|
| |
শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

সোনালি সংগ্রামী জীবনের গল্প

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:০০ এএম
৩৯৪ পঠিত
সোনালি সংগ্রামী জীবনের গল্প
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:

জ্ঞানী, বিনয়ী অথচ প্রবলভাবে দৃঢ়চেতা মাহফুজ আনামকে খুব সম্ভবত নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। উপমহাদেশের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও লেখক আবুল মনসুর আহমদের সন্তান মাহফুজ আনাম অনেক আগেই নিজেকে বাংলাদেশের একজন সুনাগরিক ও সংবেদনশীল সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংগ্রাম ও ভয়ডরহীন সাংবাদিকতায় খ্যাতি অর্জন করেছেন দেশে-বিদেশে। পেশাদার ও নির্ভীক সাংবাদিকতার মাধ্যমে ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার–কে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। প্রজ্ঞাবান এই সাংবাদিককে পরিচয় করিয়ে দিতে দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘অধ্যাপনায় মাহফুজকে খুবই মানাত, কিন্তু আরও বেশি মানিয়েছে সাংবাদিকতায়। কর্মজীবনের শুরুতেই সে পথপ্রদর্শক হিসেবে পেয়েছিল এস এম আলীকে।…আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে শুরু করে, পরবর্তী সময়ে ঢাকায় এসে এস এম আলীর সঙ্গেই ছিল মাহফুজ আনাম। এস এম আলীর মৃত্যুর পরে দ্য ডেইলি স্টার-এর জন্য তৈরি শূন্যতা পূরণ করার মতো সবচেয়ে যোগ্য লোক ছিল তরুণ মাহফুজ আনাম। ৩০ বছর ধরে সে তার যোগ্যতার প্রমাণ রেখে চলেছে। তার সম্পাদনায় ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোর মধ্যে দ্য ডেইলি স্টার যে সর্বশ্রেষ্ঠ, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। শুধু তা-ই নয়, ওই পত্রিকা এখন আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত ও সম্মানিত।’ (মুখবন্ধ, সময় ও দুঃসময়ের কথা: মাহফুজ আনামের কথা ও কথোপকথন)

সময় ও দুঃসময়ের কথা সাংবাদিক মাহফুজ আনামের জীবন–আলেখ্য। গ্রন্থটিতে যেমন আছে তরুণ মাহফুজ আনামের সোনালি সমেয়র প্রতিচ্ছবি, তেমনি উঠে এসেছে বস্তুনিষ্ঠ ও আপসহীন সাংবাদিকতায় নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের এক আখ্যান। এ ছাড়া ১৯৭৩ সালে দ্য বাংলাদেশ অবজারভার–এ মাত্র ৩০০ টাকা বেতনে সাংবাদিকতা শুরু করা মাহফুজ আনাম কীভাবে সুবিদিত ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রাণভোমরা হয়ে উঠলেন, সেই রোমাঞ্চকর গল্প উঠে এসেছে ৬টি অধ্যায়ে বিভক্ত এই গ্রন্থে। এতে পাঁচটি পর্বে সাংবাদিক মাহফুজ আনামের কথা থেকে ৩৬টি লেখা স্থান পেয়েছে। অধ্যায়গুলো হলো আত্মজৈবনিক, সাংবাদিকতা ও বাক্স্বাধীনতা, জীবন ও জগৎ-ভাবনা, গণতন্ত্র ও বিবিধ, ভাষণ।

আত্মজৈবনিক অংশে উঠে এসেছে তরুণ মাহফুজ আনামের প্রথম জীবনের গল্প। যেখানে জাতীয় রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদের ছেলে মাহফুজ আনাম রাজনীতি নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, ‘আমার জীবনে পিতা-মাতা, পরিবারের পর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছাত্র ইউনিয়নের। আমার দেশপ্রেমের পূর্ণাঙ্গতা দিয়েছে সংগঠনটি।’ (পৃষ্ঠা: ৫) এ ছাড়া তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন তরুণ ছাত্রনেতা হিসেবে পাকিস্তান আমলের সেই উত্তাল দিনগুলোই তাঁর জীবনের গতিপথ তৈরি করে দিয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, সমাজচেতনা—সব মিলিয়ে একটা সোনালি সময় পার করেছি।’ (পৃষ্ঠা:৬)

