শিক্ষিত বেকার বাড়ছে, দক্ষ কর্মীর অভাব শিল্পে
গণমাধ্যম ডেক্স
দুই বছর আগে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন সাব্বির রহমান। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি শেষ হলেও তাঁর পড়া শেষ হয়নি। এখনো বই নিয়ে বসতে হয়। তবে সেই বইয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম নেই। আছে চাকরির প্রস্তুতি। ঢাকার আগারগাঁওয়ে একটি মেসে বন্ধুদের সঙ্গে থাকেন তিনি। নিয়মিত আবেদন করছেন সরকারি চাকরির জন্য, পরীক্ষাও দিচ্ছেন; কিন্তু চাকরি হয়নি।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে টাঙ্গাইলের একটি সরকারি কলেজ থেকে সমাজকর্ম বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেছেন সাব্বির। লেখাপড়া শেষে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ পেলেও তা কর্মজীবনে ঢোকার জন্য কতটা সহায়ক, সে প্রশ্ন তাঁর নিজেরই। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রথম দিনের কথা মনে করে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘যতটা উৎফুল্ল ছিলাম সেদিন, আজ ঠিক ততটাই হতাশায় আছি।’
সাব্বির একা নন। এই হতাশা অসংখ্য তরুণের। দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়লেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। আবার দেশের কর্মবাজারও প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী পাচ্ছে না।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রথম দিনের কথা মনে করে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘যতটা উৎফুল্ল ছিলাম সেদিন, আজ ঠিক ততটাই হতাশায় আছি।’
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) গত বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট গ্র্যাজুয়েটের ৬০-৭০ শতাংশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হন। তাঁদের বড় অংশ সমাজবিজ্ঞান, মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা এবং কিছু বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়ে পড়াশোনা করেন। কিন্তু তাঁদের একটি বড় অংশ কর্মবাজারে প্রবেশের সময় প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতিতে পড়ছেন বলে অভিযোগ শিল্পমালিকদের।
বিশেষায়িত খাতগুলোতে এই সংকট আরও স্পষ্ট। অনেক প্রার্থীর প্রযুক্তি সম্পর্কে সাধারণ ধারণা আছে। কিন্তু ব্যবসায়িক সমস্যা বোঝা, পণ্য তৈরি করা কিংবা বাস্তব কাজে প্রযুক্তি প্রয়োগের সক্ষমতায় ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশি অটোমেশন প্ল্যাটফর্ম ‘মার্কোপোলো ডটএআই’-এর উদ্যোক্তা তাসফিয়া তাসবিনের অভিজ্ঞতাও এমনই। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের একেকটি পদের জন্য শত শত প্রার্থী আবেদন করেন। কিন্তু সমস্যা সমাধানের পরীক্ষায় ১০-১৫ জনের বেশি ভালো করতে পারেন না। শেষ পর্যন্ত নিয়োগের উপযোগী কর্মী পাওয়া যায় মাত্র পাঁচ-ছয়জন। তাঁর ভাষায়, ‘আবেদনকারীর অভাব নেই। অভাবটা যোগ্য প্রার্থীর।’
তাসফিয়া জানান, যোগ্য কর্মী না পেয়ে তাঁরা বিদেশি কর্মীদের ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে কাজ করান। এতে দেশের অর্থও বাইরে চলে যায়। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমও বদলানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন তাসফিয়া। তাঁর পরামর্শ, পাঠ্যক্রম তৈরিতে সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি ইন্টার্নশিপের সুযোগও বাড়াতে হবে।
চাকরির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা
শিল্পমালিকেরা যোগ্য কর্মী সংকটের কথা যেমন বলছেন, এর বিপরীতে যেসব কাজে কম দক্ষতার প্রয়োজন, সেখানে প্রতিযোগিতা বাড়ছে অস্বাভাবিকভাবে। যেমন সম্প্রতি সমাজসেবা অধিদপ্তরে ১৬তম গ্রেডে ৩১২টি পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছিল ১২ লাখ ৩৪ হাজার ৪০৯টি। নিয়োগ পরীক্ষায় প্রতি পদের বিপরীতে প্রতিযোগী হলেন ৩ হাজার ৯৫৬ জন।
