|
| |
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

মানুষ কি মাংস খাওয়ার জন্যই তৈরি, নাকি নিরামিষেই সুস্থ থাকা সম্ভব

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:০০ এএম
২৯১ পঠিত
মানুষ কি মাংস খাওয়ার জন্যই তৈরি, নাকি নিরামিষেই সুস্থ থাকা সম্ভব
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
মানুষ কি প্রকৃতিগতভাবে নিরামিষাশী, নাকি মাংসাশী? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। বিজ্ঞান কী বলে, আর সুস্থ থাকতে আমাদের প্রতিদিনের খাবারের প্লেটে কী থাকা উচিত?

মানুষ কি প্রকৃতিগতভাবে নিরামিষাশী, নাকি মাংসাশী? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। বিজ্ঞান কী বলে, আর সুস্থ থাকতে আমাদের প্রতিদিনের খাবারের প্লেটে কী থাকা উচিত?

আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক হয়, তার মধ্যে একটি হলো মানুষ কি নিরামিষাশী, নাকি মাংসাশী? এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের খাদ্যাভ্যাস ও চিকিৎসাভিত্তিক জীবনযাপন নিয়ে আলোচনা। কেউ বলেন, প্রাণিজ আমিষ বা মাছ-মাংস খাওয়া উচিত নয়। আবার কেউ উৎসাহ দেন প্রচুর মাংস ও চর্বি খেতে। এসব মতামত সামনে এলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। কেউ অসুস্থ হলে তো কথাই নেই—একজন রোগীকে ঘিরে সবাই যেন চিকিৎসক হয়ে ওঠেন। আমাদের সামাজিক আচরণের এ প্রবণতা পরিচিত।

কিন্তু মানুষ আসলে কী ধরনের খাদ্য গ্রহণের উপযোগী? বিজ্ঞানের উত্তর স্পষ্ট: মানুষ সর্বভুক। অর্থাৎ মানুষের শরীর উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ—উভয় উৎসের খাবার থেকেই পুষ্টি গ্রহণ করতে সক্ষম। তবে সর্বভুক হওয়ার অর্থ এই নয় যে প্রচুর মাংস খেতেই হবে। বরং সঠিকভাবে পরিকল্পিত উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসও সুস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।

মানুষের শরীর কী বলে?

মানুষ ও অন্যান্য প্রাইমেটের বিবর্তনীয় ইতিহাস থেকে জানা যায়, মানুষের পূর্বপুরুষেরা উদ্ভিজ্জ খাবারের পাশাপাশি প্রাণিজ খাদ্যও গ্রহণ করতেন। মানুষের দাঁত ও চোয়াল বিভিন্ন ধরনের খাবার চিবানোর উপযোগী। একইভাবে মানুষের পরিপাকতন্ত্রও উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ—দুই ধরনের খাবার হজম করতে সক্ষম।

মানুষ আসলে সর্বভূক

লালারসে থাকা অ্যামাইলেজ এনজাইম শ্বেতসার ভাঙতে সাহায্য করে। অন্যদিকে পাকস্থলীর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ও বিভিন্ন এনজাইম প্রোটিন হজমের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। এসব বৈশিষ্ট্য থেকে বোঝা যায়, মানুষ কেবল নিরামিষ খাবারের ওপর নির্ভরশীল কোনো প্রাণী নয়। তবে শরীরের এই সক্ষমতা থেকে কোন খাদ্যাভ্যাস সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর, তা এককভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

প্রচলিত ধারণা বনাম বিজ্ঞান

মানুষ নিরামিষাশী, নাকি মাংসাশী—এ নিয়ে আলোচনায় বেশ কিছু দাবি প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু সেগুলোর সবই বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
• লালার অম্লত্ব: মাংসাশী প্রাণীর লালা সব সময় অম্লীয় আর তৃণভোজী প্রাণীর লালা ক্ষারীয়—এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম নেই।
• পাকস্থলীর অ্যাসিড: মানুষের পাকস্থলীর অ্যাসিড কম বলে মাছ-মাংস হজম হয় না—এ ধারণা ভুল। মানুষের পাকস্থলী প্রোটিন হজমের উপযোগী।
• ইউরিক অ্যাসিড: এটি শুধু মাংস খাওয়ার কারণে তৈরি হয় না। শরীরের নিজস্ব পিউরিন বিপাক থেকেও ইউরিক অ্যাসিড উৎপন্ন হয়।
• অন্ত্রের দৈর্ঘ্য: অন্ত্রের দৈর্ঘ্যের কোনো নির্দিষ্ট অনুপাত দিয়ে মানুষকে নিরামিষাশী বা মাংসাশী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা যায় না।
• ঘাম: ঘাম শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। এটি কোনো প্রাণীর খাদ্যশ্রেণি নির্ধারণের মাপকাঠি নয়।
অর্থাৎ শরীরের এক-দুটি বৈশিষ্ট্য দেখে খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। বরং সামগ্রিক পুষ্টি, খাদ্যের গুণমান এবং ব্যক্তির স্বাস্থ্য বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

উদ্ভিজ্জ খাবার কেন উপকারী?

