জাতীয় জিডিপিতে চট্টগ্রামের অবদান ৪০ শতাংশ: আমিরুল হক
গণমাধ্যম ডেক্স
প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম
চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং নগর উন্নয়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘চট্টগ্রাম: ইকোনমিক গেটওয়ে অ্যান্ড লাইফলাইন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) নগরের আগ্রাবাদে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সম্মেলনকক্ষে কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশ...
চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং নগর উন্নয়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘চট্টগ্রাম: ইকোনমিক গেটওয়ে অ্যান্ড লাইফলাইন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) নগরের আগ্রাবাদে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সম্মেলনকক্ষে কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ চ্যাপ্টার আয়োজিত এ সেমিনারে চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অবদান ও সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি বন্দর ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বাণিজ্যিক রাজধানী প্রতিষ্ঠা এবং নগর সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন অতিথি বক্তারা।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক। তিনি বলেন, জাতীয় জিডিপিতে চট্টগ্রামের অবদান প্রায় ৪০ শতাংশ। জাতীয় শিল্প উৎপাদনের প্রায় ২২ শতাংশ এবং মোট রাজস্ব সংগ্রহের ২২ শতাংশের বেশি আসে এ অঞ্চল থেকে। দেশের সমুদ্রপথে আমদানি-রপ্তানি হওয়া পণ্যের ৯২ শতাংশের বেশি পরিবাহিত হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। অর্থনীতিতে এত বড় অবদান থাকলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতায় চট্টগ্রামের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
চট্টগ্রামকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তুলতে সড়ক, রেল ও নৌপথের সমন্বয়ে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার তাগিদ দেন তিনি। ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াতের সময় কমিয়ে আনা, আট লেনের মহাসড়ক, দ্বিতীয় এক্সপ্রেসওয়ে, উচ্চগতির বৈদ্যুতিক ট্রেন এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরকেন্দ্রিক নতুন যোগাযোগ করিডর নির্মাণের প্রস্তাবও তুলে ধরেন।
বন্দর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের প্রস্তাব
চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে শুধু বন্দরের আধুনিকায়ন যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে আমিরুল হক বলেন, পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে কাস্টমস ছাড়, সড়ক-রেল যোগাযোগ এবং বন্দর ব্যবস্থাপনা; পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে সাজাতে হবে।
এ জন্য সড়ক, রেল ও নৌপথের সমন্বয়ে মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি। কক্সবাজার-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে পর্যাপ্ত কার্গো ট্রেন চালুর পাশাপাশি কক্সবাজার থেকে ঢাকা পর্যন্ত অন্তত একটি উচ্চগতির বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর কথা বলেন। তার মতে, বুলেট ট্রেন না হলেও দ্রুতগতির বৈদ্যুতিক রেল যোগাযোগ দেশের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমাতে ভূমিকা রাখবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে ল্যান্ডলর্ড কনসেপ্ট অনুসরণ এবং পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেমের আওতায় কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব দেন তিনি। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, সব কার্গো ও কনটেইনার আইসিডি বা সিএফএসে পাঠিয়ে সেখানে অ্যাসেসমেন্ট, ডেলিভারি ও স্টাফিং সম্পন্ন করা যেতে পারে। এতে বন্দরের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি পণ্য খালাসের কার্যক্রম আরও কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে কাস্টমসের অ্যাসেসমেন্ট ও ক্লিয়ারিং প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ফেসলেস এবং পেপারলেস করার ওপর গুরুত্ব দেন মোহাম্মদ আমিরুল হক। অর্থাৎ বন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহন ও খালাসে প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
ঢাকা-চট্টগ্রাম দূরত্ব কমাতে বড় অবকাঠামো পরিকল্পনা
চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে যোগাযোগ অবকাঠামোর আমূল পরিবর্তনের কথা বলেন চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক। তার প্রস্তাবনায় রয়েছে ঢাকা থেকে লাকসাম হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ডাবল ট্র্যাক ও ডুয়াল গেজের রেল কর্ডলাইন নির্মাণ। পাশাপাশি বিদ্যমান ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথকে ডাবল ট্র্যাক ও ডুয়াল গেজে রূপান্তরের প্রস্তাবও দেন তিনি।
সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক কমপক্ষে আট লেনে উন্নীত করার পাশাপাশি দ্বিতীয় একটি এক্সপ্রেসওয়ে অথবা অন্তত ছয় লেনের এলিভেটেড সড়ক নির্মাণের কথা বলেন। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ককে ডাবল ট্র্যাক ও ডুয়াল গেজে উন্নীত করার প্রস্তাবও রয়েছে তার পরিকল্পনায়।
এ ছাড়া মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে কর্ণফুলী টানেল হয়ে লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জের মধ্য দিয়ে ঢাকা পর্যন্ত একটি ডেডিকেটেড মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব দেন আমিরুল হক। চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের বিদ্যমান সড়ক ও রেলপথ মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
উন্নয়নের বাধা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা
বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামোর পাশাপাশি চট্টগ্রাম মহানগরের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন। তার মতে, নগরের উন্নয়ন ও নাগরিক সেবায় যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় পরিকল্পিত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নগর সরকার প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বিপুল সম্ভাবনা এ নগরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। কিন্তু প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনসহ নগরের উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিত প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনার প্রস্তাব দেন তিনি। তার বক্তব্য, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আইনগত দায়িত্ব বজায় রেখেই সমন্বিত পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব।
নগর উন্নয়নের বিচ্ছিন্ন পরিকল্পনার উদাহরণ তুলে ধরে চসিক প্রশাসক বলেন, সড়ক নির্মাণ করবে একটি প্রতিষ্ঠান, পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব অন্য প্রতিষ্ঠানের, ভূমি ব্যবস্থাপনা থাকবে আরেক প্রতিষ্ঠানের অধীনে, আবার যানবাহন ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করবে পৃথক সংস্থা। এভাবে সমন্বয়হীনভাবে কাজ করলে আধুনিক নগর গড়ে তোলা সম্ভব নয়। চট্টগ্রামকে নান্দনিক, পরিচ্ছন্ন, সবুজ, স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও স্মার্ট নগরে রূপান্তর করতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বাণিজ্যিক রাজধানীর স্বীকৃতি, বাস্তবায়ন কোথায়?
চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠার পুরোনো উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের মতো অবকাঠামো প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চট্টগ্রামের অবস্থান শক্তিশালী করার প্রচেষ্টাও ছিল। ২০০৪ সালের দিকে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হলেও পরবর্তী সময়ে পরিকল্পনাগুলো প্রত্যাশিত গতিতে বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হবে, অথচ দেশের অধিকাংশ আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত রাজধানীকেন্দ্রিক থাকবে—এভাবে প্রকৃত অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
চট্টগ্রামে ব্যাংক, বিমা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সেবার কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপর জোর দেন তিনি। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতিও উপকৃত হবে বলে মন্তব্য করেন।
চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে প্রশাসক পর্যটন, বাণিজ্যিক শিল্প, চামড়াশিল্প ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির মতো নতুন খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রবন্দর, যোগাযোগব্যবস্থা ও শিল্পায়নের সম্ভাবনা এসব খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, নীতিগত সহায়তা ও দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অভাবে এসব সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
সেমিনারে সংগঠনের সভাপতি পারভিন এফ চৌধুরী সভাপতিত্ব করেন। বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ওসমান গণি মনসুর।
সেমিনারে বক্তারা চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দেশের প্রধান শহরগুলোর মধ্যে উন্নত ও দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াতের সময় প্রায় দুই ঘণ্টায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন, গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও সেবাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম রাজধানীর বাইরে সম্প্রসারণ এবং শিল্প-বাণিজ্যবান্ধব পরিকল্পিত নগরায়ণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তারা।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চট্টগ্রামের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করতে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত পণ্য পরিবহন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
সূত্র: কালবেলা