|
| |
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

পঁচাত্তরের অস্থির সময়: ৩ নভেম্বর প্রথম প্রতিরোধ

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:৪২ এএম
৩১২ পঠিত
পঁচাত্তরের অস্থির সময়: ৩ নভেম্বর প্রথম প্রতিরোধ
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের সিনিয়র অনেক অফিসারই সোচ্চার ছিলেন ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে।

১৯৭৫ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অস্থির সময়। বছরের শুরুতে বাকশাল গঠন করা হয় এবং ১৫ আগস্ট সেনা অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবার নির্মমভাবে নিহত হন। নভেম্বরে আবার সামরিক অভ্যুত্থান, জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড, পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান—৩ থেকে ৭ নভেম্বর একের পর এক ঘটনা ঘটে। এ ঘটনাগুলোর একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত পঁচাত্তরের অস্থির সময়: ৩ থেকে ৭ নভেম্বরের অকথিত ইতিহাস বইয়ে। বইটি সম্পাদনা করেছেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। বইটির কিছু চৌম্বক অংশ সংক্ষিপ্ত আকারে এখানে প্রকাশ করা হলো। এই অংশ নেওয়া হয়েছে হুমায়ুন কবির লিখিত ‘৩ নভেম্বর প্রথম প্রতিরোধ’ থেকে।

১৯৭৫ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী দেশের পরিস্থিতি সেনাবাহিনীতে মেনে নিতে পারছিলেন না প্রায় কেউই। সবাই অসন্তুষ্ট ছিলেন বিদ্যমান অবস্থা নিয়ে। সেনাপ্রধান সফিউল্লাহ, খালেদ মোশাররফ—এঁরা একসঙ্গে বসলেন।

খালেদ মোশাররফের সঙ্গে শাফায়াত জামিল সাহেবের কথাবার্তা হলো। সিনিয়র অফিসাররাও আলাপ-আলোচনা করছিলেন প্রত্যেকেই। কাজেই এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান (অবভিয়াস) ছিল যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড কেউ মেনে নিতে পারছিলেন না। কিন্তু সেই মুহূর্তে কার কী করণীয়, সে ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না কেউ। আর আর্মি তো কোনো কমান্ড ছাড়া অ্যাকশনে যেতে পারে না।

নতুন সেনাপ্রধান হলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি কোনো ডেফিনিট অর্ডার দিতে পারছিলেন না। ধরা যাক, কর্নেল শাফায়াত জামিল ও ব্রিগেডিয়ার খালেদকে তখন হুকুম চাইতে হবে আর্মি চিফের কাছে। কর্নেল শাফায়াত জামিলের অধীনে ছিল তিনটি পদাতিক, একটি আর্টিলারি ও একটি ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন। ব্যাটালিয়ন কমান্ডাররা তো তাঁর হুকুম ছাড়া কিছুই করতে পারবেন না। আবার ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল শাফায়াতের পক্ষে আর্মি হেডকোয়ার্টারের অনুমোদন ছাড়া কিছু করা হবে মিউটিনির শামিল।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের সিনিয়র অনেক অফিসারই সোচ্চার ছিলেন ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে। ঢাকা ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিল ছিলেন তাঁদেরই একজন। ওনার ব্রিগেডেরই দুটো রেজিমেন্ট ওই ঘটনা ঘটিয়েছিল। উনি হয়তো এ জন্যই বেশি সোচ্চার ছিলেন যে এরা তাঁর কমান্ড থেকে বেরিয়ে গিয়ে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং তাঁর কমান্ড আর শুনছে না।

এ নিয়ে সেনাসদরে সিনিয়র অফিসারদের বেশ কয়েকটি মিটিং হয়। সেখানে সিনিয়র অফিসারদের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, ডাইরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স, ডাইরেক্টর মিলিটারি অপারেশনস, লগ এরিয়া কমান্ডার, অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল সবাই এসব বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। অফিসাররা বলছিলেন, সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে, আমরা কীভাবে আমাদের ইউনিট কমান্ড করব, এভাবে চলতে পারে না ইত্যাদি। কিন্তু তাঁরা কোনো জবাব পাননি। ডেপুটি চিফ ও পরবর্তী সময়ে সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়ার সভাপতিত্বে এসব বৈঠক হয়েছে। তিনি মূলত শুনে গেছেন, বিশেষ কথাবার্তা বলেননি।

