|
| |
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

এক মাঠে কারও শৈশব, কারও বেঁচে থাকার লড়াই

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:৫৪ এএম
২৮৯ পঠিত
এক মাঠে কারও শৈশব, কারও বেঁচে থাকার লড়াই
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
মাঠের পাশে একটি ছেলে বসে আছে। তার হাতে হাওয়াই মিঠাইয়ের গুচ্ছ। মাঠের ভেতরে সমবয়সী শিশুরা খেলছে, ছুটছে, হাসছে। আর ছেলেটি বসে বসে তাদের খেলা দেখছে। তার চোখের সামনে একটা মাঠ, কিছু শিশু আর একটুকরা শৈশব; যে শৈশবের অংশ হওয়ার ইচ্ছা হয়তো তারও আছে, কিন্তু সেই ইচ্ছার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবিকার তা...
ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

ছবি তোলার জন্য শহরের এদিক–ওদিক ঘুরে বেড়াই। মানুষের জীবন, জীবনের বৈচিত্র্য, আনন্দ–বেদনা আর প্রতিদিনের ছোট ছোট গল্পগুলো ক্যামেরায় ধরে রাখার চেষ্টা করি। সেদিনও ইচ্ছা হলো, গোলাপবাগ মাঠে গিয়ে শিশুদের খেলাধুলার কিছু ছবি তুলব। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। চলে গেলাম মাঠে। কয়েকটি ছবিও তুললাম। মাঠের চারপাশে হাঁটার জন্য তৈরি পথ ধরে হাঁটছিলাম, আর সুযোগ বুঝে ক্যামেরায় বন্দী করছিলাম মুহূর্তগুলো। হঠাৎ একটা দৃশ্যে চোখ আটকে গেল।

মাঠের পাশে একটি ছেলে বসে আছে। তার হাতে হাওয়াই মিঠাইয়ের গুচ্ছ। মাঠের ভেতরে সমবয়সী শিশুরা খেলছে, ছুটছে, হাসছে। আর ছেলেটি বসে বসে তাদের খেলা দেখছে। তার চোখের সামনে একটা মাঠ, কিছু শিশু আর একটুকরা শৈশব; যে শৈশবের অংশ হওয়ার ইচ্ছা হয়তো তারও আছে, কিন্তু সেই ইচ্ছার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবিকার তাগিদ। দৃশ্যটি দেখে কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়ালাম। তারপর ক্যামেরাটি হাতে তুলে ছেলেটির কয়েকটি ছবি নিলাম।
তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোমার খেলতে ইচ্ছা করে না?’ ছেলেটি উত্তর দিল, ‘খেললে খাব কী, স্যার? ইচ্ছা তো করে। কিন্তু এগুলো বিক্রি না হলে কপালে ভাত জুটবে না।’

ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

কথাগুলো খুব সাধারণ। অথচ সেই মুহূর্তে আমার কাছে মনে হলো, এর চেয়ে ভারী কোনো উত্তর হয়তো তার দেওয়ার ছিল না।
কী বলব, বুঝতে পারছিলাম না। আমার সামনে তখন শুধু হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করা একটি শিশু ছিল না, ছিল এমন এক বাস্তবতা, যার মুখোমুখি হয়ে আমাদের অনেক পরিচিত যুক্তি অসহায় হয়ে পড়ে। যে বয়সে একটি শিশুর মাঠে ছুটে বেড়ানোর কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে খেলতে বিকেল পার করার কথা, সেই বয়সেই তাকে ভাবতে হচ্ছে দিনের শেষে পেটে ভাত জুটবে কি না।

আমার প্রশ্নের উত্তরে ছেলেটি আর কোনো দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেয়নি। সে বসার জায়গা থেকে উঠে দাঁড়াল। হাতে তুলে নিল হাওয়াই মিঠাইয়ের গুচ্ছ। তারপর সেগুলো বিক্রি করার উদ্দেশ্যে চলে গেল।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। ক্যামেরা হাতে ছিল, অথচ সেই মুহূর্তে নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলোকে প্রকাশ করার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ছেলেটির নামটাও জিজ্ঞাসা করা হলো না। তার বাড়ি কোথায়, পরিবারে কে কে আছে, কত দিন ধরে সে এভাবে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করছে, কিছুই জানা হলো না। হয়তো আরও কিছুক্ষণ কথা বলা যেত। হয়তো তার জীবনের গল্পের আরও কিছুটা জানা সম্ভব হতো। কিন্তু সেদিন আমি শুধু দাঁড়িয়ে রইলাম, আর সে তার জীবিকার সন্ধানে এগিয়ে গেল।
পরে ভাবলাম, এমন ঘটনা কি আমাদের সমাজে নতুন? প্রতিদিন কত শিশু জীবিকার তাগিদে রাস্তায় নামে। কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ পানি, কেউ হাওয়াই মিঠাই। কেউ মানুষের কাছে কিছু বিক্রি করার চেষ্টা করে, কেউ অন্যের কাজ করে পরিবারের পাশে দাঁড়ায়। তাদের অনেকের জীবনেই শৈশবের আনন্দের চেয়ে বেঁচে থাকার হিসাব বড় হয়ে ওঠে।

ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

আমরা হয়তো এসব দৃশ্যের পাশ দিয়ে প্রতিদিন হেঁটে যাই। দেখি, আবার ভুলেও যাই। কারণ, দারিদ্র্য আমাদের শহরের পরিচিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে। শিশুর হাতে খেলনা দেখার বদলে পণ্য দেখতে দেখতে আমরা যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। একটি শিশুর মুখে তার স্বপ্নের কথা শোনার বদলে তার পণ্যের দাম জিজ্ঞাসা করাই আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই স্বাভাবিকতার আড়ালে আমরা কী হারিয়ে ফেলছি? একটি সমাজে সব মানুষের আর্থিক অবস্থা এক হবে না, এটাই বাস্তবতা। কিন্তু একটি শিশুর শৈশব কি শুধু তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করবে? কারও কাছে বিকেল মানে খেলার মাঠ, আর কারও কাছে সেই একই বিকেল মানে কয়েকটি হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করে রাতের খাবারের ব্যবস্থা করা—এই পার্থক্য কি আমাদের ভাবায় না?

সামাজিক বৈষম্য শুধু সম্পদের অসম বণ্টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের সুযোগের পার্থক্যেও প্রকাশ পায়। কেউ জন্মের পর থেকেই শিক্ষা, নিরাপত্তা, পুষ্টি ও বিকাশের সুযোগ পায়। কেউ জীবনের শুরুতেই এমন দায়িত্বের মুখোমুখি হয়, যা বহন করার কথা ছিল না তার ছোট্ট কাঁধে। ফলে একই সমাজে বেড়ে উঠেও শিশুরা এক রকম শৈশব পায় না। কারও সামনে ভবিষ্যতের অসংখ্য দরজা খোলা থাকে, আর কারও দিন কেটে যায় খাবার জোগাড় করার চিন্তায়।

ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

সেদিন গোলাপবাগ মাঠে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল, আমরা উন্নয়নের কত গল্প বলি, কত বড় বড় স্বপ্ন দেখি, কত অর্জন নিয়ে গর্ব করি। অথচ আমাদের শহরেরই একটি শিশু যখন বলে, ‘খেললে খাব কী, স্যার?’, তখন সেই অর্জনের গল্পের পাশে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়—আমাদের উন্নয়নের আলো কি সবার জীবনে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে?

আমি জানি না, সেই ছেলেটির জীবনে ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে। জানি না, সে কোনো দিন নিশ্চিন্তে মাঠে খেলতে পারবে কি না। তার জীবনের গল্পের খুব সামান্য একটি মুহূর্তই আমার দেখা হয়েছে। সেই সামান্য মুহূর্তটুকু আমাকে অনেক বড় একটি বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

আমরা প্রায়ই বলি, শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু যে শিশুকে বর্তমানেই তার শৈশবের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে জীবিকার দায় নিতে হয়, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা কতটা ভাবি? তার জন্য শুধু সহানুভূতি প্রকাশ করাই কি যথেষ্ট? নাকি এমন একটি সমাজ গড়ার দায়িত্বও আমাদের রয়েছে, যেখানে কোনো শিশুকে ক্ষুধা আর খেলার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে না?
গোলাপবাগ মাঠের সেই ছেলেটির ছবিগুলো আমার কাছে তাই কেবল কয়েকটি আলোকচিত্র নয়। সেগুলো একই মাঠে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুটি বাস্তবতার দলিল; একদিকে খেলতে থাকা শিশুদের শৈশব, অন্যদিকে সেই শৈশবের বাইরে দাঁড়িয়ে জীবিকার লড়াই করা একটি শিশু।

হয়তো এমন দৃশ্য আমাদের সমাজে প্রতিদিন ঘটছে। হয়তো আমরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে আর থমকে দাঁড়াই না। কিন্তু যে বৈষম্যকে আমরা প্রতিদিনের স্বাভাবিক ঘটনা ভেবে এড়িয়ে যাই, সেটিই যদি ক্রমাগত গভীর হয়, তবে একদিন তার অভিঘাত পুরো সমাজকেই দুর্বল করে দিতে পারে।
একটি সমাজের ভাঙন সব সময় বড় কোনো বিপর্যয় দিয়ে শুরু হয় না। কখনো কখনো তার শুরু হয় ছোট ছোট বঞ্চনাকে উপেক্ষা করার মধ্য দিয়ে। যখন একটি শিশুর ক্ষুধা আমাদের কাছে আর প্রশ্ন হয়ে ওঠে না, যখন তার হারিয়ে যাওয়া শৈশব আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না, তখনই আমাদের থেমে ভাবা প্রয়োজন।

দয়াগঞ্জ, গেন্ডারিয়া, ঢাকা-১২০৪

সূত্র: প্রথম আলো