|
| |
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

ডানপন্থি জোটের ভরাডুবি, নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রী হওয়া ‘প্রায় অসম্ভব’

Super Admin

প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:৫৮ এএম
২৯৯ পঠিত
ডানপন্থি জোটের ভরাডুবি, নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রী হওয়া ‘প্রায় অসম্ভব’
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোট বড় ধাক্কা খেয়েছে। প্রাথমিক বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের বর্তমান ৬৪ আসনের জোটটি এবার পেতে পারে মাত্র ৫০ থেকে ৫১টি আসন। তবে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন ক...

ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোট বড় ধাক্কা খেয়েছে। প্রাথমিক বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের বর্তমান ৬৪ আসনের জোটটি এবার পেতে পারে মাত্র ৫০ থেকে ৫১টি আসন। তবে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে দেশটিতে নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

মঙ্গলবারের (২৭ অক্টোবরের) নির্বাচনের পর ইসরায়েলের তিনটি প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলের বুথফেরত জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। জরিপে ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলো ৫১ থেকে ৫২টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। অন্যদিকে আরবদের নেতৃত্বাধীন জোট পেতে পারে মোট ১৮টি আসন।

নির্বাচনি প্রচারে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং উগ্র ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের ওতজমা ইয়েহুদিত পার্টি আরবদের নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছিল। তবে প্রাথমিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, এ জোট এবার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন পেতে পারে।

আরবদের নেতৃত্বাধীন দলগুলোও নেতানিয়াহুর আরেক মেয়াদের বিরোধী। ফলে পার্লামেন্টে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সদস্যের সম্ভাব্য সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৭০। কিন্তু ইহুদিদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী চার দলের মধ্যে তিনটিই নির্বাচনি প্রচারে আরবপ্রধান দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছে। তারা সেই অবস্থানে অটল থাকলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা তাদের জন্য কঠিন হবে।

এদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা চূড়ান্ত ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতে ভোট গণনা শুরু হয়েছে। আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশে শুক্রবার পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। বুথফেরত জরিপের সঙ্গে প্রকৃত ফলাফলের পার্থক্যও প্রায়ই দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডভ ওয়াক্সম্যানও প্রাথমিক জরিপের ফল নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। ইসরায়েলের রাজনীতি ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতবিষয়ক এই বিশেষজ্ঞ আল-জাজিরাকে বলেন, জরিপের ফল সঠিক হলে নেতানিয়াহুর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে টিকে থাকা ‘প্রায় অসম্ভব’ হয়ে পড়বে।

ইসরায়েলের চ্যানেল ১৩-এর প্রক্ষেপণের বরাত দিয়ে ওয়াক্সম্যান বলেন, বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও তার ডানপন্থী ও ধর্মীয় জোটের সম্মিলিত আসনসংখ্যা কমে ২০২২ সালের নির্বাচনের ৬৪ থেকে এবার সম্ভাব্য ৫০-এ নেমে এসেছে। এতে পরবর্তী সরকার গঠন করা নেতানিয়াহুর জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।

যদিও ইসরায়েলের তিনটি প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলের জরিপেই নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এককভাবে সবচেয়ে বেশি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। দলটির সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ২৪ থেকে ২৫, যা গত নির্বাচনে পাওয়া ৩২ আসনের চেয়ে কম।

দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোতের ইয়াশার পার্টি। দলটি ২১ থেকে ২৩টি আসন পেতে পারে বলে জরিপে উঠে এসেছে। বিরোধী জোটের অংশীদারদের মধ্যে বিয়াখাদ পার্টি ১২ থেকে ১৩টি এবং আরবদের নেতৃত্বাধীন জোট ১১টি আসন পেতে পারে।

বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টি ৯ থেকে ১০টি, ডানপন্থি বিরোধী দল ইসরায়েল বেইতেনু ৭ থেকে ৮টি এবং আরেক আরবপ্রধান দল রা’আম ৭টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অতিধর্মীয় সেফারদি শাস পার্টি ৬ থেকে ৮টি এবং অতিধর্মীয় আশকেনাজি ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ৬ থেকে ৭টি আসন পেতে পারে। উগ্র ডানপন্থী ওতজমা ইয়েহুদিতের সম্ভাব্য আসন ৬ থেকে ৭টি। একই ধারার রিলিজিয়াস জায়োনিজম পার্টি পেতে পারে ৬টি আসন।

এদিকে ডানপন্থি পিপল অব ইসরায়েল, মধ্যডানপন্থি রিজার্ভিস্টস এবং অতিধর্মীয় হারেদি পাবলিক পার্টি নির্বাচনে আলোচনায় থাকলেও পার্লামেন্টে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোটের সীমা অতিক্রম করতে পারবে না বলে জরিপে ধারণা করা হয়েছে।