সময় ও দুঃসময়ের কথা সাংবাদিক মাহফুজ আনামের জীবন–আলেখ্য। গ্রন্থটিতে যেমন আছে তরুণ মাহফুজ আনামের সোনালি সমেয়র প্রতিচ্ছবি, তেমনি উঠে এসেছে বস্তুনিষ্ঠ ও আপসহীন সাংবাদিকতায় নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের এক আখ্যান। এ ছাড়া ১৯৭৩ সালে দ্য বাংলাদেশ অবজারভার–এ মাত্র ৩০০ টাকা বেতনে সাংবাদিকতা শুরু করা মাহফুজ আনাম কীভাবে সুবিদিত ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রাণভোমরা হয়ে উঠলেন, সেই রোমাঞ্চকর গল্প উঠে এসেছে ৬টি অধ্যায়ে বিভক্ত এই গ্রন্থে। এতে পাঁচটি পর্বে সাংবাদিক মাহফুজ আনামের কথা থেকে ৩৬টি লেখা স্থান পেয়েছে। অধ্যায়গুলো হলো আত্মজৈবনিক, সাংবাদিকতা ও বাক্স্বাধীনতা, জীবন ও জগৎ-ভাবনা, গণতন্ত্র ও বিবিধ, ভাষণ।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মাহফুজ আনাম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। যুদ্ধদিনে কমিশন পাওয়া অফিসার্সদের দ্বিতীয় ব্যাচের সদস্য ছিলেন। যদিও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেনাবাহিনী নয়; যোগ দিয়েছেন সাংবাদিকতায়, এরপর আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউনেসকোয়। এরপর আসে দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার প্রসঙ্গ। বিদেশে নিরাপদ চাকরি ফেলে বরেণ্য সাংবাদিক এস এম আলীর সঙ্গে দ্য ডেইলি স্টার প্রতিষ্ঠা ও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো মাহফুজ আনামের জীবনের এক সাফল্যজনক অধ্যায়। বলা যায়, সংগ্রামী অধ্যায়। উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৯১ সালের ১৪ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করেছিল দ্য ডেইলি স্টার। এরপর নানান চড়াই–উতরাই, প্রতিবন্ধকতা, প্রতিযোগিতা—এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। গ্রন্থটির সাংবাদিকতা ও বাক্স্বাধীনতা অংশে স্থান পাওয়া ৯টি লেখা শুধু মাহফুজ আনামের জীবনের অংশ নয়, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসের অনন্য দলিল।

