টেকেরহাটের শেষ সিনেমা হলও কি বন্ধের পথে, বাঁচাতে কী টোটকা দিলেন মালিক?
গণমাধ্যম ডেক্স
একসময় দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা-উপজেলায় ছিল সিনেমা হল। রুপালি পর্দার টানে দর্শকের ভিড় লেগে থাকত প্রেক্ষাগৃহগুলোতে। সময়ের সঙ্গে একে একে বন্ধ হয়েছে অসংখ্য সিনেমা হল। এখন দেশের অধিকাংশ জেলাতেই নেই মানসম্মত কোনো প্রেক্ষাগৃহ। সেই সংকটের বাস্তব চিত্র মাদারীপুরের টেকেরহাটেও। বন্ধ হতে হতে সেখানে এখন টিকে আছে মাত্র একটি সিনেমা হল ‘সোনালী’। মানসম্মত সিনেমার সংকট, দর্শক খরা ও ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপে কোনোমতে সচল রয়েছে চার দশকের পুরোনো এই প্রেক্ষাগৃহটি। শুক্রবার দুপুরে চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে আলাপকালে সোনালী সিনেমা হলের মালিক রুহুল খান জানালেন, ২০২৭ সাল পর্যন্ত হলটি চালিয়ে দেখতে চান তিনি। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এরপর ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবছেন। টেকেরহাটের ছোট বন্দরের পাশে অবস্থিত সোনালী সিনেমা হলে আসন রয়েছে ৬০০টি। প্রায় ৪০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই হলটির মাসিক ভাড়া ১৫ হাজার টাকা। বিদ্যুৎ বিল, কর্মীদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি মাসে ব্যয় হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। অথচ বছরে দুই ঈদ ছাড়া অধিকাংশ সময়ই সেই খরচ ওঠানো সম্ভব হয় না। রুহুল খান বলেন, ৮ বছর হলো আমি হলটির ভাড়াটিয়া মালিক। ২০৩০ সাল পর্যন্ত লিজ নেওয়া আছে। অনেকে দুই ঈদে হল চালু রাখলেও আমার হল সারাবছরই চালু থাকে। কিন্তু ভালো নতুন সিনেমার অভাবে এই সপ্তাহে মান্নার ‘বোমা হামলা’ চালাচ্ছি। করোনার পর থেকেই সিনেমা হল ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। সত্যি বলতে, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আমাদের। সরকার যদি এদিকে সুনজর না দেন, সিনেমা হলগুলো একে একে বিলীন হয়ে যাবে। ঈদ এলেই সিনেমা হলের ব্যবসা ভালো হবে, এমন নিশ্চয়তাও এখন আর নেই। রুহুল খানের ভাষ্য, চলতি বছরে ‘প্রিন্স’ ও ‘রকস্টার’ দিয়ে দুই ঈদেই লোকসান গুনতে হয়েছে তাদের। তবে এর আগে ‘প্রিয়তমা’, ‘তুফান’, ‘বরবাদ’ ও ‘তাণ্ডব’ চালিয়ে লাভের মুখ দেখেছিলেন। শাকিব খানের সিনেমার বাইরে ‘হাওয়া’ ও ‘পরাণ’ও মোটামুটি ব্যবসা করেছে। করোনার আগে ‘ভাইজান এলো রে’ ও ‘পাসওয়ার্ড’ সিনেমা দুটি বেশ ভালো ব্যবসা করেছিল। তবে ‘তাণ্ডব’-এর পর থেকে আর ব্যবসা নেই বললেই চলে বলে জানান তিনি। সিনেমা হলের সঙ্গে রুহুল খানের সম্পর্ক কেবল ব্যবসায়িক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক স্মৃতিও। তার বাবাও সিনেমা হল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাবাকে দেখেই ছোটবেলা থেকে এই পেশায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। সেই ভালোবাসা থেকেই নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এখনও হলটি চালিয়ে যাচ্ছেন। রুহুল খান বলেন, ‘বাবার দেখাদেখি ছোটবেলা থেকেই এই ব্যবসায় জড়িয়েছি। সেই ভালোবাসার জায়গা থেকেই এখনও চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এভাবে আর কত! তবুও আশায় আছি, সামনে সিনেমার সুদিন আসবে।’ তবে সেই সুদিন ফেরাতে কী প্রয়োজন, সে বিষয়ে নিজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে একটি পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। রুহুল খানের মতে, শাকিব খান বছরে চারটি সিনেমা করলে দেশের সিনেমা হলগুলো অনেকটাই ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তার ভাষায়, সিনেমা হল মালিকদের বড় ভরসার নাম এখন শাকিব খান। তিনি বলেন, ‘আমাদের সুপারস্টার শাকিব খান যদি বছরে চারটি সিনেমা করেন (দুই ঈদে দুটি এবং ঈদের বাইরে দুটি) তাহলে দেশের হলগুলো টিকে থাকবে। শুধু ঈদকেন্দ্রিক সিনেমা হলে হবে না, ঈদের বাইরেও ভালো সিনেমা মুক্তি দিতে হবে। বছরে শাকিব খানের চারটি সিনেমার পাশাপাশি অন্যদের মিলিয়ে আরও ৮০-১০০টি সিনেমা হলে ব্যবসা করা সম্ভব।’ দেশে নিয়মিত সিনেমা মুক্তির পাশাপাশি ভারতীয় সিনেমা আমদানি এবং যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র বাড়ানোর পক্ষেও মত দিয়েছেন এই হল মালিক। তার মতে, দর্শকের সামনে সিনেমার বিকল্প যত বাড়বে, প্রেক্ষাগৃহে আসার আগ্রহও তত তৈরি হবে। রুহুল খান বলেন, ‘মানুষ ঘরে বসেই বিশ্বের সব দেশের সিনেমা দেখতে পারছে। তাহলে সিনেমা হলে মুক্তি দিতে সমস্যা কোথায়? যৌথ প্রযোজনায় সিনেমা হলেও দর্শক সেসব দেখতে হলে আসবে। আগেও এর প্রমাণ আমরা পেয়েছি। এখন এ ছাড়া আর উপায় নেই।’ অন্যদিকে, সিঙ্গেল স্ক্রিনে ব্যবসা হলেও প্রযোজকদের পক্ষ থেকে আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সিনেমা হলের পরিবেশ নিয়েও দর্শক ও সংশ্লিষ্টদের নানা আপত্তি রয়েছে। তবে সোনালী সিনেমা হলের মালিকের দাবি, সব সমস্যার মূলে পরিবেশ নয়, বরং মানসম্মত সিনেমার অভাব। ভালো সিনেমা মুক্তি পেলে দর্শক এখনও প্রেক্ষাগৃহে আসেন বলেই মনে করেন তিনি। রুহুল খান বলেন, ‘করোনার পর ‘প্রিয়তমা’, ‘বরবাদ’, ‘তুফান’ যতগুলো সিনেমা সুপারহিট হয়েছে, তখন দর্শকরা কোনো অভিযোগ করেনি। আমরা এককালীন কয়েক লাখ টাকা দুই সপ্তাহের জন্য যে টেবিল মানি দিয়েছি সেটা সিনেপ্লেক্স দেয় না। কিছু সিনেপ্লেক্সের পরিবেশ তো অনেক ভালো, তারপরও কেন সেখানে দর্শক যাচ্ছে না? আসলে আমাদের মানসম্মত সিনেমা নেই। দর্শকদের পছন্দমতো সিনেমা এলে পরিবেশ কোনো ব্যাপার নয়। ভালো সিনেমা পেলে আমরাও পরিবেশ ঠিক করতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সারাবছর লাভের মুখ দেখি না। তাহলে দুই ঈদে যে সামান্য লাভ বা লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাই, সেটা দিয়ে কি সিনেমা হলের পরিবেশ ঠিক করব, নাকি হলটা টিকিয়ে রাখব—সেটাও ভাবতে হবে।’ চার দশক ধরে অসংখ্য সিনেমার প্রদর্শনী, দর্শকের উচ্ছ্বাস আর সময়ের পরিবর্তনের সাক্ষী সোনালী সিনেমা হল। অথচ এখন সেই হলই টিকে থাকার লড়াই করছে। রুহুল খানের চোখে এখনও সিনেমার সুদিন ফেরার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তব হবে কি না, তা নির্ভর করছে নতুন সিনেমার নিয়মিত মুক্তি, দর্শকের হলমুখী হওয়া এবং সংশ্লিষ্টদের কার্যকর উদ্যোগের ওপর। নইলে টেকেরহাটের সোনালীর আলোও হয়তো একদিন নিভে যাবে।