|
| |
সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

সরকারি ফ্ল্যাটের বেসরকারি ব্যবস্থাপক

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:০০ এএম
২৫০ পঠিত
সরকারি ফ্ল্যাটের বেসরকারি ব্যবস্থাপক
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:

সরকারি ফ্ল্যাটটা আমার নামে; তবে আমি সেখানে থাকি না। থাকেন অন্য একজন। এতে দোষের কী আছে? ফ্ল্যাট কি আর মানুষ? তাকে তো আর প্রতিদিন দেখতে হয় না! বরং আমি না থাকায় ফ্ল্যাটটি একা একা পড়ে নেই। একজন মানুষকে আশ্রয় দিতে পারছে। এটাও তো একধরনের সামাজিক দায়িত্ব পালন!

আমার এক বন্ধু বিষয়টি শুনে বলল, ফ্ল্যাটটা তোমার নামে, থাকো না কেন?

বললাম, ফ্ল্যাটটার বরাদ্দ আমার নামে, থাকার দায়িত্বটা অন্যের।

মানে?

মানে, সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হয়। অফিসের কাজ যেমন সহকর্মীরা ভাগ করে করি, ফ্ল্যাটে থাকাটাও একজনকে দায়িত্ব দিয়েছি।

বন্ধু বলল, কিন্তু ভাড়াটা?

ওটা আমার দায়িত্ব। দায়িত্বের বিনিময়ে কিছু সম্মানী তো থাকতেই পারে!

বন্ধু আর কথা বাড়াল না। সম্ভবত আমার এই অভিনব আবাসন-দর্শন বুঝতে তার আরও কিছুদিন লাগবে।

আসলে সরকারি ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাওয়ার পর থেকেই আমি বিষয়টিকে একটু আধুনিকভাবে দেখছি। সরকারি আবাসন পরিদপ্তর হয়তো ভেবেছে, আমাকে থাকার জায়গা দেবে। আমি ভেবেছি, আমাকে একটা সুযোগ দিয়েছে। তারা দিয়েছে ফ্ল্যাট, আমি পেয়েছি ভাড়টে। দুই পক্ষের মধ্যে বোঝাপড়াটা বেশ ভালোই চলছিল।

হঠাৎ একদিন শুনলাম, সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের লোকজন নাকি ফ্ল্যাট পরিদর্শনে যাচ্ছেন। খবরটা শুনে আমার ভাড়াটে যতটা ভয় পেল, আমি তার চেয়ে বেশি অবাক হলাম। পরিদর্শকেরা ফ্ল্যাট দেখতে আসবেন, ভালো কথা; কিন্তু ফ্ল্যাটে আমি থাকি না বলে এত অস্বস্তির কি আছে? আমি তো ফ্ল্যাটটাকে অবহেলা করিনি; বরং নিয়মিত ভাড়া দিয়ে সচল রেখেছি।

পরিদর্শকেরা নাকি জানতে চাইবেন, বরাদ্দ প্রাপক কোথায়? প্রশ্নটা শুনে আমার মনে হলো, এ কেমন প্রশ্ন! বরাদ্দ প্রাপককে ফ্ল্যাটে থাকতে হবে কেন? বরাদ্দ প্রাপক তো বরাদ্দ পেয়েছেন। থাকা আর বরাদ্দ পাওয়া কি একই বিষয়?

সরকারি ফ্ল্যাটের বরাদ্দপত্রে নিশ্চয়ই লেখা নেই—বরাদ্দ পাওয়ার পর প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের ফ্ল্যাটে উপস্থিতি দিতে হবে! তা ছাড়া আমার নামে ফ্ল্যাট, আমার নামে বিদ্যুৎ বিল, আমার নামেই বরাদ্দের কাগজ। এতকিছুর পরও আমাকে সেখানে থাকতে হবে, এ কেমন বাড়াবাড়ি!

শুনেছি, রাজধানীতে সরকারি বাসার সংখ্যা ১৯ হাজার ৯১। এতগুলো বাসার সব কটিতে বরাদ্দ প্রাপক নিজে থাকলে ভাড়াটেদের কী হবে? তাঁদেরও তো বাসা দরকার। আমি অন্তত একজনের আবাসনের সমস্যা সমাধান করেছি। রাষ্ট্রের উচিত আমাকে ধন্যবাদ দেওয়া, নোটিশ নয়!

আমার প্রস্তাব, ভবিষ্যতে সরকারি ফ্ল্যাট বরাদ্দের সঙ্গে দুটি কাগজ দেওয়া হোক। একটিতে থাকবে বরাদ্দ প্রাপকের নাম, অন্যটিতে প্রকৃত বাসিন্দার নাম। আর ভাড়াটে থাকলে তৃতীয় কাগজে লেখা থাকবে, ‘সরকারি ফ্ল্যাটের বেসরকারি ব্যবস্থাপক’। তাতে আর কোনো বিভ্রান্তি থাকবে না।

তবে পরিদর্শনের খবর আসার পর ভাড়াটেকে বলেছি, আপাতত একটু সতর্ক থাকতে। কেউ বরাদ্দ প্রাপকের খোঁজ করলে বলবে, তিনি বাইরে গেছেন। কত দিনের জন্য? সেটা জিজ্ঞাসা করলে বলবে, সরকারি চাকরিতে বদলির কোনো ঠিক নেই!

ভাড়াটে অবশ্য জানতে চেয়েছে, স্যার, আপনি কি কখনো এখানে উঠবেন?

বলেছি, অবশ্যই। সরকারি নির্দেশনা তো অমান্য করা যায় না। তবে তার আগে একটু দেখে নিই, ভাড়াটে সরানোর নির্দেশনাটা কতটা স্থায়ী হয়!

বন্ধু আবার বলল, তোমার তো বরাদ্দ বাতিল হয়ে যেতে পারে!

বললাম, তা হলে কী আর করা! ফ্ল্যাটটা চলে যাবে; কিন্তু অভিজ্ঞতা তো থাকবে। সরকারি ফ্ল্যাটে না থেকেও সরকারি ফ্ল্যাটের সুবিধা ভোগ করার অভিজ্ঞতা সবার হয় না।

তবে একটা কথা বুঝতে পারছি না। সরকারি ফ্ল্যাটে থাকতে হলে যদি বরাদ্দ প্রাপককেই থাকতে হয়, তাহলে বরাদ্দ দেওয়ার সময়ই তাঁকে একবার দেখে নেওয়া উচিত নয়? ফ্ল্যাটের চাবি দেওয়ার আগে অন্তত জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে, ‘আপনি এখানে থাকবেন তো, নাকি শুধু নাম রাখবেন?’

আমার প্রস্তাব, ভবিষ্যতে সরকারি ফ্ল্যাট বরাদ্দের সঙ্গে দুটি কাগজ দেওয়া হোক। একটিতে থাকবে বরাদ্দ প্রাপকের নাম, অন্যটিতে প্রকৃত বাসিন্দার নাম। আর ভাড়াটে থাকলে তৃতীয় কাগজে লেখা থাকবে, ‘সরকারি ফ্ল্যাটের বেসরকারি ব্যবস্থাপক’।

তাতে আর কোনো বিভ্রান্তি থাকবে না।

কারণ, সরকারি ফ্ল্যাটের ব্যাপারে আমার এখন একটাই নীতি—ফ্ল্যাট বরাদ্দ আমার, বাসিন্দা অন্য জন; শুধু ভাড়া যেন ভুল করে অন্য কারও কাছে না যায়!

সূত্র: প্রথম আলো