মৃত্যুর ফেরেশতাও কেন থামলেন খায়ের আন-নাসসাজের কথায়
গণমাধ্যম ডেক্স
দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীর মরমি কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তারের তাজকিরাত আল-আউলিয়া ফারসি ভাষায় রচিত সুফিদের জীবনীভিত্তিক একটি আকরগ্রন্থ। বাংলায় এর আক্ষরিক অর্থ ‘সাধুদের স্মরণগ্রন্থ’। মূল বইটির পরিসর অনেক বিস্তৃত, কিন্তু ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ এবং তাসাউফ ও ফারসি সাহিত্যের পণ্ডিত এ জে আরবেরি (১৯০৫–১৯৬৯) এই বইটির একটি অ্যাব্রিজড বা সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রকাশ করেছেন। মুসলিম সেইন্টস অ্যান্ড মিস্টিকস নামের গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে, রাউটলেজ অ্যান্ড কেগান পল ও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে। বর্তমান অনুবাদের ভিত্তি ২০০০ সালে আইওয়ার এইমসভিত্তিক প্রকাশনা ওমফালোস্কেপসিস সংস্করণ। বইটিতে ৩৮টি পর্বে ভাগ করে সুফিসাধক ও তাঁদের জীবনের নানা অতিলৌকিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন আরবেরি। এর একটি পর্ব ইরাকের ঐতিহাসিক শহর সামাররার প্রখ্যাত সুফিসাধক খায়ের আন-নাসসাজের নামে। সেখান থেকে এই পর্ব মূলানুগ অনুবাদ করেছেন রাব্বী আহমেদ। এটি সুফি আখ্যানভিত্তিক সাহিত্যিক বয়ান; এতে বর্ণিত অলৌকিক ঘটনাগুলো ঐতিহাসিকভাবে সর্বসম্মত বা ধর্মীয়ভাবে সর্বজনস্বীকৃত নয়।
সামাররার অধিবাসী আবুল হাসান মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল (খায়ের ইবনে আবদুল্লাহ) আল-নাসসাজ ছিলেন সারি আল-সাকাতির শিষ্য এবং আল-জুনায়েদের (জুনায়েদ বাগদাদী) ঘনিষ্ঠ পরিমণ্ডলের একজন সদস্য। তাঁকে একসময় দাস হিসেবে বসরায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল; পরবর্তীকালে তিনি মক্কায় গমন করেন। বলা হয়ে থাকে, তিনি ১২০ বছর বয়স পর্যন্ত জীবিত ছিলেন এবং ৩২২ হিজরিতে (৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ) মৃত্যুবরণ করেন।
খায়ের-ই নাসসাজের কাহিনি
খায়ের-ই নাসসাজ ছিলেন তাঁর সময়ের প্রধান শায়খ। তিনি সারি-ই সাকাতির একজন শিষ্য ছিলেন; এবং শিবলী ও ইব্রাহিম-ই খাওয়াসকে প্রভাবিত করেছিলেন। জুনায়েদও তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। তাঁকে যে কারণে ‘খায়ের-ই নাসসাজ’ ডাকা হতো, তা ছিল এই—
হজের উদ্দেশ্যে নিজ শহর সামাররা ত্যাগ করে তিনি পথিমধ্যে কুফার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন। জোড়াতালি দেওয়া একটি জোব্বা গায়ে তিনি কুফার ফটকে উপস্থিত হলেন, আর তাঁর গায়ের রংও ছিল কালো। যে-ই তাঁকে দেখত সে-ই বলে উঠত, ‘লোকটাকে তো একটা আহাম্মক বলে মনে হচ্ছে!’ সেখানে জনৈক ব্যক্তি তাঁর ওপর নজর দিল।
