|
| |
শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

৭ নভেম্বর কী ঘটেছিল, কী দেখেছিলাম

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৬:২৯ এএম
৪৩৫ পঠিত
৭ নভেম্বর কী ঘটেছিল, কী দেখেছিলাম
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম এক মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন তৎকালীন বিভিন্ন সামরিক তৎপরতা ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর রচিত ‘রক্তাক্ত দিনগুলো: ১৯৭৫-১৯৮১’ গ্রন্থ থেকে ৭ নভেম্বরের সেই ঘটনাবলি প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

৭ নভেম্বর ১৯৭৫। সময় তখন প্রায় মধ্যরাত। চারদিকে গোলাগুলির আওয়াজ আর ‘জিন্দাবাদ’ ধ্বনির মধ্যে ঘুম ভেঙে গেল। হকচকিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়লাম। বাসার সবাই আতঙ্কিত। আমি পেছনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখান থেকে সেনানিবাসের প্রধান সড়ক দেখা যায়। সৈনিকভর্তি অনেক গাড়ি। তারাই এই আওয়াজ করছে। করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে কয়েকটি ট্যাংককে টপ স্পিডে দক্ষিণ দিকে যেতে দেখলাম।

তেজগাঁও বিমানবন্দরের দিক থেকে বিমানবিধ্বংসী কামানের ছোড়া ট্রেসার রাউন্ড তখন দক্ষিণমুখী আকাশকে রক্তিম করে তুলছিল। বুঝতে পারছিলাম না হঠাৎ করে এমন কী হলো! সন্ধ্যায় বিতরণ করা লিফলেট আর শোনা গুজবের কথা মনে পড়ল।

একবার মনে করলাম, হয়তো ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানে জড়িত ইউনিট আর খালেদ মোশাররফের সমর্থক ইউনিটের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। আর তা–ই যদি হয়, তবে এ কয় দিন এই নবীন দেশটিতে যে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তা বোধ হয় শুরু হয়ে গেল।

আমার নিচের তলাতেই থাকতেন অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট (বিমানবিধ্বংসী) ইউনিটের অধিনায়ক লে. কর্নেল মাশাহেদ চৌধুরী, যাঁর ইউনিটের একটি ব্যাটারি তেজগাঁও বিমানবন্দরে রাখা হয়েছিল বিমানবন্দরের পথ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। তাঁরা আমাদের ডেকে নিচে তাঁদের বসার ঘরে নিয়ে গেলেন। তারপর তিনি আমাকে অনেক কথাই বললেন। বললেন কীভাবে তাঁর ইউনিটের একটি ব্যাটারিকে তাঁর নির্দেশ ছাড়াই বিমানবন্দরে নিয়ে গিয়ে মোতায়েন করা হয়েছে। আগের দিনের লিফলেট সম্বন্ধেও অনেক কিছু বললেন।

তখনো আমরা অনুমান করতে পারিনি যে বাইরে আসলে কী ঘটে চলেছে। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে প্রায় সকাল হয়ে এল। সারা রাত ধরে চলল গোলাগুলির আওয়াজ। এর মধ্যেই আজানের ধ্বনি শোনা গেল।

পুবের আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হতেই তাড়াতাড়ি ইউনিফর্ম পরে আমার প্রতিবেশী মেজর হারুনের সঙ্গে (পরে কর্নেল, অবসরপ্রাপ্ত) হাঁটতে হাঁটতে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। হারুন যেহেতু স্টেশন হেডকোয়ার্টারে স্টাফ অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন, কাজেই তিনিও আমার সঙ্গে হেঁটেই স্টেশন হেডকোয়ার্টারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আমরা দুজনই একসঙ্গে বের হলাম।

প্রধান সড়কে উঠতেই দুজন পরিচিত অফিসারের দেখা পেলাম। একজন মেজর মাশুক আহমেদ চৌধুরী (পরে ব্রিগেডিয়ার, বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত), অপরজন লে. কর্নেল শরিফ, যিনি সেনাসদরের অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল ব্রাঞ্চের একজন পরিচালক, ছিলেন সফিউল্লাহ এবং জিয়ার ব্যাচমেট। দুজনই একই মোটরসাইকেলে, মাশুক ইউনিফর্ম পরা হলেও লে. কর্নেল শরিফের পরনে রাতেরই পোশাক।