১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে কিছু একটা করা দরকার এবং অ্যাকশন নিতে হবে, এই মতটি বেরিয়ে এসেছে গোড়ার দিকেই। কিন্তু কীভাবে এটি হবে, তার পরিকল্পনা হয়েছে আরও পরে। এর পটভূমিটা তৈরি হয় ধীরে ধীরে। দেখা গেল, সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়া বঙ্গভবনে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রপতির নাম করে ফারুক-রশিদ ওনাকে যা বলে, তিনি সেটাই শুনতেন, এখানে এসে উনি তা-ই ইমপ্লিমেন্ট করতেন। অনেক অফিসারের ট্রান্সফার, পোস্টিংয়ের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ফারুক-রশিদরা তাদের নিজের সুবিধামতো অনেক ট্রান্সফার, পোস্টিং করিয়ে নিয়েছে তাঁকে দিয়ে। জেনারেল জিয়া ওদের বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশন নেবেন কি নেবেন না, কিছুই মুখ খুলে বলছিলেন না।

জুনিয়র অফিসাররা একপর্যায়ে বুঝতে পারলেন, তাঁর তরফ থেকে কোনো অ্যাকশন হবে না। তখন ব্রিগেডিয়ার খালেদ, কর্নেল শাফায়াত জামিল, সেনাসদরের বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন অফিসার, ঢাকার বাইরের অন্যান্য ব্রিগেডের অফিসারদের মধ্যে কথাবার্তা চালাতে থাকেন সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে। সে অর্থে এটা কোনো গোপন ক্যুর পরিকল্পনা নয়। ক্রমশ এমন একটা সময় এল, যখন সবাই একমত হলেন যে জেনারেল জিয়া যদি কোনো অ্যাকশন না-ও নেন, আমরা বসে বসে এসব সহ্য করতে পারি না।

আমি তখনো সাবেক সেনাপ্রধান (সদ্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলিকৃত) জেনারেল সফিউল্লাহর এডিসি ছিলাম। তৎকালীন সিজিএস জেনারেল খালেদ মোশাররফ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে আমার সেক্টর কমান্ডার। সেই সুবাদে ওনার সঙ্গে আমার কথাবার্তা, যোগাযোগ হতো। যদিও আমরা জুনিয়র অফিসার ছিলাম, কিন্তু সিনিয়র অফিসারদের মধ্যে কী সব আলোচনা হয়, তা আমরা জানতাম, শুনতাম। কিছু একটা ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে, সেটা আমরা জানতাম। অ্যাকশনের ব্যাপারে দু-একটা মিটিংও হয়েছে। একপর্যায়ে সেনাসদরে একটা মিটিংয়ে অফিসাররা বললেন, ‘খালেদ মোশাররফকে একটা অ্যাকশন নিতে হবে।’

খালেদ মোশাররফ তখন বললেন, ‘এখনো সময় হয়নি। আপনারা রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করুন।’ খালেদের ভাষ্য ছিল, দেশের নাড়ি-নক্ষত্র না বুঝে একটা অ্যাকশন নিতে গিয়ে দেশকে হয়তো আরও সম্ভাব্য বিপদের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হবে। তিনি ধৈর্য ধরতে বললেন সবাইকে।

কিন্তু ব্রিগেডিয়ার খালেদের কথাকে সবাই মেনে নিতে পারলেন না। আসলে ধৈর্যহারা হয়ে গিয়েছিলেন সবাই। তাঁদের বক্তব্য ছিল, এত বড় একটা অঘটন ঘটে গেল, আমরা আর বসে থাকতে পারি না। অবিলম্বে কিছু একটা করা দরকার। একপর্যায়ে খালেদ মোশাররফকে এ-ও বলা হলো, ‘আপনি ভয় পাচ্ছেন।’ তখন খালেদ বললেন, ‘ঠিক আছে, আমরা একটা কিছু করব এ ব্যাপারে।’