‘আমি তাকে কয়েক দিনের জন্য নিযুক্ত করব,’ লোকটি মনে মনে বলল। এরপর সে তাঁর দিকে এগিয়ে গেল। ‘তুমি কি একজন দাস?’ সে জিজ্ঞেস করল। ‘হ্যাঁ,’ তিনি জবাব দিলেন। ‘তুমি কি তোমার মালিকের কাছ থেকে পালিয়ে এসেছ?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘তোমার মালিকের কাছে তোমাকে ফিরিয়ে দেওয়ার আগপর্যন্ত আমি তোমার দায়িত্ব নেব,’ লোকটি বলল। ‘আমি নিজেও তো সেটাই খুঁজছি,’ খায়ের বললেন। ‘সারাটা জীবন আমি এমন একজনকে খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করে এসেছি, যিনি আমাকে আমার প্রভুর কাছে ফিরিয়ে দেবেন।” লোকটি তাঁকে নিজ গৃহে নিয়ে গেল। ‘তোমার নাম খায়ের,’ সে বলল।
খায়ের তাঁর কথার প্রতিবাদ করলেন না, কারণ তিনি দৃঢ়ভাবে এই বাণীতে বিশ্বাস করতেন, ‘একজন মুমিন মিথ্যা বলে না’। তিনি লোকটির সঙ্গে গেলেন আর তার খেদমত করলেন। লোকটি খায়েরকে বয়নশিল্প শেখাল। বছরের পর বছর তিনি ওই লোকের অধীনে কাজ করলেন। যখনই সে ডাক দিত, ‘খায়ের!’ তিনি জবাব দিতেন, ‘এই যে আমি হাজির!’ শেষ পর্যন্ত খায়েরের একনিষ্ঠতা, নিখুঁত আচরণ, স্বজ্ঞাগত শক্তি, আর তাঁর নিরবচ্ছিন্ন ইবাদত প্রত্যক্ষ করে লোকটি অনুতপ্ত হলো।
‘আমি একটা ভুল করেছিলাম,’ সে ঘোষণা করল। ‘তুমি আমার দাস নও। তুমি যেখানে ইচ্ছা, সেখানে যাও৷’ এরপর খায়ের মক্কার উদ্দেশে রওনা হলেন, সেখানে তিনি এমন উচ্চ মর্যাদার বুজুর্গি অর্জন করলেন যে স্বয়ং জুনায়েদ ঘোষণা করলেন, ‘আমাদের মধ্যে খায়েরই শ্রেষ্ঠ।’ তিনি চাইতেন লোকেরা তাঁকে খায়ের নামেই ডাকুক। ‘একজন মুসলিম ভাই আমাকে একটা নাম দিয়েছেন,’ তিনি বলতেন, ‘আর আমি সেটা পরিবর্তন করব, তা ঠিক হবে না।’
‘আমি একটা ভুল করেছিলাম,’ সে ঘোষণা করল। ‘তুমি আমার দাস নও। তুমি যেখানে ইচ্ছা, সেখানে যাও৷’ এরপর খায়ের মক্কার উদ্দেশে রওনা হলেন, সেখানে তিনি এমন উচ্চ মর্যাদার বুজুর্গি অর্জন করলেন যে স্বয়ং জুনায়েদ ঘোষণা করলেন, ‘আমাদের মধ্যে খায়েরই শ্রেষ্ঠ।’ তিনি চাইতেন লোকেরা তাঁকে খায়ের নামেই ডাকুক। ‘একজন মুসলিম ভাই আমাকে একটা নাম দিয়েছেন,’ তিনি বলতেন, ‘আর আমি সেটা পরিবর্তন করব, তা ঠিক হবে না।’
মাঝেমধ্যে তিনি বয়নের কাজ করতেন। কখনো কখনো তিনি টাইগ্রিস (দজলা) নদীর তীরে নেমে যেতেন, আর মাছেরা তাঁর কাছে এগিয়ে আসত এবং তাঁকে নানা জিনিস এনে দিত৷ একদিন তিনি এক বৃদ্ধার জন্য মসলিন বুনছিলেন। বৃদ্ধা বললেন, ‘আমি যদি একটি দিরহাম নিয়ে আসি আর তোমাকে এখানে না পাই, তবে এটা আমি কাকে দেব?’ ‘নদীতে ফেলে দিয়ো,’ খায়ের উত্তর দিলেন। বৃদ্ধা দিরহামটি নিয়ে এলেন, আর খায়েরকে সেখানে না পেয়ে তিনি সেটা টাইগ্রিস নদীতে ফেলে দিলেন। খায়ের যখন নদীর তীরে ফিরলেন, তখন মাছেরা সেই দিরহামটি তাঁর কাছে নিয়ে এল।