১৬তম গ্রেডের চাকরিগুলো মূলত তৃতীয় শ্রেণির প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক সহায়ক কাজ হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু উচ্চশিক্ষিত তরুণদের সিংহভাগ এখন এসব চাকরিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। প্রতিবেদনের শুরুতে যে সাব্বির রহমানের কথা বলা হয়েছে, তিনিও ১৬ গ্রেডের চাকরির জন্য চেষ্টা করছেন।
এমন পরিস্থিতিতে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদেরা। সরকারি চাকরিতে শুধু কম দক্ষতাসম্পন্ন তরুণেরাই ঝুঁকছেন এমনটি নয়, বরং সামাজিক প্রেক্ষাপট ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা ভেবেও অনেকে নিম্নস্তরের সরকারি চাকরিতে আসছেন।
শুধু সরকারি চাকরিতে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে এমন নয়, চাকরি খোঁজার ওয়েবসাইট বিডিজবসের তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠানটি যেসব চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, সেগুলোর প্রতি পদের বিপরীতে এখন গড়ে ৫১৩ জন প্রার্থী আবেদন করছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত হিসাব করে এ তথ্য জানিয়েছে বিডিজবস।
শেষ পর্যন্ত নিয়োগের উপযোগী কর্মী পাওয়া যায় মাত্র পাঁচ-ছয়জন। তাঁর ভাষায়, ‘আবেদনকারীর অভাব নেই। অভাবটা যোগ্য প্রার্থীর।’
৮ বছরে উচ্চশিক্ষিত বেকার বেড়ে দ্বিগুণ
দেশে আগের চেয়ে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কত বেড়েছে, তা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ দেখলে বোঝা যায়। সংস্থাটির জরিপ অনুযায়ী, ২০১৭ সালে দেশে ৪ লাখ ৫ হাজার স্নাতক পাস বেকার ছিলেন। আর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার (পুরুষ ৫ লাখ ৫৭ হাজার, নারী ৩ লাখ ২৮ হাজার)। অর্থাৎ ৮ বছরের ব্যবধানে দেশে নতুন করে আরও ৪ লাখ ৮০ হাজার উচ্চশিক্ষিত বেকার বেড়েছে। বৃদ্ধির হার ১১৯ শতাংশ।
জরিপ অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা শহরের চেয়ে গ্রামে বেশি। মোট উচ্চশিক্ষিত বেকারের মধ্যে ৫ লাখ ৭১ হাজার গ্রামের। আর শহরে ৩ লাখ ১৪ হাজার। তাঁদের সিংহভাগই তরুণ। মোট বেকারের ৭৬ দশমিক ৩ শতাংশ ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী।
দেশে শিক্ষিত তরুণদের বছরের পর বছর বেকার থাকার পেছনে কয়েকটি কারণের কথা বলেছেন শিক্ষাবিদেরা। যেমন ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা, মানসম্মত ল্যাব ও গবেষণার অভাব এবং কর্মবাজারের চাহিদা ও পাঠক্রমের অমিল ইত্যাদি। আবার যাঁরা কাজে যোগ দিচ্ছেন, তাঁদের অল্পসংখ্যকই মিশ্র অর্থনীতির কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে পারছেন।
ঘাটতি কোথায়
উচ্চশিক্ষিত তরুণদের সনদ আছে, তবে চাকরি পাচ্ছেন না। প্রশ্ন হলো, সমস্যাটা কোথায়, দক্ষতার নাকি শিক্ষাব্যবস্থার; নাকি শিল্প খাত ঠিকমতো কাজ তৈরি করতে পারছে না।
দেশে শিক্ষিত তরুণদের বছরের পর বছর বেকার থাকার পেছনে কয়েকটি কারণের কথা বলেছেন শিক্ষাবিদেরা। যেমন ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা, মানসম্মত ল্যাব ও গবেষণার অভাব এবং কর্মবাজারের চাহিদা ও পাঠক্রমের অমিল ইত্যাদি। আবার যাঁরা কাজে যোগ দিচ্ছেন, তাঁদের অল্পসংখ্যকই মিশ্র অর্থনীতির কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে পারছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, ভবিষ্যতে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়তে হলে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর নতুন নতুন খাত যুক্ত হবে। সে জন্যই শুধু বেশি বেশি গ্র্যাজুয়েট থাকলেই হবে না, দরকার হবে দক্ষ গ্র্যাজুয়েটের।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন সরকারি কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন, এমন শিক্ষার্থীদের নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-অধিভুক্ত কলেজ থেকে বের হওয়া গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে গড়ে প্রায় ২৮ শতাংশ পাস করার তিন-চার বছর পরও বেকার। নারীদের অবস্থা আরও খারাপ। পুরুষ গ্র্যাজুয়েটদের বেকারত্বের হার যেখানে প্রায় ২০ শতাংশ, নারীদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৩৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) ২০২৩ সালে এই গবেষণা পরিচালনা করে।
