|
| |
শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশ : অপপ্রচার বনাম অর্জন ও বাস্তবতা

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
২৬৪ পঠিত
শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশ : অপপ্রচার বনাম অর্জন ও বাস্তবতা
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
সত্যকে আড়াল করতে কখনো কখনো একটি বিচ্ছিন্ন তথ্যই যথেষ্ট; কিন্তু তা দিয়ে বাস্তবতা বদলে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের কার্যক্রম নিয়েও বর্তমানে তেমন অপপ্রচারের চেষ্টা দৃশ্যমান। মিশনে সদস্যসংখ্যার পরিবর্তনকে সামনে রেখে দেশের অবস্থান হারানোর যে নেতিবাচক বয়ান তৈরি করা হচ্ছে, তাতে উপেক...

সত্যকে আড়াল করতে কখনো কখনো একটি বিচ্ছিন্ন তথ্যই যথেষ্ট; কিন্তু তা দিয়ে বাস্তবতা বদলে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের কার্যক্রম নিয়েও বর্তমানে তেমন অপপ্রচারের চেষ্টা দৃশ্যমান। মিশনে সদস্যসংখ্যার পরিবর্তনকে সামনে রেখে দেশের অবস্থান হারানোর যে নেতিবাচক বয়ান তৈরি করা হচ্ছে, তাতে উপেক্ষিত থাকছে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা—বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষা কার্যক্রমই সংকুচিত হচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতেও শীর্ষ চার শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতায়ও বাংলাদেশি সদস্যদের অংশগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি অডিও বার্তায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে সামরিক বাহিনী ও দেশের পরিস্থিতি নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। ‘নিউ ইয়র্ক বাংলা লাইফ’ নামের ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত ওই বার্তায় ‘প্রতিটি ফোঁটা রক্তের হিসাব নেওয়ার’ মতো উসকানিমূলক বক্তব্যও রয়েছে। অথচ বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে বিচ্ছিন্ন কোনো সময়ের সদস্যসংখ্যা নয়, বরং বৈশ্বিক মিশনের সংখ্যা, অর্থায়ন, দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতা ও আন্তর্জাতিক সামরিক সহযোগিতার পরিধি বিবেচনা করতে হবে।

২০১৮ সালের পরবর্তী ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, প্রধান অর্থায়নকারী দেশগুলোর নীতির পরিবর্তন এবং জাতিসংঘের আর্থিক সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ব্যয় সংকোচন ও পুনর্বিন্যাস চলছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাজেট ১০ শতাংশের বেশি কমিয়ে ৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর প্রভাবে বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষীর সংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ কমানো হয়েছে। মালির পর গত ১ নভেম্বর পশ্চিম সাহারায় দীর্ঘ ৩৫ বছরের পুরোনো মিশনটিও বন্ধ হয়েছে। জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেটের ২২ শতাংশ এবং শান্তিরক্ষা বাজেটের ২৭ শতাংশ অর্থায়ন করে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৫ সালের আগস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য বরাদ্দ ৮০ কোটি ডলারের শান্তিরক্ষা তহবিল বাতিল করেন। ফলে সদস্যসংখ্যা হ্রাস বাংলাদেশের একক কোনো পরিস্থিতি নয়; এটি বৈশ্বিক সংকোচনেরই অংশ। এই বাস্তবতায়ও শীর্ষ চার শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দেশের অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ ও পেশাদারিত্বের পরিচায়ক।

জাতিসংঘের বাইরেও বাংলাদেশের সামরিক জনবলের আন্তর্জাতিক চাহিদা বাড়ছে। বিভিন্ন দেশের দ্বিপাক্ষিক ও হাইব্রিড সামরিক কার্যক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩ হাজার ৪০০ জনের বেশি সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। কুয়েতের অপারেশন কুয়েত পুনর্গঠনে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত মিলিয়ে ৫ হাজার ৭৬৮ জন বাংলাদেশি সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। হাইতিতে গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোর্সের আওতায় ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে ১ হাজার ৪০০ সদস্য সংযোজনের প্রক্রিয়া চলছে; ইতিমধ্যে ২৩০ সদস্যের অগ্রগামী দল সেখানে অবস্থান করছে।

