

২. ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ওপর বাড়তি চাপ

একদিকে যখন শীর্ষ উদ্যোক্তারা লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা কিছুটা চাপে পড়বেন।

আইনে লভ্যাংশের ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। ধরা যাক, একজন ব্যক্তির (গৃহিণী, অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী বা ছোট বিনিয়োগকারী) বছরে ৩ লাখ টাকা লভ্যাংশ আয় রয়েছে। যাদের মোট আয় করমুক্ত সীমার নিচে বা ১০ শতাংশ ধাপে রয়েছে—তাঁদেরও শুরুতেই ১৫ শতাংশ (৪৫ হাজার টাকা) কর কেটে রাখা হচ্ছে।

৩. প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশের তুলনায় আমরা কোথায়

লভ্যাংশ করের ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিবেশী এবং সমপর্যায়ের অর্থনীতির দেশগুলো কী ধরনের নীতি অনুসরণ করছে, তা দেখলে বাংলাদেশের অবস্থানটি আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।

ভারত

নিকটতম প্রতিবেশী ভারতে লভ্যাংশ আয়ের ওপর কোনো আলাদা বা একক কর হার নেই। সেখানে একজন ব্যক্তির অন্যান্য সাধারণ আয়ের সঙ্গে লভ্যাংশ যোগ করা হয় এবং নিয়মিত হারে কর দিতে হয়। ফলে কোনো ব্যক্তির আয় বেশি হলে লভ্যাংশের ওপর সারচার্জসহ সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশের বেশি কর দিতে হতে পারে। তবে কোম্পানি লভ্যাংশ বিতরণের সময় প্রাথমিকভাবে ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখে।

ইন্দোনেশিয়া

ইন্দোনেশিয়ায় ব্যক্তিপর্যায়ে লভ্যাংশের ওপর সাধারণত ১০ শতাংশ চূড়ান্ত কর নেওয়া হয়। তবে দেশটির করব্যবস্থায় একটি দারুণ উৎসাহমূলক সুযোগ রয়েছে। লভ্যাংশ হিসেবে পাওয়া অর্থ যদি ব্যক্তি দেশের উৎপাদনশীল খাতে বা কোনো যোগ্য খাতে তিন বছরের জন্য পুনর্বিনিয়োগ করেন, তবে সেই আয়ের ওপর কোনো করই দিতে হয় না (অর্থাৎ করের হার শূন্য শতাংশ)।

মালয়েশিয়া

মালয়েশিয়া ‘সিঙ্গেল টিয়ার’ করকাঠামো অনুসরণ করে। অর্থাৎ কোম্পানি পর্যায়ে কর পরিশোধের পর শেয়ারহোল্ডারদের হাতে ১ লাখ রিঙ্গিত পর্যন্ত লভ্যাংশের ওপর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোনো ব্যক্তিগত কর দিতে হয় না। ১ লাখ রিঙ্গিতের সীমা অতিক্রম করলে ২ শতাংশ কর দিতে হয়।

ভিয়েতনাম

সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এবং রপ্তানি বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনাম বিনিয়োগকারীদের জন্য করকাঠামো বেশ সহজ ও আকর্ষণীয় রেখেছে। সেখানে ব্যক্তিশ্রেণির লভ্যাংশের ওপর মাত্র ৫ শতাংশ হারে কর কাটা হয়, যা পুরো অঞ্চলে অন্যতম সর্বনিম্ন।

বাংলাদেশ

আমাদের দেশে নতুন আইনে লভ্যাংশের ওপর নির্দিষ্ট ১৫ শতাংশ কর নির্ধারণ করা হয়েছে। লভ্যাংশ দেওয়ার শুরুতেই এই ১৫ শতাংশ অগ্রিম কর হিসেবে কেটে রাখা হচ্ছে।

ভারতের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশের বেশি করহারের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের নতুন ১৫ শতাংশ করব্যবস্থা নিঃসন্দেহে উদ্যোক্তা ও বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য বেশ স্বস্তিদায়ক ও প্রতিযোগিতামূলক। তবে ভিয়েতনাম ৫ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া (পুনর্বিনিয়োগে শূন্য থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ) কিংবা মালয়েশিয়ার (শূন্য শতাংশ) মতো আসিয়ানভুক্ত দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বিদেশি বিনিয়োগ ও দেশীয় শিল্পায়ন টানার দৌড়ে আমাদের দেশে লভ্যাংশের ওপর কর এখনো তাদের চেয়ে কিছুটা বেশি।

৪. পুঁজিবাজারে ইতিবাচক বার্তা

পুঁজিবাজারের উন্নয়নে এই সংস্কার অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। যেমন—

১. মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ: দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা মূলত ভালো লভ্যাংশ প্রদানকারী শক্তিশালী মৌলভিত্তির কোম্পানি খোঁজেন। লভ্যাংশ আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ করের নিশ্চয়তা শেয়ারবাজারের অস্থিরতা কমিয়ে মানুষকে ক্যাপিটাল গেইনের পেছনে না ছুটে লভ্যাংশের আশায় দীর্ঘমেয়াদে শেয়ার ধরে রাখতে উৎসাহিত করবে।

স্বচ্ছতা বৃদ্ধি: উদ্যোক্তারা এখন আইনসংগতভাবেই ১৫ শতাংশ কর দিয়ে মুনাফা ব্যক্তিগত হিসাবে নিয়ে আসতে পারবেন। ফলে ব্যালান্স শিটে কৃত্রিম হিসাব তৈরির প্রবণতা হ্রাস পাবে।

আমাদের ব্যবসায়ীরা প্রায় বলেন, কোম্পানি তো কর–পরবর্তী মুনাফার ওপর লভ্যাংশ দিচ্ছে। লভ্যাংশের ওপর আবার করারোপ দ্বৈত করের শামিল। অর্থ আইন ২০২৬–এর মাধ্যমে লভ্যাংশের ওপর ১৫ শতাংশ নির্দিষ্ট লভ্যাংশ করব্যবস্থা নিঃসন্দেহে আমাদের করকাঠামোর একটি আধুনিকায়ন এবং ব্যবসাবান্ধব উদ্যোগ। তবে এর শতভাগ সুফল নিশ্চিত করতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ পর্যন্ত (যেমন ১০০,০০০ টাকা) লভ্যাংশ করমুক্ত রাখা প্রয়োজন অথবা ১ লাখ টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ আয়ের ওপর করহার ১৫ শতাংশের পরিবর্তে ৫ শতাংশ করা যেতে পারে।

স্নেহাশীষ বড়ুয়া, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেড

সূত্র: প্রথম আলো