ডাকবাংলোয় দুই মেয়েকে হত্যার পর মায়ের আত্মহত্যার দুই কারণ উঠে এল পুলিশের তদন্তে
গণমাধ্যম ডেক্স
বরগুনা জেলা পরিষদ ডাকবাংলো থেকে মা ও দুই মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে পুলিশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংসারে অনটন এবং চার লাখ টাকার ঋণ ও কিস্তি পরিশোধের চাপে দুই মেয়েকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন মা।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটার দিকে জেলা পুলিশ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মুকিত হাসান খান তদন্ত প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
চলতি বছরের ৩ মার্চ বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর তৃতীয় তলার দুটি কক্ষ থেকে ইতি রানী (৩৪) এবং তাঁর দুই মেয়ে আরাধ্যা বিশ্বাস (১১) ও অনুরাধা বিশ্বাসের (৩) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ইতি ডাকবাংলোর অস্থায়ী পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিলেন। তিনি পৌরসভার কালীবাড়ি সড়কের বাসিন্দা দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসের স্ত্রী।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ইতি রানীর মৃত্যুর বিষয়ে বলা হয়েছে, তাঁর মৃত্যু হয়েছে রাসায়নিকের বিষক্রিয়ায় এবং তা আত্মহত্যাজনিত। দুই মেয়ে আরাধ্যা ও অনুরাধার মৃত্যুর কারণ হিসেবে একই ধরনের রাসায়নিকের বিষক্রিয়ার পাশাপাশি শ্বাসরোধে হত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মৃত্যু হত্যাজনিত বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা। তবে কারও ক্ষেত্রে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি।
ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তা
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস পেশায় সুপারি ব্যবসায়ী ও দরজি। তাঁর ছোট দরজি দোকান এবং সীমিত পরিসরের সুপারি ব্যবসা থেকে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন ছিল। তাঁদের পুরোনো বসতভিটা প্রায় ৩০ বছর আগে নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। এর পর থেকে তাঁরা সরকারি জায়গায় বসবাস করছিলেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ইতি রানী পাঁচটি বেসরকারি ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা (এনজিও) থেকে মোট ২ লাখ ২৭ হাজার ৭২৩ টাকা আর দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস একটি এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নেন। এ ছাড়া অনিল রায় ও বাবুল রায় নামের দুই ব্যক্তির কাছ থেকেও এক লাখ টাকা ধার করেন। সব মিলিয়ে তাঁদের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ লাখ ৭ হাজার ৭২৩ টাকা। ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে ইতি রানী দুশ্চিন্তায় ভুগতেন।
পুলিশের তদন্তে বলা হয়, সংসারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ও স্বামীকে সহযোগিতার জন্য আত্মহত্যার প্রায় দুই মাস আগে মাসে তিন হাজার টাকা বেতনে বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে যোগ দেন ইতি রানী। পারিবারিক আর্থিক সংকট ও ঋণের চাপে হতাশা থেকে সন্তানদের হত্যার পর তিনি আত্মহত্যা করেন।
সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেছে
জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর ক্লোজ সার্কিট (সিসিটিভি) ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ দেখেছে, ঘটনার দিন সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে ইতি রানী দুই মেয়েকে নিয়ে সেখানে প্রবেশ করেন। পরে তাঁরা তৃতীয় তলায় যান। সকাল ১০টা ৫০ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডে বড় মেয়ে আরাধ্যা ৩ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করে। এর কিছুক্ষণ পর ইতি রানী ছোট মেয়ে অনুরাধাকে ৪ নম্বর কক্ষে রেখে ৩ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করেন। বেলা ১১টা ১৩ মিনিট ২৩ সেকেন্ডের সময় ইতি রানী ৩ নম্বর কক্ষ থেকে বেরিয়ে ১১টা ১৩ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে ৪ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করেন। এরপর তাঁদের কাউকেই জীবিত অবস্থায় কক্ষ থেকে বের হতে দেখা যায়নি।
পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতি রানী দুই মেয়েকে কোমল পানীয় অথবা খাবার পানির সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে পান করানোর পর শ্বাসরোধে হত্যা করে নিজেও চেতনানাশক ওষুধ সেবন করে আত্মহত্যা করেছেন।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান
ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘ময়নাতদন্তের রিপোর্টের বিষয় পুলিশের পক্ষ থেকে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে কী লেখা এসেছে, তা–ও জানি না। ঋণের কারণে আমার স্ত্রী দুই সন্তানকে মেরে ফেলবে, তা হতে পারে না। আমি এই ময়নাতদন্ত রিপোর্ট মানি না। এটা প্রত্যাখ্যান করলাম। আমার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।’
বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মুকিত হাসান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের তদন্ত কর্মকর্তা যা পেয়েছেন, তা আমরা জানিয়েছি। যেহেতু আমরা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেয়েছি, এখন আমরা পুলিশ রিপোর্ট দাখিল করব।’
মামলার বাদীর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে মুকিত হাসান খান বলেন, ‘ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তো আমরা দিইনি। এটা মেডিক্যাল থেকে দেওয়া হয়েছে।’
সূত্র: প্রথম আলো