গ্রন্থটির চতুর্থ অধ্যায়ে মাহফুজ আনামের ১০টি ভাষণ স্থান পেয়েছে। অত্যন্ত সুলিখিত ও সুচিন্তিত এই ভাষণগুলোর বেশির ভাগই সাংবাদিকতাকেন্দ্রিক। বাংলাদেশে যাঁরা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও বাক্স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের জন্য এই ভাষণগুলো অবশ্যপাঠ্য। বিশেষ করে ‘সাংবাদিকরা কেবল সাংবাদিকতাকে বাঁচাতে পারেন’—শিরোনামের লেখাটি বাংলাদেশে সাংবাদিকতার টিকে থাকার ক্ষেত্রে এক বিশেষ সংযোজন। আমার মনে হয়, ‘সাংবাদিকরা কেবল সাংবাদিকতাকে বাঁচাতে পারেন’—এই শিরোনামই বাংলাদেশের সাংবাদিকতা নিয়ে একটি অমোঘ বার্তা দেয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান একটি বিশেষ অধ্যায়। পরিণত বয়সে অত্যন্ত তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে এই অভ্যুত্থান পর্যবেক্ষণ করেছেন সাংবাদিক মাহফুজ আনাম। এ বিষয়ে পাঁচটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আনামের বিশ্লেষণ ও প্রত্যাশা যেন বাংলাদেশের প্রতিটি সংবেদনশীল নাগরিকের আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি। খুব সম্ভবত মাহফুজ আনামই বাংলাদেশের একমাত্র সাংবাদিক, যিনি অনেক কাছ থেকে প্রত্যক্ষভাবে ১৯৬৯, ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান দেখেছেন। এ ছাড়া এই সাক্ষাৎকারগুলোতে অভ্যুত্থান–পরবর্তী বাংলাদেশে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ও বাংলাদেশ সম্পর্কে মিথ্যা, গুজব, অপপ্রচার ও অপতথ্যের ভয়ংকর বিস্তার নিয়েও বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন মাহফুজ আনাম।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান একটি বিশেষ অধ্যায়। পরিণত বয়সে অত্যন্ত তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে এই অভ্যুত্থান পর্যবেক্ষণ করেছেন সাংবাদিক মাহফুজ আনাম। এ বিষয়ে পাঁচটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আনামের বিশ্লেষণ ও প্রত্যাশা যেন বাংলাদেশের প্রতিটি সংবেদনশীল নাগরিকের আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি। খুব সম্ভবত মাহফুজ আনামই বাংলাদেশের একমাত্র সাংবাদিক, যিনি অনেক কাছ থেকে প্রত্যক্ষভাবে ১৯৬৯, ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান দেখেছেন। এ ছাড়া এই সাক্ষাৎকারগুলোতে অভ্যুত্থান–পরবর্তী বাংলাদেশে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ও বাংলাদেশ সম্পর্কে মিথ্যা, গুজব, অপপ্রচার ও অপতথ্যের ভয়ংকর বিস্তার নিয়েও বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন মাহফুজ আনাম। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘কিছু ইসলামিক ঘটনা দেখে, দয়া করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন না যে আমরা একটি মৌলবাদী দেশে পরিণত হচ্ছি। এটি একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং এখানে খুব নিবেদিতপ্রাণ মুসলমান রয়েছে। যারা ধর্মে বিশ্বাস করে, তারা দিনে পাঁচবার মসজিদে যায়। এটি দেখে তাদের পুরো দৃষ্টিভঙ্গিকে সংজ্ঞায়িত করা উচিত নয়। এর অর্থ এই নয় যে তারা একটি চরমপন্থী গোষ্ঠী বা অন্য কিছুর অংশ।’ (পৃষ্ঠা:২১৭)

মাহফুজ আনামের সঙ্গে যাঁদের পরিচয় আছে, তাঁরা জানেন সাংবাদিক মাহফুজ আনাম একজন প্রগতিশীল, প্রজ্ঞাবান ও নিপাট ভদ্রলোক। তাঁর বিনয় সর্বজনবিদিত। এই মানুষটির জীবন–আলেখ্য ‘সময় ও দুঃসময়ের কথা’ একজন পাঠককে নিঃসন্দেহে আনন্দ দেবে, উন্মুক্ত করবে চিন্তার দুয়ার।

সাংবাদিক মাহফুজ আনাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতার ইতিহাসের বড় অংশ। গ্রন্থটিতে বিভিন্ন সময়ের কিছু প্রাসঙ্গিক ছবি ব্যবহার করা যেত। আর হয়তো দামও একটু কম রাখা যেত। আমি মনে করি, সাংবাদিকতা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য গ্রন্থটি অবশ্যপাঠ্য হতে পারে। তাই ভবিষ্যতে একটু সাশ্রয়ী মূল্যে পেপারব্যাক প্রকাশনার কথা দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড বিবেচনা করতে পারে।

...

সময় ও দুঃসময়ের কথা : মাহফুজ আনামের কথা ও কথোপকথন

গ্রন্থনা ও সম্পাদনা: ইমরান মাহফুজ

প্রকাশক: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড

প্রকাশ: এপ্রিল ২০২৬

প্রচ্ছদ: পরাগ ওয়াহিদ

পৃষ্ঠা: ২৫২; মূল্য: ৯৫০ টাকা

সূত্র: প্রথম আলো