|
| |
শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

নিরাপদ মাতৃত্ব: রক্তক্ষরণ মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত আমাদের হাসপাতাল?

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি, ১৯৭০, ০৬:০০ এএম
৩৬৩ পঠিত
নিরাপদ মাতৃত্ব: রক্তক্ষরণ মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত আমাদের হাসপাতাল?
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
প্রসবের জন্য হাসপাতালে পৌঁছানো মায়ের নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর পরও যদি প্রয়োজনীয় ওষুধ, দক্ষ জনবল, রক্ত কিংবা জরুরি চিকিৎসা সময়মতো না পাওয়া যায়, তার জীবন বিপন্ন হতে পারে। তাই নিরাপদ মাতৃত্বের প্রশ্নে শুধু কতজন নারী হাসপাতালে প্রসব করছেন, তা জানলেই চলবে না। জানতে হবে,...

প্রসবের জন্য হাসপাতালে পৌঁছানো মায়ের নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর পরও যদি প্রয়োজনীয় ওষুধ, দক্ষ জনবল, রক্ত কিংবা জরুরি চিকিৎসা সময়মতো না পাওয়া যায়, তার জীবন বিপন্ন হতে পারে। তাই নিরাপদ মাতৃত্বের প্রশ্নে শুধু কতজন নারী হাসপাতালে প্রসব করছেন, তা জানলেই চলবে না। জানতে হবে, প্রতিটি হাসপাতাল প্রসবকালীন জটিলতা মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত।

প্রসব-পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা পিপিএইচ দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এটি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিরাপদ মাতৃত্বের একটি অপরিহার্য অংশ।

প্রস্তুতি শুরু হবে হাসপাতালের নেতৃত্ব থেকে: হাসপাতালের পরিচালক, তত্ত্বাবধায়ক ও বিভাগীয় প্রধানকে মাতৃনিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পিপিএইচ মোকাবিলায় একটি দায়িত্বপ্রাপ্ত দল থাকবে; কে প্রস্তুতি যাচাই করবেন, কে ঘাটতি সংশোধন করবেন এবং কে অগ্রগতি দেখবেন, তা নির্ধারিত হবে। নিয়মিত সমন্বয় সভায় শুধু সমস্যা আলোচনা নয়, সমাধানের দায়িত্ব ও সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে।

প্রসবকক্ষে প্রয়োজন প্রস্তুত মানুষ ও উপকরণ: প্রতিটি পালায় দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক, মিডওয়াইফ ও নার্সকে জানতে হবে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে কাকে ডাকবেন এবং কে কী করবেন। রক্তক্ষরণ প্রতিরোধ, পরিমাপ, মায়ের অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

চিকিৎসা দলের দায়িত্ব হবে সমন্বিত সেবা: প্রসূতিবিদ চিকিৎসার নেতৃত্ব দেবেন; মিডওয়াইফ ও নার্স নিবিড় পর্যবেক্ষণ, দ্রুত সতর্কতা এবং চিকিৎসা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক, পরীক্ষাগার ও রক্তসেবা দল যুক্ত হবে। লিখিত নির্দেশনা সহজে দৃশ্যমান থাকতে হবে।

ওষুধ, রক্ত ও সরঞ্জামের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করতে হবে: ফার্মেসি, ভান্ডার, ক্রয় বিভাগ ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনীয় জরায়ু সংকোচনকারী ওষুধ, (অক্সিটোসিন, আরগুমেট্রিন, কার্বেটোসিন ও মিজোপ্রস্টল), ট্রানেক্সামিক অ্যাসিড, স্যালাইন এবং অন্যান্য জরুরি উপকরণের মজুত ও মেয়াদ নিয়মিত দেখতে হবে। যেসব ওষুধের বিশেষ সংরক্ষণ প্রয়োজন, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। রক্তের প্রয়োজন হলে পরীক্ষা, সংগ্রহ ও সরবরাহের পথ আগেই নির্ধারিত থাকবে। যন্ত্রপাতি কেনার পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণও জরুরি।

