সেন্টমার্টিনে ৩২ বছর ধরে অচল সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র
গণমাধ্যম ডেক্স
দেশের একমাত্র প্রবালের সৌন্দর্যৈ ঘেরা সেন্টমার্টিন দ্বীপে সরকারিভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ আছে গত ৩২ বছর ধরে। দ্বীপটিতে বেসরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আসছে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেড।
সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা করে বাড়িয়ে ৭৬ টাকা নির্ধারণ করেছে। যেখানে সারা দেশে বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের নির্ধারিত দাম ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা। অর্থাৎ, জাতীয় গ্রিডের তুলনায় সেন্টমার্টিনে বিদ্যুতের দাম প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।
সোমবার (২ নভেম্বর) থেকে নতুন এই দাম কার্যকর হয়েছে, বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাসিন্দাদের বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য আশির দশকে জেনারেটরভিত্তিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছিল বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। দ্বীপের মধ্যভাগে পশ্চিম উত্তরপাড়ায় বাতিঘরের দক্ষিণ পাশে প্রায় পাঁচ একর জমিতে স্থাপিত ওই কেন্দ্রে ছিল দুটি জেনারেটর। সেখান থেকে তখন প্রায় ৬০০ গ্রাহককে সন্ধ্যায় কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ দেওয়া হতো।
১৯৯৪ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভেঙে পড়ে দেড় শতাধিক খুঁটি, ছিঁড়ে যায় বিদ্যুতের তার। এরপর আর সচল করা হয়নি কেন্দ্রটি। টানা ৩২ বছর ধরে অচল পড়ে আছে সরকারি এই বিদ্যুৎকেন্দ্র।
এরপর ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বেসরকারি উদ্যোগে দ্বীপের কোনারপাড়া এলাকায় প্রায় দুই একর জমিতে স্থাপন করা হয় ২৫০ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প। ৯১৫টি সৌর প্যানেল নিয়ে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেড।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় এক হাজার গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে ১৪০টি হোটেল, ২০টি রেস্তোরাঁ, ৬০০টি বাসাবাড়ি, ১৫৭টি দোকানপাট, ছয়টি সেচপাম্প ও ১৫টি ইজিবাইক চার্জিং পয়েন্ট।
দ্বীপের বিদ্যুৎ সরবরাহ এখন মূলত এই বেসরকারি প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পর্যটন মৌসুম শুরু হলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। বাড়তি চাহিদা মেটাতে জেনারেটর চালানোর খরচের কথা বলে ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত মূল্যহার অনুযায়ী, সারা দেশে সাধারণ আবাসিক গ্রাহকদের প্রথম ৭৫ ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা। পরবর্তী ধাপগুলোতে এ দাম ৮ টাকা ৫০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা। আর বাণিজ্যিক ও অফিসের গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা।
অন্যদিকে সেন্টমার্টিনে আগে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ছিল ৫৫ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৬৬ টাকা। নতুন সিদ্ধান্তে উভয় শ্রেণির গ্রাহকের জন্য ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। ফলে আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৬৫ টাকা ও ৭৬ টাকা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রকল্প চালুর পর শুরুর দিকে বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। তখন আবাসিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিটের দাম ছিল ৩২ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৪২ টাকা। ২০২২ সালের জুনে উভয় শ্রেণির গ্রাহকের জন্য পাঁচ টাকা করে দাম বাড়ানো হয়। এরপর বিদ্যুৎ সরবরাহ কমতে থাকে।
২০২৩ সালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা বলে ইউনিটপ্রতি দাম আরও ১০ টাকা বাড়ায় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তাতেও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হয়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে গ্রাহকদের না জানিয়েই কয়েকদফায় দাম বাড়ানো হয়েছে।
তাদের আরও অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিল রিচার্জের সময় বিভিন্ন খাতে টাকা কেটে নেওয়া হয়। এক হাজার টাকা রিচার্জ করলে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত কেটে নেওয়া হয়। কোন খাতে কত টাকা কাটা হচ্ছে, তারও স্পষ্ট হিসাব দেওয়া হয় না। ফলে প্রকৃতপক্ষে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম কত পড়ছে, তা বুঝতে পারছেন না গ্রাহকেরা।
ব্যবসায়ী মৌলভী আবু তাহের বলেন, বর্তমানে দ্বীপের সোলার প্যানেলের বিদ্যুতের জন্য ইউনিটপ্রতি ৭৪ থেকে ৮২ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। এই ব্যয় স্থানীয়দের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের অংশ হিসেবে আমরাও সরকারিভাবে বিদ্যুৎ চাই।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ছৈয়দ আলম বলেন, প্রথম দুই বছর ঠিকমতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছিল। কিন্তু এরপর ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দিনে তিন থেকে চার ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায়নি। বাকি সময় সরবরাহ বন্ধ থাকে।
তিনি বলেন, সরকারিভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে দ্বীপে ক্যাবল স্থাপন করে বিদ্যুৎ আনা হোক। যাদের স্থাপনা রয়েছে, তাদের ছাদ ব্যবহার করে সোলারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, বিদ্যুতের সংকটের বিষয়টি আমরা সরকারের কাছে তুলে ধরেছি। কিছুদিন আগে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়েছিল। ওই বৈঠকে আমরা জানিয়ে দিয়েছিলাম, বাড়তি দামে আমাদের বিদ্যুতের প্রয়োজন নেই। প্রতিষ্ঠান চাইলে তাদের বিদ্যুৎ নিয়ে যেতে পারে। আমরা দ্বীপবাসীর সুবিধার্থে সরকারিভাবে পিডিবির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি করছি।
জানতে চাইলে ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেডের সেন্টমার্টিন কার্যালয়ের প্রকৌশলী মোহাম্মদ শিহাব বলেন, প্রকল্পটি স্থাপনের সময় বিদ্যুতের চাহিদা অনেক কম ছিল। এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা প্রবেশ করায় চাহিদা বেড়েছে। ফলে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এছাড়া পর্যটন মৌসুমে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা করছে কোম্পানি। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা বাড়ানো হচ্ছে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা করে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেডের পক্ষ থেকে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। তবে স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দাম বাড়ানো হবে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল।’
সূত্র: কালবেলা