|
| |
বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

এক চোখে আলো নেই, তবু ৪০ বছর ধরে পত্রিকা বিলি করেন ইনামুল

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:০০ এএম
২০০ পঠিত
এক চোখে আলো নেই, তবু ৪০ বছর ধরে পত্রিকা বিলি করেন ইনামুল
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
জন্ম থেকেই এক চোখ দৃষ্টিহীন। অন্য চোখেও ঝাপসা দেখেন ইনামুল হক। তবু ৪০ বছর ধরে সাইকেলে পত্রিকা বিলি করছেন তিনি। এই কাজ করেই বড় করেছেন তিন সন্তানকে।

জন্মের পর থেকেই এক চোখে দেখেন না। অন্য চোখের আলোও ঝাপসা। তবু থেমে নেই পত্রিকা বিলির কাজ। প্রতিদিন ভোরে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। এক হাতে পত্রিকার বান্ডিল আর অন্য হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল। ঘুরে ঘুরে পাঠকের বাড়িতে পৌঁছে দেন পত্রিকা। এভাবেই কেটে গেছে জীবনের ৪০টি বছর। ২৮ বছর ধরে প্রথম আলো বিলি করছেন তিনি।

বলছিলাম রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার টাঙ্গন গ্রামের ইনামুল হকের (৬২) কথা। গত সোমবার ভোরে রাজশাহী নগরের রেলগেটের গৌরহাঙ্গা এলাকায় তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তখন তিনি সংবাদপত্র এজেন্টের কাছ থেকে পত্রিকা নিচ্ছিলেন। এরপর সাইকেলে করে বিভিন্ন এলাকায় পত্রিকা বিলি করতে বের হবেন। রোদ, বৃষ্টি কিংবা শীত—কোনো কিছুই তাঁকে এ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারেনি।

একসময় প্রতিদিন প্রায় ৫০০ কপি পত্রিকা বিক্রি করতেন ইনামুল হক। এখন বিক্রি কমে দাঁড়িয়েছে ১৬০টিতে। এর মধ্যে প্রথম আলো বিক্রি করেন ৪০ থেকে ৪৫ কপি। এ কাজ করতে গিয়ে বহু মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে তাঁর।

দীর্ঘ চার দশকের পথচলায় নানা চড়াই–উতরাই দেখেছেন ইনামুল হক। এ সময়ে পাঠকের অভ্যাস বদলেছে, পাল্টেছে পত্রিকার বাজার ও বিক্রির পরিমাণ। ইন্টারনেট ও মুঠোফোনের সহজলভ্যতার কারণে অনেকে এখন অনলাইনে খবর পড়েন। তবু হাতে হাতে ছাপা পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার অভ্যাস ছাড়েননি ইনামুল হক।

নিজের চোখের সমস্যার কথা বলতে গিয়ে ছাপা পত্রিকা পড়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন ইনামুল হক। তাঁর অনুযোগ, এখনকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেকে পত্রিকা পড়েন না। বই পড়ার অভ্যাসও তেমন নেই। সবাই মুঠোফোন নিয়ে ব্যস্ত। চোখ ভালো রাখতে তরুণদের মুঠোফোন ছেড়ে পত্রিকা পড়ার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রথম আলো প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এই পত্রিকা বিলি করে আসছেন ইনামুল হক। মঙ্গলবার সকালে তোলা

নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ইনামুলের জীবন কেটেছে। আট বছর বয়সে মাকে হারিয়েছেন। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা আবার বিয়ে করেন। সৎমায়ের সংসারে নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। মানুষ হয়েছেন দাদির কাছে। দাদি নিজের খাবার থেকে আলাদা করে তাঁর জন্য খাবার রাখতেন। সেই খাবার খেয়ে বেড়ে উঠেছেন তিনি।

ইনামুল হকের পড়াশোনা শুরু রাজশাহীতে। পরে চাচার চাকরিসূত্রে বিভিন্ন জেলায় পড়েছেন। চাচার বদলির কারণে আবার রাজশাহীতে ফিরে আসেন। ভর্তি হন কাটাখালী স্কুলে। সেখান থেকেই মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর আর পড়াশোনা করা সম্ভব হয়নি। তাঁর এক চাচাতো ভাই সাংবাদিকতা করতেন। তাঁর পরামর্শে আশির দশকে অল্প কয়েকটি পত্রিকা নিয়ে বিক্রি শুরু করেন। পরে বিভিন্ন এজেন্টের কাছ থেকে পত্রিকা নিয়ে পরিধি বাড়ান। ইনামুল বলেন, ‘তখন পত্রিকা বিক্রির পাশাপাশি জমিতে ধান কাটার কাজও করতাম।’