উপজেলা ও প্রাথমিক পর্যায়ে দ্রুত ব্যবস্থা ও কার্যকর রেফারেল: সব কেন্দ্রে একই ধরনের সেবা থাকা সম্ভব নয়। তবে প্রতিটি প্রসবসেবা কেন্দ্রের নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী রক্তক্ষরণ শনাক্ত, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং নিরাপদ রেফারেলের প্রস্তুতি থাকতে হবে। রোগীকে রেফারেলের জন্য কোথায় পাঠানো হবে, সেখানে প্রয়োজনীয় সেবা আছে কি না এবং যোগাযোগের নম্বর কী—এসব আগেই জানা চাই। রেফারেলের সময় দেওয়া চিকিৎসা ও মায়ের অবস্থার তথ্য লিখিতভাবে পাঠাতে হবে। পথে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থাও করতে হবে। রেফারেলের আগে ও প্রাথমিক সেবা চালু রাখতে হবে।

জেলা ও উচ্চতর হাসপাতাল হবে নির্ভরযোগ্য সহায়তার কেন্দ্র: জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি অস্ত্রোপচার, অ্যানেসথেসিয়া, রক্তসঞ্চালন এবং গুরুতর অসুস্থ মায়ের পরিচর্যার সক্ষমতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। উপজেলা পর্যায়েও এই ব্যবস্থাগুলি থাকা প্রয়োজন।

জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োজন অর্থায়ন ও জবাবদিহি: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের দায়িত্ব হলো মানসম্মত নির্দেশনা, প্রয়োজনীয় জনবল, প্রশিক্ষণ, সরবরাহ ও অর্থায়ন নিশ্চিত করা। দুর্গম এলাকার পরিবহন এবং রক্তসেবার সমস্যায় বিশেষ নজর দিতে হবে। পেশাজীবী সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে সহায়তা করতে পারেন। স্থানীয় প্রশাসন ও কমিউনিটিও জরুরি পরিবহন ও যোগাযোগে সহযোগী হতে পারে।

পরিবার ও জনগণের করণীয়: মেয়েদের এবং গর্ভবতী মহিলাদের শিক্ষা, পুষ্টি, ক্ষমতায়ন প্রয়োজন, পরিবার প্রসবের ও জরুরি অবস্থা মোকাবিলা, পরিবহন, রক্ত, টাকাপয়সা, হাসপাতালের দূরত্ব সম্বন্ধে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। জনগণ ও স্থানীয় সরকার এ বিষয়ে এবং পরিবহন, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে সহযোগিতা করবেন।

প্রস্তুতির প্রমাণ থাকতে হবে কাজে: প্রতি মাসে কয়েকটি বিষয় দেখা যেতে পারে: প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি ছিল কি না, রক্তক্ষরণ পরিমাপ হয়েছে কি না, জরুরি চিকিৎসা ও রেফারেলে বিলম্ব হয়েছে কি না এবং মহড়ায় পাওয়া সমস্যা সংশোধিত হয়েছে কি না। প্রতিটি মাতৃমৃত্যু ও গুরুতর জটিলতা থেকে দোষারোপ ছাড়া শিখতে হবে। নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য আমাদের অঙ্গীকার হোক—প্রতিটি স্তরে নির্দিষ্ট দায়িত্ব, প্রতিটি হাসপাতালে কার্যকর প্রস্তুতি এবং প্রতিটি মায়ের জন্য সময়মতো সেবা। সহায়তামূলক তত্ত্বাবধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রত্যেকের যথাযথ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে এবং আর্থিক অবস্থা ও জনবলের সংখ্যা ও মান উন্নয়নের মাধ্যমে মানসম্মত প্রকৃত সেবাদান দ্রুত উন্নত করা সম্ভব।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, নারী ও শিশু ইনস্টিটিউট, ঢাকা। প্রাক্তন সভাপতি-অবস্ট্রেটিক্যাল অ্যান্ড গাইনিকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) ও সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব অবস্ট্রেটিকস অ্যান্ড গাইনিকোলজি।

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স