|
| |
রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

ইউটিউব দেখে পড়ালেখা করে জিপিএ–৫

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:৫১ এএম
৩৮২ পঠিত
ইউটিউব দেখে পড়ালেখা করে জিপিএ–৫
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:

দরিদ্রতম পরিবারের প্রথম মেয়েসন্তান, যাঁরা নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পৌঁছান, তাঁদের অনুপ্রাণিত করতে দেওয়া হয় আইডিএলসি ও প্রথম আলো ট্রাস্টের ‘অদ্বিতীয়া’ বৃত্তি। বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) ছাত্রী। আবাসন, টিউশন ফি মওকুফসহ নানা সুবিধা দেয় এই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ২০১২ সাল থেকে ট্রান্সকম গ্রুপের সহযোগিতায় ৪২ জন এবং ২০১৭ সাল থেকে আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসির সহযোগিতায় ১০১ জনসহ মোট ১৪৩ জন এই বৃত্তি পেয়েছেন। ৮৬ জনের এরই মধ্যে স্নাতক শেষ হয়েছে। তাঁদের অনেকেই দেশে-বিদেশে ভালো অবস্থানে আছেন। এ বছর বৃত্তি পেয়েছেন ১৫ জন। পড়ুন তাঁদের মধ্যে ৫ জনের গল্প।

ইউটিউব দেখে পড়ালেখা করে জিপিএ–৫: অন্তরা তাঁতী

শ্রীমঙ্গলের মেয়ে অন্তরা

শ্রীমঙ্গলের কালীঘাট চা-বাগানের একটি ছোট্ট ঘরে আমার জন্ম। বাবা চা-শ্রমিক। প্রতিদিন ১৮৭ টাকা তাঁর মজুরি। সংসারে অভাব থাকলেও বাবা সব সময় স্বপ্ন দেখেছেন, আমি পড়ালেখা করব, বড় হব। তাঁর এই কষ্ট, তাঁর স্বপ্ন ছোটবেলা থেকে আমাকেও প্রভাবিত করেছে। সব সময় ভেবেছি, একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়ে বাবার কষ্ট দূর করব।

অভাবের কারণে স্কুলে পড়ার সময় গাইড বই কিনতে পারতাম না। বন্ধুদের কাছ থেকে বই ধার করে পড়তাম। এভাবেই ২০২২ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করি। একাদশ শ্রেণিতে ওঠার পর কোচিং করার সামর্থ্য ছিল না। বন্ধুদের নোট সংগ্রহ করে পড়তাম। বাসায় স্মার্টফোন না থাকায় মাঝেমধ্যে পিসতুতো ভাইয়ের ফোনে ইউটিউব দেখে দেখে ক্লাস করতাম। ২০২৪ সালে এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ পাই।

এখন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে পড়ছি; কিন্তু যাতায়াত, বই-খাতা ও পড়াশোনার অন্যান্য খরচ চালানো পরিবারের জন্য খুব কঠিন। আমার দুই ছোট বোনের পড়াশোনার খরচও বাবাকেই বহন করতে হয়। আশা করি, অদ্বিতীয়া বৃত্তি আমাকে পড়াশোনার সাহস জোগাবে, বাবার ওপরও চাপ কমবে।

কখনো পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবিনি: অনিমা রানী পাল

মৌলভীবাজারের অনিমা

২০২৩ সালে এসএসসিতে ও ২০২৫ সালে এইচএসসি পাস করি। রেজাল্ট হয়তো খুব ভালো না; কিন্তু এর পেছনে যে কী সংগ্রাম ছিল, সেটা শুধু আমি আর আমার পরিবারই জানি।

আমার বাবা একজন কৃষক। মা চা-শ্রমিক। আমরা চার বোন। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট দুই বোনের একজন অষ্টম শ্রেণিতে, অন্যজন প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। দাদু-ঠাকুমাও আমাদের সঙ্গেই থাকেন। বাবার খেত-খামারের অনিশ্চিত আয় আর মায়ের সামান্য মজুরিতে সাতজনের সংসার চলে। এত মানুষের খরচ মিটিয়ে আমাদের তিন বোনের পড়াশোনার ব্যয় বহন করা মা-বাবার জন্য খুব কঠিন।

চা-বাগানের শ্রমিকের সন্তান হিসেবে অভাব-অনটন খুব কাছ থেকে দেখেছি; কিন্তু কখনো পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবিনি। এখন চট্টগ্রাম শহরে পড়াশোনা করি বলে প্রতি মাসে বাড়ি থেকে টাকা পাঠাতে হয়। মা-বাবা রীতিমতো হিমশিম খান। আইডিএলসি ও প্রথম আলো ট্রাস্টের অদ্বিতীয়া বৃত্তি আমাদের এই কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করবে। ভবিষ্যতে আমি আমার পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করতে চাই।