৩০ থেকে ৩৫ বছর আগে বিয়ে করেন ইনামুল। পাঁচ বছর আগে অসুস্থতার কারণে তাঁর স্ত্রী মারা যান। তাঁদের তিন সন্তান। বড় মেয়ে রাজশাহী কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করেছেন। তাঁর বিয়ে হয়েছে। পাঁচ মাস বয়সী একটি সন্তান আছে। ছেলে নিউ ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়েছেন। ছোট মেয়ে এবার উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছেন।

ইনামুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার কিছুই ছিল না। দাদির কাছে মানুষ হয়েছি। এই পত্রিকা বিক্রি করেই তিন সন্তানকে মানুষ করেছি। পাঁচ কাঠা জমি কিনেছি; বাড়ি করেছি। এটাই আমার সম্বল।’

প্রতিদিন ভোরে রাজশাহী শহরে এজেন্টের কাছে পত্রিকা নিতে আসেন ইনামুল হক। তাঁর এক চোখ জন্ম থেকেই অন্ধ

পত্রিকা বিলি করতে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরতে হয় ইনামুলের। মটপুকুর থেকে ছোট বটতলা, বড় বটতলা, তালাইমারী, কাজলা, বিনোদপুর, মির্জাপুর, ভদ্রা, কাটাখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় পত্রিকা পৌঁছে দেন। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও তাঁর নিয়মিত যাতায়াত। সাইকেল চালিয়েই পত্রিকা বিলি করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তাঁর চারটি সাইকেল চুরি হয়েছে।

একসময় প্রতিদিন প্রায় ৫০০ কপি পত্রিকা বিক্রি করতেন ইনামুল হক। এখন বিক্রি কমে দাঁড়িয়েছে ১৬০টিতে। এর মধ্যে প্রথম আলো বিক্রি করেন ৪০ থেকে ৪৫ কপি। এ কাজ করতে গিয়ে বহু মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে তাঁর। পুরোনো পাঠকদের সঙ্গে দেখা হলে তাঁরা বিস্ময় প্রকাশ করেন। এত বছর পরও কেন একই কাজ করছেন—এটা জানতে চান। এসব কথায় কখনো আবেগাপ্লুত, কখনো কাজের প্রতি গর্ব হয় তাঁর।

তবে গাড়ি থেকে পত্রিকা আসতে দেরি হলে পাঠকেরা বিরক্ত হন। আবার পত্রিকার সংখ্যা কমে গেলেও মন খারাপ হয় তাঁর। ইনামুল বলেন, ‘গাড়ি দেরি করলে আমাদের পত্রিকা দিতে দেরি হয়। তখন অনেকে রাগ করেন। আবার দুই কপি পত্রিকা কমে গেলেও খারাপ লাগে, একটা বাড়লে ভালো লাগে।’

ছাপা পত্রিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী তিনি। তাঁর অভিজ্ঞতায়, মাঝখানে পত্রিকা বিক্রি অনেক কমে গেলেও এখন কিছুটা বাড়ছে। তবে মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি। ইনামুল জানান, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়ার পেছনে মুঠোফোনের আসক্তি একটি কারণ। এবার পরীক্ষায় পাসের হার কমার পেছনেও মুঠোফোনের ব্যবহার ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তিনি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় সাইকেলে করে পত্রিকা বিলি করেন ইনামুল হক

ইনামুলের ভাষ্য, ছাপা পত্রিকায় শিক্ষার্থীদের উপযোগী অনেক শিক্ষামূলক বিষয় প্রকাশিত হয়। অষ্টম, নবম, দশম ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এসব পড়ে উপকৃত হতে পারে। তাই মুঠোফোনের পাশাপাশি বই ও পত্রিকা পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

রাজশাহী মহানগর সংবাদপত্র শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি দুলাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রাজশাহীতে যত হকার আছেন, তাঁদের পুরোনো কয়েকজনের একজন ইনামুল। তিনি সেই চারঘাট থেকে এসে পত্রিকা বিলি করেন। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠককে এ সেবা দিয়ে আসছেন।

সূত্র: প্রথম আলো