বাংলা ভাষায় দক্ষতা আর কাজের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবে তাঁরা ভালো। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো ‘সফট স্কিল’ (ব্যক্তিগত ও আচরণগত দক্ষতা, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধান) খুবই কম পাওয়া যায়।
বিআইডিএসের জরিপে নিয়োগকারীদের মতামতও যোগ করা হয়। জরিপে চাকরিদাতারা বলেছেন, তথ্যপ্রযুক্তি দক্ষতা, ইংরেজি ভাষা, যোগাযোগ ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা আর দলগত কাজের ক্ষমতা—এই পাঁচটি বিষয়েই তাঁরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন নিয়োগের সময়। অথচ গ্র্যাজুয়েটদের এসব ক্ষেত্রেই ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। বাংলা ভাষায় দক্ষতা আর কাজের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবে তাঁরা ভালো। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো ‘সফট স্কিল’ (ব্যক্তিগত ও আচরণগত দক্ষতা, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধান) খুবই কম পাওয়া যায়।
বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ স্কিলস ফর টুমরোস জবস’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানে প্রবেশ নিয়ে বলছে, সমস্যাটা শুধু ইংরেজি বা কম্পিউটার শেখা, না-শেখার নয়। গভীর চিন্তা করার দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ, দলগত কাজের সংস্কৃতি—এসব যোগ্যতা বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে বহুলাংশে অনুপস্থিত। তার ওপর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার দুর্বল ভিত্তির কারণে অনেক শিক্ষার্থী তৃতীয় স্তরে পা রাখার আগেই মৌলিক পড়ালেখা আর গণিতের দক্ষতায় পিছিয়ে থাকেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গিয়েও সেই ঘাটতি পুষিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
তত্ত্বনির্ভর পাঠ্যক্রম
গ্র্যাজুয়েটদের পর্যাপ্ত দক্ষতা নিশ্চিত না হওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ হলো শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী পাঠ্যক্রম আধুনিক না হওয়া। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া ধীরগতির হওয়ায় গ্র্যাজুয়েটরা এখনো মুখস্থবিদ্যা ও লিখিত পরীক্ষার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। প্রকৌশল ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিষয়ে যাঁরা পড়ছেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও তত্ত্বীয় জ্ঞানের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, ব্যবহারিক দক্ষতা তৈরির সুযোগ কম। ফলে গবেষণাগার আর কর্মশালায় হাতে-কলমে কাজ শেখার অভিজ্ঞতা ছাড়াই অনেকে সনদ নিয়ে বেরিয়ে আসছেন।
নিয়োগকর্তাদের মতামতও একই রকম। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি আবদুল মুক্তাদির প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী কারিকুলাম হালনাগাদের চেষ্টা করছে। তবে শিল্প যে গতিতে এগোচ্ছে, সে তুলনায় দক্ষ গ্র্যাজুয়েট আসছে না। মৌলিক শিক্ষার দুর্বলতার কারণে চাকরিতে নিয়োগের পরও কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হয়। তিনি মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবহারিক জ্ঞান ও মৌলিক দক্ষতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বাড়াতে হবে গবেষণার কাজও।
আবদুল মুক্তাদির আরও বলেন, শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব নয়। তবে এমন গ্র্যাজুয়েট প্রয়োজন, যাঁরা নতুন প্রযুক্তি দ্রুত শিখে কাজে লাগাতে পারেন। এই জায়গায় এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে।