মধ্যপ্রাচ্যেও বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতার পরিধি বিস্তৃত হচ্ছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বরের অফিশিয়াল রেকর্ড অনুযায়ী, কাতারে বাংলাদেশ মিলিটারি কন্টিনজেন্টের সদস্যসংখ্যা ৫ হাজার ৭৬৭ জন। দেশটির কোস্ট অ্যান্ড বর্ডার সিকিউরিটিতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ১৩৭ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন; ৫ নভেম্বর আরও ২৪ জন যোগ দিলে সংখ্যা দাঁড়াবে ১৬১। এ ছাড়া কাতারের সশস্ত্র বাহিনীতে বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর জন্য নতুন ৫০০টি পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। সৌদি আরবের সঙ্গে নতুন মেরিটাইম অ্যালায়েন্সের আওতায় দুটি ফ্রিগেট ও একটি এয়ার ডিফেন্স ব্যাটারিসহ প্রায় এক হাজার সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের সামরিক দক্ষতা এবং বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক সম্প্রসারণের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

বিশ্বশান্তিতে বাংলাদেশের অবদান সংরক্ষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ১০ জুন আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা প্রতিকূলতা ও কঠিন চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে বিশ্বমঞ্চে যে গৌরব অর্জন করেছেন, তা কোনোভাবেই ম্লান হতে দেওয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর দুই লাখেরও বেশি সদস্য বিশ্বের ৪৩টি দেশে প্রায় ৬৩টি মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের সাহস, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি শান্তিরক্ষীদের দেশের সম্মানের বাহক হিসেবে অভিহিত করেন।

আন্তর্জাতিক মিশনে নিয়োজিত সদস্যদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও জাতিসংঘের নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদারে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সম্প্রতি দক্ষিণ সুদান ও আবেই সফর করেন। পাঁচ দিনের সফরে তিনি আনমিস ও ইউনিসফা মিশনে বাংলাদেশি সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যদের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। সংশ্লিষ্ট মিশনের ফোর্স কমান্ডার, মিশন নেতৃত্ব এবং দক্ষিণ সুদানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধানের সঙ্গেও বৈঠক করেন। সদস্যদের শৃঙ্খলা, সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেন। অন্যদিকে, গত সেপ্টেম্বরে নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীমের সৌদি আরব সফরে দুই দেশের নৌবাহিনীর সহযোগিতা ও সামরিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের বিষয় গুরুত্ব পায়।

জাতিসংঘ মিশনে বিমানবাহিনীর অবদানও অব্যাহত রয়েছে। কঙ্গোতে দায়িত্ব পালনের জন্য চারটি এমআই সিরিজের হেলিকপ্টার ও ১৩৪ সদস্যের জনবল নিয়ে ইউটিলিটি এভিয়েশন ইউনিট-২৩ নতুন দায়িত্ব গ্রহণে যাত্রা করেছে। ২৮ অক্টোবর ২৩ জন এবং ৪ নভেম্বর অবশিষ্ট ১১১ জন সদস্য রওনা হন। নতুন কন্টিনজেন্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এয়ার কমডোর এ টি এম ইরফানুর রহমান। বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন সদস্যদের শৃঙ্খলা, সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন।

১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক মিশনে মাত্র ১৫ জন সদস্য পাঠানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সূচনা। এরপর রুয়ান্ডা, কঙ্গো, সুদান, মালি ও দক্ষিণ সুদানের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি চিকিৎসা, শিক্ষা, অবকাঠামো নির্মাণ ও মানবিক সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যার সময় তাঁদের সাহসিকতা এবং সিয়েরা লিওনে বাংলা ভাষার প্রতি স্থানীয় জনগণের বিশেষ শ্রদ্ধা বাংলাদেশের অবদানের স্মরণীয় দৃষ্টান্ত।

বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আন্তর্জাতিক অবস্থান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কয়েক দশকের অর্জন, চলমান দায়িত্ব এবং নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। মাত্র ১৫ জন সদস্য নিয়ে শুরু হওয়া বাংলাদেশের শান্তিরক্ষার যাত্রা আজ বিশ্বমঞ্চে দেশের মর্যাদার গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। এই অর্জনের পেছনে রয়েছে হাজারো সামরিক সদস্যের সাহস, দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগ। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় যে দায়িত্ব পালন করে আসছে, তা কোনো গুজব বা অপপ্রচারে ম্লান হওয়ার নয়। ইতিহাস ও বাস্তবতার সাক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠিত থাকবে বাংলাদেশের এই গৌরব।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা; অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম।

mamunzi859@gmail.com

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স