অক্টোবরের মাঝামাঝিই আমি বলব, সিরিয়াস কথাবার্তা হচ্ছিল বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাদের প্রতিরোধ করার ব্যাপারে। তখন ক্যান্টনমেন্টের বাইরে দু-এক জায়গায় সিনিয়র অফিসাররা কেউ কেউ বসেছেন কীভাবে কী করা যায় আলোচনা করতে। আর্মিতে তো তখন দুটো পক্ষ—যারা মৌনতার মধ্য দিয়ে কিংবা পরোক্ষভাবে বঙ্গভবনে থাকা বিদ্রোহীদের সাহায্য করছিল, আর তাদের বিরোধী পক্ষ। সবাইকে তখন বিশ্বাস করার উপায় ছিল না। আবার কিছু সেনা কর্মকর্তার ব্যক্তিগত প্রভাবের ব্যাপার ছিল। যেমন জেনারেল জিয়া মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। ওনার অনেক বিশ্বস্ত অফিসার ও ট্রুপস ছিল আর্মিতে। যাঁদের ওপর উনি নির্ভর করতেন।

একইভাবে ব্রিগেডিয়ার খালেদের ট্রুপসও ছিল, নিজস্ব বিশ্বস্ত অফিসার ছিল। বঙ্গভবনে যে কয়জন ছিল, তাদেরও ছিল বন্ধুবান্ধব, ব্যক্তিগত যোগাযোগ। কাজেই বিষয়টি ওপেনলি আলোচনা করার অবস্থায় ছিল না।

বঙ্গভবনে অবস্থানরত ফারুক-রশিদ গ্রুপের সঙ্গে টেলিফোনে বাগ্‌যুদ্ধ, দর-কষাকষি চলতে লাগল আমাদের। ওরা জেনারেল ওসমানীকে নিয়ে গিয়েছিল তাদের মুখপাত্র হিসেবে। জেনারেল খলিল ছিলেন সিডিএস আমাদের এদিকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অফিসার কথা বলছিলেন। খালেদ মোশাররফ নিজে ওদের সঙ্গে কথা বলেননি। দীর্ঘক্ষণ কথাবার্তা চলল। তারা তো আত্মসমর্পণে রাজি হতে চাইছিল না, বলছিল, ‘জেনারেল জিয়া কোথায়? সেনাপ্রধানকে আমাদের দরকার।’

যখন ডিসিশন হয়ে গেল একটা অ্যাকশন নিতে হবে, তখন সিনিয়র অফিসারদের ভেতরেই তা সীমিত ছিল। তবে একসময় মোটামুটি সবাই জানতে পারল যে অ্যাকশন নেওয়া হবে। তবে কখন কীভাবে হবে, সেটাই ছিল কর্নেল শাফায়াতের পরিকল্পনার ব্যাপার এবং ব্রিগেডিয়ার খালেদের ফাইনাল নির্দেশের অপেক্ষায়।

যেদিন রাতে অ্যাকশন হবে, অর্থাৎ ২ নভেম্বর, আমরা জানতাম আজ রাতে একটা কিছু ঘটবে। খালেদ মোশাররফের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। আমার তো কোনো ট্রুপস ছিল না তখন।

আমি ছিলাম স্টাফ ডিউটিতে। আর্মিতে দুই রকমভাবে কাজ হয়। একসময় আপনি ট্রুপস কমান্ড করেন, তারপর আপনাকে স্টাফ ডিউটি করতে হয়।

তারপর কিছুদিন পর আবার ট্রুপস কমান্ডে যেতে হয়। সাবেক সেনাপ্রধানের এডিসি হিসেবে আমার কোনো ট্রুপস ছিল না। তবে আমি জানতাম যে ঘটনাটা ঘটতে যাচ্ছে। তো খালেদ মোশাররফ আমাকে বললেন, ২ তারিখ রাত চারটা-সাড়ে চারটার দিকে বেঙ্গল লাইনে যেতে। আমি যখন ফোর্থ বেঙ্গলে পৌঁছাই, তখন অবশ্য ভোররাত পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটা হবে। সেখানে গিয়ে খালেদ মোশাররফ, কর্নেল শাফায়াত, মেজর হাফিজসহ বেশ কয়েকজন অফিসারকে দেখলাম। তার মধ্যে কিছু ট্রুপস মুভমেন্ট হয়েছে। বঙ্গভবন থেকে ফার্স্ট বেঙ্গলের ও সেকেন্ড বেঙ্গলের ২ কোম্পানি ট্রুপস উইথড্র করে এসে রেসকোর্সের পাশে থাকা বিদ্রোহীদের ঘেরাও করে রেখেছে।