বলা হয়ে থাকে, খায়ের ১২০ বছর বয়স পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। যখন তাঁর মৃত্যু ঘনিয়ে এল, তখন সন্ধ্যার নামাজের সময়। মৃত্যুর ফেরেশতা (আজরাইল) তাঁর ছায়া ফেললেন, আর খায়ের বালিশ থেকে তাঁর মাথা তুললেন। ‘আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করুন!’ তিনি বলে উঠলেন। ‘একটু অপেক্ষা করো। তুমি আদেশাধীন একজন গোলাম, আর আমিও আদেশাধীন একজন গোলাম। তোমাকে আমার রুহ কবজ করতে বলা হয়েছে। আমাকে বলা হয়েছে, ‘যখন নামাজের সময় হবে, নামাজ কায়েম করো।’ সেই সময় এখন উপস্থিত। তোমার আদেশ পালনের জন্য প্রচুর সুযোগ থাকবে। কিন্তু আমার জন্য এখনই একমাত্র সুযোগ, নয়তো আর নয়। দয়া করে ধৈর্য ধরো, যতক্ষণ না আমি মাগরিবের নামাজ পড়া শেষ করি।’ এরপর খায়ের অজু করলেন এবং নামাজ আদায় করলেন। এর ঠিক পরপরই তিনি মারা গেলেন।
বলা হয়ে থাকে, খায়ের ১২০ বছর বয়স পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। যখন তাঁর মৃত্যু ঘনিয়ে এল, তখন সন্ধ্যার নামাজের সময়। মৃত্যুর ফেরেশতা (আজরাইল) তাঁর ছায়া ফেললেন, আর খায়ের বালিশ থেকে তাঁর মাথা তুললেন। ‘আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করুন!’ তিনি বলে উঠলেন। ‘একটু অপেক্ষা করো। তুমি আদেশাধীন একজন গোলাম, আর আমিও আদেশাধীন একজন গোলাম। তোমাকে আমার রুহ কবজ করতে বলা হয়েছে। আমাকে বলা হয়েছে, ‘যখন নামাজের সময় হবে, নামাজ কায়েম করো।’ সেই সময় এখন উপস্থিত।
অনুবাদকের নোট:
খায়ের-ই নাসসাজের জীবন ও তাঁকে ঘিরে প্রচলিত ঘটনাবলি সম্পর্কে ইতিহাসবিদ, জীবনীকার ও সুফিসাধকদের মধ্যে নানা মত ও পর্যবেক্ষণ রয়েছে। প্রসিদ্ধ সূত্র অনুযায়ী, তিনি হিজরি তৃতীয় ও চতুর্থ শতকের বাগদাদকেন্দ্রিক সুফিধারার অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন—সারি আল-সাকাতির শিষ্য, জুনায়েদ বাগদাদীর সমকালীন ও গভীরভাবে শ্রদ্ধাভাজন, যাঁর প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মের সাধক হজরত শিবলীর ওপরও পড়েছিল। অন্যায়ভাবে দাস হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পরও নীরব আনুগত্য স্বীকার এবং জীবনের শেষ মুহূর্তে নামাজের জন্য মৃত্যুর ফেরেশতাকে থামিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো সুফি ঐতিহ্যে তাঁর চরিত্রকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। তবে সুফি সাহিত্যে খায়ের-ই নাসসাজ মূলত বিনয়ের চরম উৎকর্ষ, ঐশ্বরিক হুকুমের প্রতি অবিচল একনিষ্ঠতা এবং পরম প্রভুর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের প্রতীক হিসেবেই চিরস্মরণীয়। ফরিদ উদ্দিন আত্তারের ধ্রুপদি সুফি আখ্যান অবলম্বনে অনূদিত এই লেখাটিকে কঠোর ঐতিহাসিক বা তথ্যভিত্তিক মাপকাঠিতে বিচার না করে, হ্যাজিওগ্রাফি বা সাধকচরিত সাহিত্যের আধ্যাত্মিক ও নন্দনতাত্ত্বিক পরিসরে পাঠ করাই সমীচীন।
সূত্র: প্রথম আলো