|
| |
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

মৎস্য উদ্যোক্তা শুধু নিজের ভাগ্য বদলায় না, বদলায় আরও অনেকের

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম
৩৮৪ পঠিত
মৎস্য উদ্যোক্তা শুধু নিজের ভাগ্য বদলায় না, বদলায় আরও অনেকের
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
একজন বাবার কাছে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্নের চেয়ে বড় প্রেরণা খুব কমই আছে। পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করা, প্রিয়জনদের ভালো রাখা আর নিজের পরিশ্রমে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো, এই স্বপ্নগুলো নিয়েই প্রতিদিন লড়াই করেন অসংখ্য মানুষ। কিন্তু স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে কখনো কখনো প্রয়োজন হয় একটি সুযোগের, যা অনিশ...

একজন বাবার কাছে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্নের চেয়ে বড় প্রেরণা খুব কমই আছে। পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করা, প্রিয়জনদের ভালো রাখা আর নিজের পরিশ্রমে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো, এই স্বপ্নগুলো নিয়েই প্রতিদিন লড়াই করেন অসংখ্য মানুষ। কিন্তু স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে কখনো কখনো প্রয়োজন হয় একটি সুযোগের, যা অনিশ্চয়তার মধ্যেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়।

যশোরের আবদুস সালাম টগর ও চুয়াডাঙ্গার মো. মাসুদ রানার জীবনেও তেমন একটি সুযোগ এসেছিল। মাছের খাবারের ব্যবসা দিয়ে শুরু করা এই দুই উদ্যোক্তার লক্ষ্য ছিল নিজেদের সামর্থ্য বাড়ানো এবং পরিবারের জন্য ভালো ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা। আর্থিক সীমাবদ্ধতা তাদের পরিকল্পনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেও পদক্ষেপ-এর (বাংলাদেশের একটি অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এনজিও) আর্থিক সহায়তা তাদের উদ্যোগ সম্প্রসারণের সুযোগ করে দেয়। 

আবদুস সালাম টগরের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি ছোট মাছের খাবারের দোকান দিয়ে। ব্যবসা পরিচালনার সময় মাছচাষিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং এই খাতের সঙ্গে পরিচিতি তাকে মাছ চাষে আগ্রহী করে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন, মাছের খাবার বিক্রির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেও মাছ চাষের উদ্যোগ নিতে পারেন। কিন্তু নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি ছিল না তার হাতে। পদক্ষেপের আর্থিক সহায়তা পাওয়ার পর তিন বিঘা জমি লিজ নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেন তিনি।

নতুন উদ্যোগে বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন ছিল নিয়মিত পরিচর্যা, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার। অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে তার ব্যবসার পরিসর বেড়েছে। বর্তমানে ২০ বিঘা জমিতে নয়টি পুকুরে মাছ চাষ করছেন টগর। পাশাপাশি উৎপাদন করছেন মাছের পোনা। তার খামারে কাজ করছেন তিনজন কর্মী, আর মাসিক আয় প্রায় দুই লাখ টাকা।

যে উদ্যোগ একসময় সীমিত পুঁজির কারণে ছোট পরিসরে আবদ্ধ ছিল, সেটিই আজ তার পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই অগ্রগতি তাকে আরও বড় পরিকল্পনা করার সাহস দিয়েছে। ভবিষ্যতে বৃহত্তর পরিসরে মাছের খামার গড়ে তুলতে চান তিনি। 

চুয়াডাঙ্গার মোহা. মাসুদ রানার পথচলা কিছুটা ভিন্ন। প্রায় ছয় থেকে সাত বছর ধরে মাছের খাবারের ব্যবসা করার সুবাদে তিনি মাছচাষিদের প্রয়োজন ও এই খাতের নানা দিক কাছ থেকে দেখেছেন। তার নিজেরও পুকুর ছিল। কিন্তু বড় পরিসরে মাছ চাষ করতে প্রয়োজন ছিল আরও বেশি বিনিয়োগের। অভিজ্ঞতা ও আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও পুঁজির সীমাবদ্ধতা তার পরিকল্পনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

২০২২ সালে পদক্ষেপের আর্থিক সহায়তা মাসুদের জন্য নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি করে। নিজের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মাছ চাষের কার্যক্রম সম্প্রসারণে মনোযোগ দেন তিনি। বর্তমানে ১৬৩ বিঘা জমির পুকুরজুড়ে বিস্তৃত তার মাছ চাষের কার্যক্রম, যেখানে প্রতিদিন কাজ করেন ২৭ জন মানুষ।

ব্যবসার অগ্রগতির প্রভাব পড়েছে মাসুদের পারিবারিক জীবনেও। পরিবারের জন্য চার কক্ষের একটি নিজস্ব বাড়ি নির্মাণ করেছেন তিনি। এই অর্জন তার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের দৃশ্যমান ফল। পরিবারের জন্য একটি স্থিতিশীল জীবন গড়ে তোলার যে ইচ্ছা নিয়ে তিনি ব্যবসায় এগিয়েছিলেন, আজ সেই স্বপ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাস্তব হয়েছে।