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যকর উদ্ভিজ্জ খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘমেয়াদি কিছু রোগের ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০২৩ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে স্বাস্থ্যকর উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ এবং সব কারণে মৃত্যুর তুলনামূলক কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণাটিতে ঝুঁকি কমার হার যথাক্রমে প্রায় ১৮, ১০ ও ১৬ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এগুলো পর্যবেক্ষণভিত্তিক সম্পর্কের ফল; শুধু উদ্ভিদভিত্তিক খাবার খাওয়ার কারণেই এই পরিবর্তন ঘটে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে শাকসবজি, ফল, ডাল, বাদাম ও পূর্ণশস্য খাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়।

এর অন্যতম কারণ খাদ্য-আঁশ। ডাল, শাকসবজি, ফল ও পূর্ণশস্যে থাকা আঁশ অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে, পেট ভরা রাখে এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু ধরনের দ্রবণীয় আঁশ এলডিএল বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমাতেও সাহায্য করে। অন্ত্রের উপকারী অণুজীব আঁশ গাজন করে স্বল্প-শৃঙ্খল ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে শাকসবজি ও ফলে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।

মাংস বাদ দিলেই কি স্বাস্থ্য ভালো হবে?

এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। শুধু মাংস বাদ দিলেই খাদ্যাভ্যাস স্বাস্থ্যকর হয়ে যায় না। কী দিয়ে মাংসের বিকল্প তৈরি করা হচ্ছে, সেটিও বিবেচ্য।
লাল মাংসের পরিবর্তে ডাল, ছোলা বা অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার খেলে খাদ্য-আঁশ বাড়তে পারে এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাটের গ্রহণ কমতে পারে। কিন্তু মাছ-মাংসের বদলে অতিরিক্ত মিষ্টি, পরিশোধিত শর্করা কিংবা ভাজাপোড়া খাবার খেলে একই ধরনের উপকার পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

শুধু মাংস বাদ দিলেই খাদ্যাভ্যাস স্বাস্থ্যকর হয়ে যায় না

সম্পূর্ণ ভেগান খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে কিছু পুষ্টি উপাদানের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে ভিটামিন বি১২, আয়রন, ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড। ভিটামিন বি১২ নির্ভরযোগ্যভাবে পেতে সাধারণত ফোর্টিফায়েড খাবার বা সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের নিরামিষ বা ভেগান খাদ্যাভ্যাস অনুসরণকারীদের পুষ্টির পরিকল্পনা সচেতনভাবে করা উচিত।

বাংলাদেশের খাবারেই আছে স্বাস্থ্যকর বিকল্প

স্বাস্থ্যকর উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের জন্য দামি বা বিদেশি উপকরণের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের পরিচিত অনেক খাবারই এ ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রাখতে পারে।

মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা ও রাজমা প্রোটিন ও খাদ্য-আঁশের ভালো উৎস। লালশাক, পালংশাক, পুঁইশাক, লাউ, কুমড়া এবং অন্যান্য মৌসুমি সবজি খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনে। পেয়ার, পেঁপে, কলা ও আমের মতো ফলও নিয়মিত খাওয়া যেতে পারে। লাল চাল, কম পালিশ করা চাল এবং আটার রুটি থেকে তুলনামূলক বেশি খাদ্য-আঁশ পাওয়া সম্ভব।

এ ছাড়া স্বাস্থ্যকর শস্য ও স্থানীয় কৃষিপণ্য নিয়ে কাজ করছে এমন উদ্যোগগুলোর পণ্যও খাদ্যতালিকায় যুক্ত করা যেতে পারে। তবে কোনো খাবারকে শুধু প্রাকৃতিক বা দেশি বলেই পুষ্টিকর ধরে নেওয়া উচিত নয়; খাবারের ধরন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিদিনের খাবারের প্লেট কেমন হবে?

সবার জন্য একই খাদ্যতালিকা উপযুক্ত নয়। বয়স, শারীরিক গঠন, কাজের ধরন, স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী খাবারের পরিকল্পনা বদলাতে পারে। তবে একটি সহজ ব্যবহারিক নির্দেশনা হলো—প্লেটের অর্ধেক শাকসবজি ও ফল, এক-চতুর্থাংশ শস্য এবং বাকি এক-চতুর্থাংশ ডাল।

সূত্র: প্রথম আলো