আমরা যত দূর জানি, খালেদ মোশাররফ ঘটনাটা শুরু করার আগে জেনারেল জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। খালেদ তাঁকে ঘটনাটা বুঝিয়ে বলেছিলেন নেতৃত্ব দিতে। জবাবে জিয়া নাকি বলেছিলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে কিছু জানি না। তোমরা যা ইচ্ছা করতে পারো।’ কথাটা খালেদ তাঁকে জানিয়েছিলেন অ্যাকশনের ঠিক পূর্বমুহূর্তে, যাতে জিয়া রিঅ্যাকশন টাইম না পান।

ফোর্থ বেঙ্গল লাইনে তখন চরম উত্তেজনা। অনেক লোকজন চারদিকে ছোটাছুটি করছে। সিওর রুমে তাঁর চেয়ারে বসে আছেন খালেদ মোশাররফ। আশপাশে ফোর্থ বেঙ্গলের, ৪৬ ব্রিগেডের বেশ কিছু অফিসার। তারপর আস্তে আস্তে সকালের দিকে আরও অনেক লোকজন এলেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন ডিএমও কর্নেল মালেক, জি-১ কর্নেল নুরুদ্দীন (পরে সেনাপ্রধান), ব্রিগেডিয়ার সাবিহ উদ্দিন, কর্নেল গাফ্ফার, মেজর হাফিজ প্রমুখ। স্টাফ অফিসার হিসেবে আমার তেমন ভূমিকা বা দায়িত্ব ছিল না, তবে আমি তাঁদের পাশেই ছিলাম। পরে খালেদ মোশাররফ তাঁকে সহযোগিতা করার জন্য আমাকে নিযুক্ত করেন। আমি আমার সাবেক চিফ জেনারেল সফিউল্লাহর সঙ্গে কথা বলে খালেদ মোশাররফের সঙ্গে ডিউটি করতে থাকলাম।

এরপর কী হবে, ফারুক-রশিদের ব্যাপারে কী করা হবে, এই নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে লাগলেন অফিসাররা। কেউ বলছিলেন, ‘এদের মেরে শেষ করে দাও। বম্বিং করে উড়িয়ে দাও...।’ এদিকে আমরা খবর পেলাম ফারুক-রশিদ এরা বঙ্গভবন থেকে তাদের নিজস্ব চ্যানেলে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে—চট্টগ্রাম, যশোর, রংপুর এসব জায়গায়। তারা তাদের সপক্ষে সমর্থন জোগাড়ের চেষ্টা করছিল। কিন্তু উল্লেখযোগ্য কোনো সাপোর্ট পায়নি বলেই মনে হয়।

ক্যান্টনমেন্টের বাইরে থেকে যাওয়া ফারুক-রশিদের লোকেরা তখনো সশস্ত্র। রেসকোর্সে থাকা বিদ্রোহী সৈন্যদের ঘিরে রেখেছিল মেজর ইকবালের ট্রুপস। ওরা আবার পরিখা খুঁড়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যূহ গড়ে রেখেছে, মুখোমুখি অবস্থান। কেউ কারও প্রতি গুলি ছুড়ছে না, তবে যেকোনো মুহূর্তে একটা তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়ে যেতে পারে। ৩ তারিখ সকালবেলা এ রকম অবস্থা ছিল।

ফারুক-রশিদকে দলবলসহ আত্মসমর্পণ করতে বলা হলো। ব্রিগেডিয়ার খালেদের ইচ্ছা ছিল, ওদেরকে কৌশলে মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলবেন। কেননা তখন পর্যন্ত একটা গুলিও ছোড়া হয়নি। কোনো গোলাগুলি হোক, এটা খালেদ চাননি। রক্তক্ষয় এড়াতে চাইছিলেন তিনি।

বঙ্গভবনে অবস্থানরত ফারুক-রশিদ গ্রুপের সঙ্গে টেলিফোনে বাগ্‌যুদ্ধ, দর-কষাকষি চলতে লাগল আমাদের। ওরা জেনারেল ওসমানীকে নিয়ে গিয়েছিল তাদের মুখপাত্র হিসেবে। জেনারেল খলিল ছিলেন সিডিএস আমাদের এদিকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অফিসার কথা বলছিলেন। খালেদ মোশাররফ নিজে ওদের সঙ্গে কথা বলেননি। দীর্ঘক্ষণ কথাবার্তা চলল। তারা তো আত্মসমর্পণে রাজি হতে চাইছিল না, বলছিল, ‘জেনারেল জিয়া কোথায়? সেনাপ্রধানকে আমাদের দরকার।’