টগর ও মাসুদের অভিজ্ঞতার মধ্যে মিল রয়েছে একটি জায়গায়। দুজনেরই ব্যবসা সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান ও সামনে এগিয়ে যাওয়ার আগ্রহ ছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাব তাদের উদ্যোগ সম্প্রসারণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর্থিক সহায়তা তাদের সেই সুযোগ দিয়েছে, আর নিজেদের শ্রম, অভিজ্ঞতা ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তারা সুযোগটিকে কাজে লাগিয়েছেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও মাছের গুরুত্ব তাদের ব্যক্তিগত জীবনের সাফল্যের চেয়ে অনেক বড়। মৎস্য অধিদপ্তরের বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদ পরিসংখ্যান বর্ষপঞ্জি ২০২৩-২৪ অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৪ অর্থবছরে দেশে মোট মাছ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫০.১৮ লাখ টন। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়, অর্থাৎ পুকুর ও অন্যান্য চাষযোগ্য জলাশয় থেকে উৎপাদিত মাছের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৯.৭৮ লাখ টন। একই অর্থবছরে মৎস্য খাত জাতীয় জিডিপির ২.৫৩ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপির ২২.২৬ শতাংশ অবদান রেখেছে। দেশের মোট প্রাণীজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশের জোগানও এসেছে মাছ থেকে। 

এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য মাছচাষি, পোনা উৎপাদনকারী, মাছের খাবার বিক্রেতা, পরিবহনকর্মী ও ব্যবসায়ীর শ্রম। একটি পুকুরে মাছ উৎপাদনের জন্য শুধু মাছচাষির উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসম্মত পোনা, উপযুক্ত খাবার, পানির গুণাগুণ বজায় রাখা, রোগ প্রতিরোধ, নিয়মিত পরিচর্যা এবং বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা। এই পুরো কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন পেশার মানুষের আয় ও জীবিকা।

মৎস্যখাতের বিস্তার কত মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত, তা বোঝা যায় কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান থেকেও। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। ফলে মাছ চাষে একটি উদ্যোগের সম্প্রসারণ শুধু একজন উদ্যোক্তার আয় বাড়ানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে কাজের সুযোগ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও সম্পর্ক রয়েছে।

মুক্ত জলাশয়ের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে ২য় এবং চাষের মাছ উৎপাদনে ৫ম। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মাছ ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক রপ্তানি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৫ অর্থবছরে হিমায়িত ও জীবিত মাছ রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৪৪১.৯ মিলিয়ন ইউএস ডলার। এর মধ্যে চিংড়ি রপ্তানি থেকে এসেছে ২৯৬.৮ মিলিয়ন ডলার এবং অন্যান্য মাছ ও মৎস্য জাতীয় পণ্য থেকে এসেছে ২৬.৯ মিলিয়ন ডলার। 

রপ্তানির এই আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে মৎস্য খাতের ভূমিকা তুলে ধরে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না। মাছের গুণগত মান, খাদ্য নিরাপত্তা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশসম্মত চাষপদ্ধতি, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সময়মতো পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশের মাছ চাষের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার আরেকটি দিক হলো উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৫ অর্থবছরে দেশে মোট মাছ উৎপাদন বেড়ে প্রায় ৫১.১১ লাখ টনে পৌঁছেছে, যা আগের অর্থবছরের ৫০.১৮ লাখ টনের চেয়ে বেশি। এই অগ্রগতি দেখায়, দেশের মৎস্য খাতে উৎপাদন সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। 

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এসব উন্নয়ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাছের খাবারের দাম বৃদ্ধি, রোগবালাই, পানির গুণগত পরিবর্তন, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং বাজারদরের ওঠানামা তাদের ব্যবসার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। প্রয়োজনীয় অর্থায়নের পাশাপাশি কারিগরি পরামর্শ, প্রশিক্ষণ, বাজারসংযোগ ও মানসম্মত উপকরণ পাওয়ার সুযোগ তাদের উদ্যোগকে আরও স্থিতিশীল করতে পারে।

এখানেই পদক্ষেপের মতো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহায়তার গুরুত্ব রয়েছে। টগর ও মাসুদের অভিজ্ঞতা দেখায়, একজন উদ্যোক্তার বিদ্যমান জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় পুঁজি যুক্ত হলে তিনি নিজের উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। 

মৎস্যখাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে এ ধরনের উদ্যোগকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলাশয়ের সঠিক ব্যবহার এবং নিরাপদ মাছ উৎপাদন নিশ্চিত করাও জরুরি। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি গুণগত মান বজায় রাখতে পারলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উভয় ক্ষেত্রেই সম্ভাবনা বাড়বে।

লেখক: যুগ্ম পরিচালক ও প্রধান, পদক্ষেপ মাইক্রোফাইন্যান্স
ই-মেইল: mostafa@padakhep.org

সূত্র: কালবেলা