তবে সরকারপন্থি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের জরিপে নেতানিয়াহুর জোটের অবস্থান তুলনামূলক ভালো দেখানো হয়েছে। নেতানিয়াহুপন্থি চ্যানেল ১৪-এর জরিপে তার জোট ৬২টি, বিরোধী জোট ৪০টি এবং আরব দলগুলো ১৮টি আসন পেতে পারে বলে জানানো হয়েছে। একইভাবে নেতানিয়াহুপন্থি আই২৪ নিউজের জরিপে তার জোটের সম্ভাব্য আসন ৫৫, বিরোধীদের ৪৯ এবং আরব দলগুলোর ১৬। নতুন চ্যানেল ১৬-এর জরিপে এই সংখ্যা যথাক্রমে ৫৩, ৫১ ও ১৬।

নেতানিয়াহুর সমর্থন বাড়লেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনিশ্চিত

২০২২ সালের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট ৬৪টি আসন পেয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছিল, এবার জোটটি সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে না। নির্বাচনের আগে শেষ কয়েক সপ্তাহে নেতানিয়াহু বারবার সতর্ক করে বলেন, তিনি পরাজিত হলে ইসরায়েলের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।

এ ধরনের প্রচার তার সমর্থন কিছুটা বাড়িয়ে থাকতে পারে। তবে প্রাথমিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, সেই সুবিধা তার নিজের রাজনৈতিক শিবিরের অন্যান্য দলের আসন কমার বিনিময়ে এসেছে। তিনটি প্রধান চ্যানেলের জরিপেই কোনো পক্ষ এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। বরং বিরোধীরা সামান্য এগিয়ে রয়েছে।

জরিপের ফল প্রকাশের পর আইজেনকোত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে জনসমর্থন হারানোর দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘ইহুদিবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠ ও ইসরায়েলের অধিকাংশ নাগরিক নেতানিয়াহু সরকারকে সম্পূর্ণ অনাস্থা জানিয়েছেন।’

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, চূড়ান্ত ফল একই রকম হলে তা হবে ইসরায়েলের দায়িত্বশীল ইহুদিবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠের বিজয়।

আইজেনকোত আরও বলেন, জনগণের ইচ্ছা বাস্তবায়ন, নেতানিয়াহু সরকারকে প্রতিস্থাপন এবং বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ একটি ইহুদিবাদী সরকার গঠনে তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন।

তবে কীভাবে তিনি সরকার গঠন করবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আরবপ্রধান দলগুলোর এক বা একাধিক দলকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করে কিংবা নতুন সরকার গঠনের ভোটে তাদের বিরত থাকার ওপর নির্ভর করে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন তিনি।

কিন্তু ইসরায়েল বেইতেনুর নেতা আভিগদর লিবারম্যান এবং বিয়াখাদ পার্টির নেতা নাফতালি বেনেট আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠন না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হলে তাদের সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে হতে পারে। অবশ্য ২০২১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তারা দুজনই রা’আমকে নিয়ে গঠিত একটি স্বল্পস্থায়ী সরকারের অংশ ছিলেন।

আরব দলগুলোর ঐতিহাসিক সাফল্যের সম্ভাবনা

প্রাথমিক জরিপে সম্ভাব্য আসনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় আরবদের নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। রা’আমের নেতা মানসুর আব্বাস জানিয়েছেন, সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থার মধ্যে দুই রাজনৈতিক শিবিরের নেতারাই তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

চ্যানেল ১২-কে আব্বাস বলেন, ‘সবাই আমাদের সঙ্গে কথা বলছে।’ তার এ বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, নেতানিয়াহুপন্থি শিবিরের প্রতিনিধিরাও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

আইজেনকোতের নেতৃত্বে সরকার গঠনের বিষয়ে আগ্রহের ইঙ্গিত দিলেও আব্বাস বলেছেন, এমন জোট বাস্তবে গঠন করা সম্ভব কি না, তা আগে নিশ্চিত হতে হবে। তিনি স্বীকার করেন, বুথফেরত জরিপের হিসাবে এখনো সরকার গঠনের মতো আসনসংখ্যা নেই। জরিপে বর্তমান বিরোধীদলীয় জোট ৫২টি এবং রা’আম ৭টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের চেয়ে দুই কম।

অন্যদিকে, আরব নেতৃত্বাধীন জোটের সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, প্রধান সম্প্রচারমাধ্যমগুলোর জরিপে দলটি ১০ থেকে ১১টি আসন পেতে পারে, এমন খবরের পর সমর্থকেরা করতালি দিয়ে উল্লাস করছেন।

এ সময় আরবি ভাষায় ‘বেন গভির, চলে যাও’ স্লোগানও শোনা যায়। দলটির নেতা ইউসেফ জাবারিন এবং অন্য নেতারাও উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রীর বিরুদ্ধে স্লোগানে যোগ দেন।

সমর্থকদের উদ্দেশে জাবারিন বলেন, তাদের দল নেতানিয়াহু, অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ এবং ‘রক্তাক্ত সরকারকে’ বিদায় জানাতে চায়।

ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হয়েছে। ৭৭ শতাংশের বেশি ভোটার ভোট দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি রাতভর ভোট গণনা করে আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ করবে।

প্রাথমিক জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও বিরোধীদের সরকার গঠনের পথও সহজ নয়। কোনো পক্ষই প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে নতুন নির্বাচন আয়োজন করতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইসরায়েলে এমন রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে পাঁচবার নির্বাচন হয়েছিল।

তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স