স্টেম শিক্ষা তলানিতে
দক্ষ জনবল তৈরির পথে কয়েকটি বড় দুর্বলতা বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দুর্বলতার শুরু স্কুল পর্যায় থেকেই। অনেক শিক্ষার্থীর পড়া, লেখা ও গণিতের মৌলিক ভিত্তি দুর্বল থাকে। সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাও যথেষ্ট তৈরি হয় না। ফলে সেই ঘাটতি পরের স্তরে চলে আসে। এ সমস্যার পরিণতি দেখা যায় শিক্ষাজীবন শেষে। অনেক মানুষ শিক্ষিত হচ্ছেন, কিন্তু কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছেন না।
যেসব তরুণ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল কিংবা গণিতের মতো বিষয়ে যত বেশি দুর্বল, তাঁদের বেকার থাকার সম্ভাবনাও ততটাই বেশি। এমন মত বিশেষজ্ঞদের। বিশ্বজুড়ে গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষতা নির্ণয়ের একটি পদ্ধতি হলো, স্টেম শিক্ষার হার বিবেচনায় নেওয়া। সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যাথমেটিকস—এই চার বিষয়ের প্রথম অক্ষর মিলিয়ে সংক্ষেপে বলা হয় স্টেম শিক্ষা। যে দেশে স্টেম শিক্ষায় যত বেশি অংশগ্রহণ আছে, সে দেশের অর্থনীতির ভিত ও ধরনও তত ব্যতিক্রম হয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা স্টেম শিক্ষায় অন্য দেশগুলোর তুলনায় কম পারদর্শী। ফলে বাংলাদেশে টেকসই অর্থনীতি গড়ে উঠছে না।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে স্টেম গ্র্যাজুয়েটের হার মোট গ্র্যাজুয়েটের ১১ দশমিক ১৩ শতাংশীয় পয়েন্ট। মূলত সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বিশ্বব্যাংক এ পরিসংখ্যান জানায়। তবে ২০২০ সালের পর বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের তথ্য আর হালনাগাদ করেনি। ২০২০ সালে এই হার ক্রমহ্রাসমান ছিল।
সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যাথমেটিকস—এই চার বিষয়ের প্রথম অক্ষর মিলিয়ে সংক্ষেপে বলা হয় স্টেম শিক্ষা। যে দেশে স্টেম শিক্ষায় যত বেশি অংশগ্রহণ আছে, সে দেশের অর্থনীতির ভিত ও ধরনও তত ব্যতিক্রম হয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা স্টেম শিক্ষায় অন্য দেশগুলোর তুলনায় কম পারদর্শী। ফলে বাংলাদেশে টেকসই অর্থনীতি গড়ে উঠছে না।
স্টেম গ্র্যাজুয়েটের তথ্য উপস্থাপন করে সম্প্রতি রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে দ্রুত স্টেম গ্র্যাজুয়েট বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ। তিনি বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে তুলনা করে দেখান, ২০১৪-১৫ সালে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা শেষ করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্টেম গ্র্যাজুয়েটের হার ছিল ১১ দশমিক ২০ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সময়ে তা বেড়ে হয় ১২ দশমিক ১০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় আট বছরে বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট।
একই সময়ে ভিয়েতনামে স্টেম গ্র্যাজুয়েটের অংশ বেড়েছে ৩ দশমিক ৮০ শতাংশীয় পয়েন্ট, থাইল্যান্ডে ৩ দশমিক ৪০, ইন্দোনেশিয়ায় ৩ দশমিক ২০, শ্রীলঙ্কায় ২ দশমিক ৭০, নেপাল ও ফিলিপাইনে ২ দশমিক ৬০, ভারতে ২ দশমিক ৩০ এবং পাকিস্তানে ১ দশমিক ৭০ শতাংশীয় পয়েন্ট। অধ্যাপক আসাদুল্লাহ ইউনেসকো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিসটিকস (ইউআইএস) ও নিজস্ব গবেষণার বরাতে এসব তথ্য উপস্থাপন করেন।
অধ্যাপক আসাদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, স্টেম শিক্ষার হার যত বাড়বে, দেশের অর্থনীতির ধরন এবং ভিত ততটা মজবুত হবে। উল্লেখিত দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করার কারণ হলো, ওই দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা রয়েছে। অর্থাৎ প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার ধরতে না পারলে দেশগুলোর তুলনায় অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে।