স্কুলের পোশাক কিনতে মানুষের জুমে কাজ করেছি: লিডিয়া বম

বান্দরবানের লিডিয়া

একটি ছোট মাচাং ঘরে আমার জন্ম। পরিবারে শিক্ষার সুযোগ খুব বেশি ছিল না। তবে মা-বাবার ইচ্ছা ছিল, তাঁরা উচ্চশিক্ষা না পেলেও সন্তানদের শিক্ষিত করবেন। মা-বাবা দুজনই জুমচাষি। খাবার জোগাড় করতে অন্যের জুমেও কাজ করতে হয়। কখনো মাসে সাত হাজার টাকা আয় হতো, কখনো তার অর্ধেকেরও কম। এমন দিনও গেছে, ক্ষুধা পেটে রাত কাটিয়েছি। স্কুলের পোশাক কেনার টাকা ছিল না বলে মানুষের জুমে কাজ করেছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার খরচ জোগাতে বাবা পরিচিত একজনের কাছ থেকে টাকা ধার করেছিলেন; কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ আমার হয়নি। অগত্যা ঋণের টাকা শোধ করতে ঢাকায় গিয়ে কাজে যোগ দিই। সেখানেই এক সিনিয়র আপুর কাছে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বৃত্তির খোঁজ পাই। আবেদন করার পর পড়ার সুযোগও হয়ে যায়।

এখন আমার ছোট বোন নার্সিং কলেজে পড়ে। তাঁর পড়াশোনার খরচ চালাতেও মা-বাবাকে বেশ কষ্ট করতে হয়। অদ্বিতীয়া বৃত্তি পেলে আমি নিজের পড়াশোনার দিকটা দেখতে পারব, এতে মা-বাবার ওপর আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে।

বাবাকে হারিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা: মেহেরুন নেছা

খাগড়াছড়ির মেহেরুন নেছা

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে আমি এখন ‘প্রি-আন্ডারগ্র্যাড পাথওয়ে’ কোর্সে পড়ছি।

আমাদের পরিবারে তিনজন—আমি, আমার ছোট ভাই ও মা। ২০২৩ সালে কিডনির রোগে আমার বাবা মারা যান। বাবা ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এরপর থেকে সংসারের দায়িত্ব পড়ে মায়ের ওপর। মা গৃহিণী। তিনি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। মাঝেমধ্যে বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করে কিছু টাকা আয়ের চেষ্টা করেন। আমার ভাই নবম শ্রেণিতে পড়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগে নিজের পড়াশোনা ও অন্যান্য খরচ নিজেই চালানোর চেষ্টা করেছি। কারণ, পরিবারের আয়ের নির্ভরযোগ্য কোনো উৎস নেই। নিজের খরচ নিজে চালিয়ে পরিবারের ওপর চাপ কমাতে চেয়েছি; কিন্তু পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সহজ নয়। আমার পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়েই মা হিমশিম খান। তার ওপর ভাইয়ের পড়াশোনার খরচও তাঁকেই বহন করতে হয়।

অদ্বিতীয়া বৃত্তি আমার হাতখরচের দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমিয়েছে। আমি চাই, আর্থিক সংকটের কারণে আমার পড়াশোনা থেমে না যাক। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে একদিন পরিবারের দায়িত্ব নিতে চাই।

মায়ের ত্যাগের মূল্য দিতে চাই: মিকল ময় ম্রো

বান্দরবানের মিকল ময় ম্রো

আমি যখন ছোট, তখনই মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়। এরপর মা একাই আমাদের তিন ভাই–বোনকে বড় করেছেন। আমাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে নিজের অনেক স্বপ্ন ও আরাম ত্যাগ করেছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল একটাই—আমরা পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াব।

আমাদের নিজেদের কোনো বাড়ি নেই। দীর্ঘদিন মামার বাড়িতে থেকেছি। সংসার চালাতে মা অনেক কষ্ট করেছেন। কখনো মানুষের কাছ থেকে টাকা ধার করেছেন, কখনো মজুরিভিত্তিক কাজ করে আমাদের বই-খাতা ও স্কুলের খরচ জুগিয়েছেন। নিজের জন্য কোনো দিন একটা নতুন জামাও কিনতে পারেননি। টাকার অভাবে আমার মেজ ভাই পড়াশোনা করতে পারেনি। নিজে কাজ করে সে আমাদের পড়াশোনায় সহায়তা করেছে।

২০২৪ সালে এইচএসসি পাস করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চেয়েছিলাম। প্রথমবার এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের ভর্তি পরীক্ষায় নির্বাচিত না হলেও হাল ছাড়িনি। দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে বৃত্তিসহ পড়ার সুযোগ পাই। আমার মতো যাঁরা আর্থিক সংকটে দিন কাটান, ভবিষ্যতে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে চাই।

সূত্র: প্রথম আলো