তাঁরা আমাদের দেখে বললেন, জেনারেল জিয়াউর রহমানকে এইমাত্র বন্দী অবস্থা থেকে বের করে ২ ফিল্ড রেজিমেন্টে নিয়ে আসা হয়েছে। তাঁরা আমাদের সেখানেই চলে যেতে বললেন। জানালেন ওখানে অন্য অফিসাররাও আছেন। এর বেশি আর কিছু বলার সময় তাঁরাও পেলেন না আর আমরাও কিছু শুনতে পারছিলাম না।

পথের উল্টো দিক থেকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে আর স্লোগান দিতে দিতে সৈনিক এবং কিছু বেসামরিক তরুণে ভর্তি একটি সামরিক ট্রাক আমাদের পাশ কাটিয়ে দ্রুতগতিতে চলে গেল। এ স্লোগান আমি প্রথম শুনলাম আর শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল। তারা স্লোগান দিচ্ছিল, ‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই/ অফিসারের রক্ত চাই’, ‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ/ জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’।

এই স্লোগান শোনার পর আমি আর হারুন আরও একটু দ্রুতগতিতে হাঁটতে লাগলাম। পথে আরও দুটি ট্রাক দ্রুতগতিতে চলে গেল। তার ওপরে বসা সামরিক সদস্যদের সঙ্গে জনাকয় অস্ত্রধারী বেসামরিক তরুণ। পরে জানলাম এসব বেসামরিক তরুণ কর্নেল তাহেরের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গণবাহিনীর সদস্য। তখনো বুঝতে পারিনি এটা কাদের বা কোন ধরনের বিপ্লব।

দু-একজন তরুণ অফিসারকেও এসব বিপ্লবী সৈনিকের সঙ্গে দেখলাম। তাদের কাঁধে কোনো ব্যাজেজ অব র‍্যাঙ্ক নেই। একজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করাতে জানাল, ‘স্যার, আজ থেকে সিপাহি আর অফিসারদের মধ্যে র‍্যাঙ্কের কোনো পার্থক্য থাকবে না। সশস্ত্র বাহিনীতে কোনো শ্রেণিবিন্যাস থাকবে না। এটাই এ বিপ্লবের মূলকথা।’

আমার হতবাক হওয়ার পালা, তাহলে কি কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা বিপ্লব ঘটিয়েছে? আর এটাই বোধ হয় তাহেরের শ্রেণিসংগ্রামের সূত্রপাত এবং তার জন্য প্রথম ধাপে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা! আরও কয়েকটি জিপ আমাদের পাশ দিয়ে দ্রুতগতিতে বের হয়ে গেল। এরপর কিছুই আর বোঝার বাকি থাকল না। সৈনিকদের সঙ্গে জেএসডির গণবাহিনীর সদস্যরা, যাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে শ্রেণিসংগ্রামের জন্য, তারাও এখন সেনানিবাসে।

দৈনিক বাংলা পত্রিকার কাটিং, ৮ নভেম্বর ১৯৭৫

দ্রুত হেঁটে দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টের প্রধান ফটকে এসে পৌঁছালাম। সেখানে প্রথমেই দেখা হলো ইউনিটের সুবেদার মেজর আনিসের (পরে অনারারি ক্যাপ্টেন) সঙ্গে। দেখা হতেই আনিস আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘স্যার, আল্লাহর রহমতে আপনাকে পাওয়া গেছে। ব্রিগেডে কেউ নেই, কাউকেই পাওয়া যাচ্ছে না। জিয়া সাহেব আপনাদের খোঁজ করছেন।’

সংক্ষেপে তিনি আরও জানালেন, রাত ১২টার দিকে ‘সিপাহি বিপ্লব’ শুরু হওয়ার পর প্রথম বেঙ্গলের গার্ডদের সরিয়ে সকালের দিকে মেজর মুহিউদ্দিন (পরে লে. কর্নেল) এবং এই রেজিমেন্টেরই অন্যান্য সিপাহি জিয়াকে তাদের ইউনিটে নিয়ে আসে। এই মুহূর্তে জিয়া অধিনায়কের অফিসে আছেন। তাঁর সঙ্গে আছেন আরও কয়েকজন অফিসার এবং ৫৫ ব্রিগেডের যশোরের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত আলীও।  

দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্ট সেদিন শুধু সামরিক বাহিনীরই নয়, বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো। স্মরণযোগ্য যে এই দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টই রশীদের নেতৃত্বে ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী দুটি ইউনিটের একটি। আমরা দ্বিতীয় ফিল্ডে যখন পৌঁছাই, তখন সেখানে মাত্র ১০ থেকে ১৫ জন অফিসারকে দেখলাম। সেখানে মুহূর্তে মুহূর্তে যে দৃশ্যের অবতারণা হচ্ছিল, তাতে মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশে সেনাবাহিনী বলে কোনো দিন কোনো সংস্থা ছিল না। এখানে কারও কোনো কর্তৃত্ব আছে বা ছিল বলে মনে হচ্ছিল না।

ইউনিট কোয়ার্টার গার্ড, যেখানে সামরিক কয়েদি রাখা হয়, সেই সেলগুলোতে দেখলাম লকআপে রয়েছেন বেশ কিছু চেনাজানা অফিসার। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন লে. কর্নেল বাহার। এমন একজন জ্যেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে এ রকমভাবে কোয়ার্টার গার্ড সেলে রাখার দৃশ্য দেখব বলে ভাবতেই পারিনি। এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা।

সুবেদার মেজর আনিসকে এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিত জিজ্ঞেস করাতে তিনি যে তথ্য দিলেন, তার সারমর্ম হলো, বিপ্লবী সৈনিকেরা কিছু অফিসারের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁদের লিস্ট তৈরি করে। তারপর তাঁদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হামলা চালায়। এ খবর পেয়ে এসব আতঙ্কগ্রস্ত অফিসার পরিবার-পরিজন ছেড়ে পালাতে থাকেন। তাঁদের মধ্যে যাঁদের পাওয়া গেছে, উন্মত্ত সৈনিকদের হামলা থেকে তাঁদের জীবন রক্ষায় তাঁদের নিরাপত্তামূলক হেফাজতে এনে রাখা হয়।

এই প্রোটেকটিভ বা নিরাপত্তামূলক হেফাজতে তাঁদের নেওয়ার ব্যাপারে কে তাঁদের হুকুম দিয়েছেন, তা সুবেদার মেজর আনিস সঠিকভাবে বলতে পারলেন না। তবে লে. কর্নেল বাহারের ব্যাপারে তিনি জানালেন যে যেহেতু তিনি (বাহার) আর্মি সিগন্যালের অধিনায়ক হিসেবে জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন এবং অন্যান্য বিষয়ে তাঁর ক্ষোভ ছিল, তাই বিপ্লবী সৈনিকেরা তাঁকে তাড়া করলে তিনি নিজেই আনিসকে তাঁকে কোয়ার্টার গার্ডে রাখতে বলেন।

আমি আনিসের বক্তব্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যটি হৃদয়ঙ্গম করে ধীরেসুস্থে অধিনায়কের অফিসে ঢুকি। ঢুকেই মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে অধিনায়কের চেয়ারে বসা অবস্থায় দেখলাম। তাঁর পাশে সাফারি পরা ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত আলী। আমি ভেতরে গিয়ে জিয়াকে অভিবাদন করার পর তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি ব্রিগেডে চলে যাও। গিয়ে সৈনিকদের কন্ট্রোল করো। তোমার কমান্ডারের (শাফায়াত জামিল) সঙ্গে আমি কিছুক্ষণ আগে কথা বলেছি, সে ভালোই আছে। আমিনকে নতুন কমান্ডার করা হয়েছে।’

আসলে তাহের ছিলেন দারুণ আত্মবিশ্বাসী এবং সেই সঙ্গে অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী একজন মানুষ। জিয়াউর রহমান তাহেরের অভিলাষ বোঝার পরপরই তাঁর কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং সৈনিকদের নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্য দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে থাকেন। জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা আর ব্যক্তিত্ব, সাহস আর ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দু-এক দিনের মধ্যেই পুরো পরিস্থিতি তাঁর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