বাংলাদেশের সংকট দুই রকমের উল্লেখ করে অধ্যাপক নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, একদিকে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার মতো স্টেম গ্র্যাজুয়েট যেমন বাড়ছে না, আবার যাঁরা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশলের মতো বিষয়গুলো পড়ছেন, তাঁরা পর্যাপ্ত দক্ষতা গ্রহণের সুযোগও পাচ্ছেন না।
কেমন প্রভাব অর্থনীতিতে
শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ স্নাতক না পাওয়ায় চাকরির বাজারে দেশের তরুণেরা পিছিয়ে পড়ছেন। ফলে সংখ্যায় উচ্চশিক্ষিত বাড়লেও বেকারের সংখ্যা কমছে না। সম্প্রতি তৈরি পোশাকশিল্পের পর ‘সেমিকন্ডাক্টর’ শিল্পকে বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাবনাময় পরবর্তী চালিকা শক্তি ও জাতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে স্মার্টফোন, কম্পিউটার, গাড়ি, টেলিভিশন ও চিকিৎসা সরঞ্জামে ব্যবহৃত চিপ ও অন্যান্য উপাদান তৈরি করা হয়।
শিল্পমালিকেরা বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে যাঁরা এই শিল্পে আসছেন, তাঁদের শিল্পের কর্মপরিবেশ বোঝানো থেকে শুরু করে দক্ষতা নিশ্চিত করতে নতুন করে কাজ করতে হচ্ছে। এতে ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক বাজারেও পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে এই শিল্পকে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ ডিজাইনিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং, অ্যাডভান্সড রোবোটিকস ও অটোমেশন, ব্লক চেইন ও সাইবার সিকিউরিটির মতো শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি কর্মী সংকটে পড়ছে।
সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ ডিজাইন শিল্প নিয়ে কাজ করা প্রাইম সিলিকন টেকনোলজি লিমিটেডের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) তারেক খান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা যে ধরনের কর্মী খোঁজেন, সে ধরনের কর্মীকে নিয়োগ দেওয়ার পর শিল্পের উপযোগী করে তুলতে পরবর্তী সময়ে অনেক সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। এমন সংকট থেকে বাঁচার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমকে আধুনিক করার পরামর্শ দেন তিনি।
অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদদের মতে, স্টেম শিক্ষায় পিছিয়ে থাকায় বাংলাদেশ ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে পারে। ভিয়েতনাম ও ভারত দক্ষ জনবলের ওপর ভর করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে।
অন্তত একটি কারিগরি দক্ষতা দরকার
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশে এখনো ভালো চাকরি বলতে সরকারি চাকরি বা দেশের বাইরে যাওয়াকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর তরুণদের বড় একটি অংশের লক্ষ্য থাকে সরকারি চাকরি খোঁজা। সাব্বিরের গল্পে সেটিই দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ নেওয়ার পরও তিনি ১৬তম গ্রেডের বিভিন্ন চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান শিক্ষা ও কর্মবাজারের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, চাকরির জন্য আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি হলেও তাঁদের বড় অংশের দক্ষতা নিয়োগদাতাদের প্রয়োজনের সঙ্গে মেলে না। ফলে একদিকে তরুণেরা চাকরির অপেক্ষায় থাকেন; অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী খুঁজে পায় না। তাঁর মতে, শুধু উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। পড়াশোনার সময়ই শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা যদি কর্মসংস্থান উপযোগী দক্ষতা না পান, আর স্টেম গ্র্যাজুয়েটও না বাড়ে, তাহলে ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে সংকট আরও বাড়বে।
সূত্র: প্রথম আলো