এভাবেই সময় কাটতে লাগল। কেউ ওদের আক্রমণ করার কথা বলতে লাগলেন। এদিকে খালেদ মোশাররফ এয়ারফোর্সকে স্ট্যান্ডবাই রেখেছিলেন। বিদ্রোহীদের বলা হলো, তোমাদের সবাইকে ঘিরে ফেলা হয়েছে। খালেদ এয়ারফোর্সের বিমানের কয়েকটি সর্টি (তীব্রগতিতে উড়ে যাওয়া) করালেন রেসকোর্স ও বঙ্গভবনের ওপর দিয়ে। লিয়াকত আলম, সালাহউদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন অফিসার ছিলেন এর মধ্যে।

বিদ্রোহীদের দেশত্যাগের জন্য সম্ভবত মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তারাই বোধ হয় থাইল্যান্ডকে এদের গ্রহণ করাতে রাজি করে। বাংলাদেশ বিমানেরই একটা ফকারে করে তারা ঢাকা ত্যাগ করে ৩ তারিখ মাঝরাতের দিকে। ৪ তারিখ সকালে পুলিশের ঊর্ধ্বতন সূত্রে আমরা জানতে পারি জেলে চার নেতাকে হত্যা করার কথা। এ খবর শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন সবাই। বলাবলি হতে লাগল, ঘাতকদের দেশত্যাগ করতে দেওয়াটা বড় ভুল হয়েছে।...

একপর্যায়ে ঠিকই মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ল ফারুক-রশিদ চক্র। অন্য ক্যান্টনমেন্টগুলোয় কোনো সাড়া পেল না তারা। সবাই যখন জেনে গিয়েছিল জেনারেল খালেদ এটার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তখন তো তাদের পক্ষে যাওয়ার আর প্রশ্নই ছিল না। একসময় ক্যান্টনমেন্টে অস্ত্রসমর্পণ করতে বলা হয়েছিল তাদের, কিন্তু তারা রাজি হয়নি, তাতে বিদ্রোহীরা গরম-গরম কথা বলতে লাগল।

দুপুরের পর বঙ্গভবনে একটা নেগোসিয়েশন টিম পাঠানো হলো খুব সম্ভব ব্রিগেডিয়ার সাবিহ উদ্দিনের নেতৃত্বে। ওখান থেকেও দুজন অফিসার—নূর ও ডালিম আসে শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করতে। বিদ্রোহীরা আমাদের আলোচক দলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু সারা দিন মিগের মহড়া দেখে শেষ পর্যন্ত তারা বিচলিত হয়ে পড়ে দেশত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করে। বিদ্রোহীদের পক্ষে এ প্রস্তাব দেন জেনারেল ওসমানী।

এই প্রস্তাব নিয়ে আমাদের এদিকে বিরাট মতভেদ সৃষ্টি হলো। বিশেষ করে ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামানের নেতৃত্বে আমরা অনেকে বললাম, এটা কখনোই উচিত হবে না। খুনিদের যেন কিছুতেই এ সুযোগ না দেওয়া হয়। তারাও আর তাদের দাবি থেকে সরল না, আমরাও তা মেনে নিতে চাইছিলাম না। ফলে একটা অচলাবস্থা দেখা দিল। শেষ পর্যন্ত সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ ও রক্তক্ষয় এড়ানোর জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের দেশত্যাগ করতে দিতে রাজি হলেন খালেদ মোশাররফ।

বিদ্রোহীদের দেশত্যাগের জন্য সম্ভবত মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তারাই বোধ হয় থাইল্যান্ডকে এদের গ্রহণ করাতে রাজি করে। বাংলাদেশ বিমানেরই একটা ফকারে করে তারা ঢাকা ত্যাগ করে ৩ তারিখ মাঝরাতের দিকে। ৪ তারিখ সকালে পুলিশের ঊর্ধ্বতন সূত্রে আমরা জানতে পারি জেলে চার নেতাকে হত্যা করার কথা। এ খবর শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন সবাই। বলাবলি হতে লাগল, ঘাতকদের দেশত্যাগ করতে দেওয়াটা বড় ভুল হয়েছে।...

  •  ক্যাপ্টেন হুমায়ুন কবির সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও বীর প্রতীক

সূত্র: প্রথম আলো