সন্দেহ থেকে পাপের পথে
গণমাধ্যম ডেক্স
প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি, ১৯৭০, ০৬:০০ এএম
সন্দেহ করা ভালো মানুষের কাজ নয়। কিছু মানুষ অন্যকে অহেতুক সন্দেহ করে। কোনো প্রমাণ কিংবা কারণ ছাড়াই শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে অন্যকে ঘৃণা করতে শুরু করে। কখনো কখনো তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে যায়। এমনকি তার ক্ষতিও করে ফেলে। বাস্তবে সন্দেহ পাপের দিকে ধাবিত করে। দেখা যায়, ওই লোক এম...
সন্দেহ করা ভালো মানুষের কাজ নয়। কিছু মানুষ অন্যকে অহেতুক সন্দেহ করে। কোনো প্রমাণ কিংবা কারণ ছাড়াই শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে অন্যকে ঘৃণা করতে শুরু করে। কখনো কখনো তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে যায়। এমনকি তার ক্ষতিও করে ফেলে। বাস্তবে সন্দেহ পাপের দিকে ধাবিত করে। দেখা যায়, ওই লোক এমন কোনো বিষয়ে জানেই না। এ জন্য হয়তো রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মন্দ ধারণা পোষণ করা থেকে তোমরা দূরে থাকো। কেননা মন্দ ধারণা হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৯৮৮)। বলার অপেক্ষা রাখে না, মানুষের প্রতি অন্যায়ভাবে সন্দেহ করা ও নিজে এমন কাজ করা, যাতে অন্যরা সন্দেহ করে-সবই পাপের দিকে ধাবিত করে। আর পাপ ডেকে আনে বিবিধ অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা।
চারদিকে আজ পাপের জয়জয়কার যেন! এমন নাজুক ও অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে ইমান ও আমলের ওপর অবিচল থাকা এবং নিজের জীবনকে স্বচ্ছ ও নির্মল রাখা খুবই দুরূহ ব্যাপার। যে কোনো সময় যে কোনো ফ্যাসাদে আটকে যেতে পারে যে কেউ। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত সংশয় ও সন্দেহের সব জায়গা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা এবং কথাবার্তা, ওঠাবসা, চলাফেরা সব ক্ষেত্রে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে, যেন কোনো কিছুই তার জীবনকে অন্যের কাছে সন্দেহ পূর্ণ করে না তোলে। এতে তার দ্বীন-ধর্ম যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি রক্ষা পাবে ইজ্জত-সম্মানও। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সন্দেহপূর্ণ বিষয়কে পরিহার করে চলে, বস্তুত সে তার দ্বীন ও সম্ভ্রমকেই বাঁচিয়ে রাখে’ (মুসলিম: ১৫৯৯)। আর নিজের সম্মান রক্ষা করা এবং লাঞ্ছনা ও অপমানের মুখোমুখি না করা প্রত্যেক মুসলমানের ইমানি দায়িত্ব। রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিজেকে অপদস্থ করা কোনো মুমিনের জন্য বৈধ নয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০১৬)।
প্রিয় নবী (সা.) উম্মতকে এ সতর্কতারই শিক্ষা দিয়েছেন তার অনিন্দ্য-সুন্দর জীবন চরিত্রের মাধ্যমে। আলি ইবনে হোসাইনের সূত্রে বর্ণিত, রমজানের শেষ দশকে রাসুল (সা.) মসজিদে ইতিকাফরত ছিলেন। হজরত সাফিয়া (রা.) নবীজির (সা.) সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলেন। কিছুক্ষণ সেখানে কথাবার্তা বললেন। অতঃপর ফিরে যাওয়ার জন্য উঠলে রাসুলও (সা.) তার সঙ্গে উঠলেন তাকে বিদায় দেওয়ার জন্য। হজরত সাফিয়া যখন উম্মে সালামার কামরার দরজার কাছে মসজিদের দরজায় পৌঁছলেন তখন পাশ দিয়ে অতিক্রমকারী দুজন সাহাবি রাসুলকে (সা.) সালাম দিলেন। রাসুল (সা.) বললেন, দাঁড়াও দাঁড়াও। এ হচ্ছে সাফিয়া বিনতে হুয়াই। তার এ ধরনের কথায় আশ্চর্যান্বিত হয়ে তারা বললেন, সুবহানাল্লাহ! তখন নবীজি (সা.) বললেন, শোনো, শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরায় চলাচল করে। তাই আমি আশঙ্কা করেছি, শয়তান আবার তোমাদের মনে কোনো সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয় কি না! (সহিহ বুখারি: ২০৩৫)
সন্দেহপূর্ণ আচরণ-উচ্চারণ অন্যের পাপের কারণ হয়। এলোমেলো কথাবার্তায়, অমার্জিত চলাফেরায় এবং খারাপদের সঙ্গে ওঠাবসায় অন্যের মনে সৃষ্টি হয় নানা ভুল ও অন্যায় ধারণা এবং পরস্পরের মধ্যে শুরু হয় অবৈধ নিন্দা-সমালোচনা, যা গুনাহের কাজ। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা বহু ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা কিছু কিছু ধারণা গুনাহ। পরস্পরের দোষ তালাশ করো না, একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি এটা পছন্দ করে যে, সে তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করবে? বস্তুত তোমরা তা অপছন্দ করো। নিঃসন্দেহে আল্লাহতায়ালাই তওবা কবুলকারী ও পরম করুণাময়’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)। বস্তুত এভাবে সন্দেহপূর্ণ কাজকর্মের মাধ্যমে আমরা অন্যকে পাপ ও পাপাচারে সাহায্য করি। অথচ আমাদের উচিত পাপ ও পাপাচারের পরিবর্তে পুণ্য ও সদাচারে সাহায্য করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা পরস্পরকে পুণ্য ও খোদাভীতির কাজে সাহায্য করো, পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সাহায্য করো না।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ২)।
একজনের কারণে অন্যকে মন্দ বলা উচিত নয়। সন্দেহজনক ক্রিয়াকলাপ অনেক সময় অন্যের সমালোচনার কারণ হতে পারে। আপন বংশ, গোত্র, গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের ওপরও কালিমা পড়তে পারে। একজনের কারণে আরেকজনকে মন্দ বলা হবে, এটা ইসলাম পছন্দ করে না। এ জন্যই আল্লাহতায়ালা কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর পরিবর্তে তারা যেসব উপাস্যের উপাসনা করে তোমরা তাদের গালমন্দ করো না, অন্যথায় তারা না জেনে আল্লাহতায়ালার প্রতিও গালমন্দ করবে’ (সুরা আনাম, আয়াত: ১০৮)। একবার রাসুল (সা.) বললেন, ‘পিতা-মাতাকে গালি দেওয়া কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। সাহাবায়ে কেরাম আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! কেউ কি আবার তার পিতা-মাতাকে গালি দিতে পারে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির পিতা-মাতাকে গালি দেয়, ফলে সেও অপর ব্যক্তির পিতা-মাতাকে গালি দেয়’ (মুসলিম: ৯০)। মহান আল্লাহ সবাইকে সন্দেহপূর্ণ বিষয় থেকে মুক্ত থাকার তওফিক দিন।
লেখক: ইমাম ও খতিব
সূত্র: কালবেলা