আমি তাঁর কথা শোনার পর অফিস থেকে বের হতেই এ জে এম আমিনুল হকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তিনি আমাকে কিছুটা সময় সেখানেই অবস্থান করে সব দেখেশুনে পরিস্থিতি অনুধাবন করার পর ব্রিগেডে যেতে বললেন। তিনি আরও বললেন, যেহেতু ব্রিগেডের আর কোনো স্টাফকে পাওয়া যায়নি আর তিনিও নতুন, তা ছাড়া এ পরিস্থিতিতে তিনি তাঁর ইউনিট চতুর্থ বেঙ্গল ছেড়ে যেতে পারবেন না, তাই আমি একাই যেন সব দায়িত্ব পালন করি।

আমাকে হাফিজের জায়গায় বিএমের দায়িত্ব নিতে বললে আমি তাঁকে আশ্বস্ত করে জানালাম, ওদিকটা আমি দেখে রাখব। আমাকে তিনি আরও জানালেন, ব্রিগেড মেজর হাফিজ বা স্টাফ ক্যাপ্টেন তাজ, কাউকেই সেনানিবাসে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

জিয়াউর রহমান দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টে এসেই বঙ্গভবনে খালেদ মোশাররফের খোঁজ করেন; কিন্তু তাঁকে না পেয়ে শাফায়াত জামিলকে পেয়ে যান। সিপাহি বিপ্লব শুরু হওয়ার খবর পেয়েই খালেদ মোশাররফ, হুদা আর হায়দার একসঙ্গে বঙ্গভবন ছেড়ে চলে যান। ফলে জিয়া শেষ পর্যন্ত শাফায়াত জামিলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। শাফায়াত জামিলকে পেয়ে জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘ফরগেট অ্যান্ড ফরগিভ। ইউ কাম ব্যাক।’ তাঁর উত্তরে শাফায়াত জামিল এ রকম একটা কিছু বলেছিলেন, ‘আই অ্যাম আ রেবেল অ্যান্ড উইল রিমেইন সো।’

তিনি জিয়াউর রহমানকে আরও যা বলেছিলেন, তা তাঁর বইয়ে নিজেই উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আপনি সৈনিকদের দিয়ে বিদ্রোহ করিয়ে ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। আপনি বাঘের পিঠে সওয়ার হয়েছেন, আর নামতে পারবেন না। যা করার আপনি অফিসারদের নিয়ে করতে পারতেন, সৈনিকদের নিয়ে কেন? সেনাবাহিনীর মধ্যে হিংসা ও বিভেদের রাজনীতি ঢোকানো হয়েছে বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করি আমি।’

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান

তিনি আরও বলেছিলেন যে জিয়ার সঙ্গে তাঁর কথোপকথন কেউ আড়ি পেতে শুনে ইংরেজিতে তরজমা করছিল, যা ক্রস কানেকশনের কারণে শাফায়াত শুনেছিলেন। ওই সময় শাফায়াত জামিল যখন জিয়ার সঙ্গে বঙ্গভবনের ভেতর থেকে কথা বলছিলেন, তখন হয়তো তিনি বুঝতেও পারেননি যে এই অভ্যুত্থানের পেছনে জিয়া নয়, রয়েছেন তাহের, তাঁর ‘গণবাহিনী’ আর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা, অন্তত ওই পর্যায়ে।

মধ্যরাতে শাফায়াত জামিলকে যখন সেনানিবাসে ঘটে যাওয়া বিপ্লবের খবর দেওয়া হয়, তখনো তিনি প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারেননি। যখন জানতে পারলেন, তখন বেশ দেরি হয়ে গেছে। খালেদ মোশাররফের বঙ্গভবন ত্যাগ করার পর শাফায়াত জামিল জানতে পারেন যে তিনি একাই বঙ্গভবনে রয়ে গেছেন।

প্রায় ভোররাতের দিকে জিয়াউর রহমানের ফোন পাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন যে কিছু বিপ্লবী সৈনিক তাঁদের খোঁজে বঙ্গভবনের মেইন গেটে গিয়ে পৌঁছেছে। তখনই তিনি বেশ বিচলিত হয়ে ড্রাইভারের হাতে গাড়ির চাবি তুলে দিয়ে নিজে বঙ্গভবনের পেছনের দেয়াল টপকে পালানোর সময় তাঁর একটি পা ভেঙে যায়।

তিনি এবং বঙ্গভবনে চতুর্থ বেঙ্গলের কোম্পানি কমান্ডার মেজর দীদার আতাউরের সঙ্গে একটি গাড়িতে চড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোড ধরে মেঘনা ফেরিঘাট পর্যন্ত পৌঁছান। শাফায়াত জামিল তাঁর ভাঙা পা নিয়ে তখন আর এগোতে পারছিলেন না। এই সময় দৈবক্রমে সেখানে নারায়ণগঞ্জের মহকুমা হাকিমের (নারায়ণগঞ্জ তখন মহকুমা ছিল) সঙ্গে তাঁদের দেখা হয়। তিনি একটি লঞ্চযোগে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় দীদার আতাউর ও শাফায়াত জামিল নিজেদের পরিচয় দেন এবং তাঁকে জামিলের তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজনের কথা জানালে এসডিও সাহেব তাঁদের লঞ্চে তুলে নেন।

শাফায়াত জামিলের প্রাথমিক চিকিৎসার পর এসডিও সাহেব দুজনকে বন্দর থানায় সোপর্দ করেন। সেখান থেকেই ৭ নভেম্বর সকালে শাফায়াত জামিল জেনারেল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। কয়েক দিন পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ভাঙা পায়ের কারণে কিছুটা খুঁড়িয়ে চলতেন।

দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টের বারান্দায় দাঁড়িয়েই দেখতে পেলাম কর্নেল তাহের কিছু সৈনিক আর গণবাহিনীর সদস্য পরিবেষ্টিত অবস্থায় জিয়াউর রহমানের রুমে এসে ঢুকলেন। তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে দ্বিতীয় ফিল্ডের কয়েকজন সদস্যও ছিল। প্রথমে তাহের ও জিয়া কোলাকুলি করলেন। কোলাকুলি পর্ব শেষ হতেই তাহের জিয়াউর রহমানকে রেডিও স্টেশনে গিয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে বললেন।

কিন্তু তাহেরের আসার আগেই জিয়াউর রহমান দ্বিতীয় ফিল্ডে বসেই অন্যান্য অফিসারের পরামর্শে তাঁর ভাষণ টেপ করে রেডিওতে পাঠিয়ে দেন। পরে তাহের সৈনিকদের পক্ষ থেকে জিয়াকে কিছু দাবিদাওয়ার লিস্ট দিলে তিনি পরে এ ব্যাপারটি বিবেচনা করে দেখবেন বলে রেখে দেন। জিয়ার এমন আচরণে তাহের খুব একটা খুশি হতে পারলেন না। তিনি একান্তে জিয়ার সঙ্গে কিছু কথা বলে উত্তেজিত হয়ে অফিসকক্ষ ত্যাগ করেন।

জিয়ার সঙ্গে সেদিন তাহেরের কী কথা হয়েছিল, বিস্তারিতভাবে তা জানা না গেলেও অসমর্থিত সূত্রে কিছু তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। তবে সিপাহি বিপ্লবের শুরু থেকেই রেডিও বাংলাদেশ (‘বাংলাদেশ বেতার’-এর পরিবর্তিত নাম) দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও জাসদ গণবাহিনীর এখতিয়ারে ছিল এবং জিয়াকে সেখানে সশরীর গিয়ে ভাষণ দেওয়া থেকে বিরত করা হয়েছিল।

এম সাখাওয়াত হোসেনের গ্রন্থ 'রক্তাক্ত দিনগুলো : ১৯৭৫-৮১' (প্রথমা, ২০২৩)

এমনটা করা হয়েছিল এ কারণে যে তাহের প্রথম থেকেই জিয়াকে সম্পূর্ণভাবে তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। তাহের জিয়াকে রেডিওতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন সৈনিকদের দাবিদাওয়া এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো বা রূপরেখা কেমন হবে, সে সম্পর্কে ঘোষণা দেওয়ার জন্য।

বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্র থেকে আরও জানা গেছে যে তাহেরের পরিকল্পনা ছিল জিয়াকে রেডিও স্টেশন থেকে শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিকদের উদ্দেশে তাঁকে ভাষণ দিতে বলা। বিপ্লবী সৈনিকদের পরিকল্পনা ছিল জিয়াকে ফেরার সময় পথিমধ্যে গুলি করে হত্যা করা। মীর শওকত আলী যখন অল্প সময়ের জন্য সিজিএস ছিলেন, তখন তাঁর কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য পাওয়া গিয়েছিল।

পরের দিন, অর্থাৎ ৮ নভেম্বরে জিয়াউর রহমান আবার সেনাপ্রধানের পদাধিকারবলে সেনাসদরে এলেন। খালেদ মোশাররফের জায়গায় ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত আলী সিজিএস হিসেবে নিযুক্ত হলেন। সেদিন সকালেই শুনতে পেলাম চারজন অফিসারকে সিপাহিরা হত্যা করেছে।

তাঁদের মধ্যে হামিদা নামে এক লেডি ডাক্তার এবং ডেন্টাল সার্জন করিমকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত আক্রোশে হত্যা করা হয়। আরও দুজন অফিসার, যাঁরা বাংলাদেশ হকি ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন—ক্যাপ্টেন আনোয়ার ও লেফটেন্যান্ট মোস্তাফিজ—তাঁদেরও টিভি স্টেশনের কাছে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়।

সাধারণ সৈনিক, যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ৭ নভেম্বরের কথিত সিপাহি-জনতার বিপ্লবে যোগ দিয়েছিল, তাদেরও মোহভঙ্গ হতে শুরু করেছিল। ক্রমেই সাধারণ সৈনিকেরা বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সঙ্গে নিজেদের দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করল। ৭-৮ নভেম্বরে যারা ‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই' বলে স্লোগান দিয়েছিল, তারাই নেতৃত্বের অভাবে দিশাহারা হয়ে পড়তে শুরু করে।

উল্লেখ্য, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থায় যে কিলার গ্রুপ তাহের তৈরি করেছিলেন, তার মধ্যে বেশির ভাগই ছিল সেনাবাহিনীর বিভিন্ন সার্ভিস কোর এবং বিমানবাহিনীর সৈনিক। ঢাকায় ৪৬ ব্রিগেডের চারটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন ছিল। এর মধ্যে শেরেবাংলা নগরেরটি ছাড়াও আরও একটি নতুন ব্যাটালিয়ন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ৭-৮ নভেম্বরের তৎপরতায় যোগ দেয়নি।

এ অবস্থায় জিয়া অনুধাবন করতে শুরু করেন যে তাহের এ দফায় পরাজিত হয়েছেন। ক্রমেই ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের কমান্ডার, অফিসার এবং সৈনিকেরাসহ প্রায় সম্পূর্ণ সামরিক বাহিনী জিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে থাকে। সব মিলিয়ে দেশ তখন এক নাজুক পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল।

৮ নভেম্বর থেকে জিয়াউর রহমান কালক্ষেপণ না করে প্রায় ঝড়ের গতিতে সমগ্র সেনানিবাস ঘুরে ঘুরে সৈনিকদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। বিভিন্ন সমাবেশে তিনি সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলতে থাকলেন। সেদিনই বিকেলের দিকে তিনি চতুর্থ বেঙ্গলের লাইনের কাছে ঢাকা সেনানিবাসের সৈনিকদের ডেকে তাদের সঙ্গে কথা বললেন।

আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সেদিন ঢাকা সেনানিবাসে সাকল্যে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশজন মাত্র অফিসার উপস্থিত ছিলেন। তার মধ্যে ওই চল্লিশ-পঞ্চাশজন অফিসার ছাড়া সেনানিবাসে আর সবাই ছিল সশস্ত্র।

ট্যাঙ্কের সাথে দৌড়াচ্ছে ছেলেরা, দৈনিক বাংলা, ৮ নভেম্বর ১৯৭৫

জিয়াউর রহমান দৃঢ়কণ্ঠে অস্ত্র জমা দিয়ে সৈনিকদের নিজ নিজ ব্যারাকে ফিরে যেতে বললেন। তিনি আরও ঘোষণা করলেন, সৈনিকদের ন্যায্য দাবিদাওয়া তিনি মেনে নেবেন এবং অতিসত্বর এ সম্পর্কে বিচার-বিবেচনা করে যথাসময়ে তাদের জানাবেন। তিনি এ ঘোষণা সরকারের পক্ষ থেকেই দেন, যদিও তখন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে বলা হয়েছিল।

সভায় জিয়া যখন সৈনিকদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা আর অস্ত্র জমা দেওয়ার কথা বলছিলেন, তখন একজন সৈনিক অসাবধানতাবশত নিজেই নিজের রাইফেলের গুলিতে নিহত হন। জিয়ার ভাষণের পর সৈনিকেরা যার যার অস্ত্র জমা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিল।

সেদিন বিকেলের দিকে অস্ত্র জমা দেওয়া হলে কিছুসংখ্যক সৈনিক, যারা কর্নেল (অব.) তাহেরের অন্ধভক্ত ও তাঁর সৈনিক সংস্থার কট্টর অনুসারী ছিল, তারা জিয়ার বিরুদ্ধে উত্তেজনামূলক প্রচার চালাতে শুরু করে। ওই দিন সন্ধ্যার সময় সংস্থাটির কিছু সৈনিক অর্ডন্যান্স মেস থেকে নিরীহ তিনজন অফিসারকে টেনে বের করে এনে মেসের সামনেই তাঁদের হত্যা করে।

সেদিন ৮ নভেম্বর, রাত প্রায় ৯টার দিকে আমি ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে বসে আছি। এমন সময় ব্রিগেডের সিগন্যাল অপারেটর এসে খবর দিলেন, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সে রাতেও বেশ কিছু অফিসার নিধনের লিস্ট তৈরি করেছে। তিনি যা জানালেন, তার মূল কথা হলো, সৈনিকদের সব দাবি মানা না হলে এ সংগ্রাম চলতেই থাকবে।

তিনি আরও জানালেন যে অফিসার নিধনের সঙ্গে মাত্র গুটিকয় সৈনিকই জড়িত, বিশেষ করে ‘সৈনিক সংস্থা’কে সমর্থনকারী কিছু সিগন্যাল, ল্যান্সার আর সামরিক করণিক। তাদের মধ্যেই বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার তৎপরতা বিস্তৃত ছিল।

তাহেরের পরিকল্পনা যদি কার্যকর হতো, তাহলে সেদিন রাতে কিংবা পরের কয়েক দিনের মধ্যেই সেনাবাহিনীর ‘কমান্ড স্ট্রাকচার’ ভেঙে পড়ত এবং জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা হতো। তাহের সাধারণ সৈনিকদের দলে টানেন তাদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া আদায় করার কথা বলে। তাহের তাঁর সমর্থকদের কাছে সামরিক বাহিনীর অফিসারদের সামন্ততান্ত্রিক আচার-আচরণের উদাহরণ তুলে ধরতেন।

এ রকম অপপ্রচারের মাধ্যমে তাঁদের পরিকল্পনা অনুযায়ী সেনাবাহিনীর কাঠামো ভেঙে শেষ করার পর বেসামরিক আমলাতন্ত্রের ওপরও তাঁরা একই ধরনের হামলা চালাতেন বলে মনে হয়। তাতে দেশ এক চরম বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে পড়ত। বিপন্ন হতো দেশের সার্বভৌমত্ব আর স্বাধীনতা।

আসলে তাহের ছিলেন দারুণ আত্মবিশ্বাসী এবং সেই সঙ্গে অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী একজন মানুষ। জিয়াউর রহমান তাহেরের অভিলাষ বোঝার পরপরই তাঁর কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং সৈনিকদের নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্য দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে থাকেন। জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা আর ব্যক্তিত্ব, সাহস আর ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দু-এক দিনের মধ্যেই পুরো পরিস্থিতি তাঁর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

  • ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা। ২০০৭-১২ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন।

সূত্র: প্রথম আলো