কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে প্রথম ৫ মিনিটে যা করবেন
গণমাধ্যম ডেক্স
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট কাউকে দেখলে তাঁকে বাঁচাতে দ্রুত এগিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করে আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে উদ্ধার করতে গিয়ে নিজেও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হতে পারেন। তাই প্রথমেই নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বিদ্যুতের উৎস বন্ধ করতে হবে। এরপর আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা, জরুরি সহায়তা নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে সিপিআর শুরু করা জরুরি। চিকিৎসকদের মতে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর প্রথম কয়েক মিনিটে সঠিক পদক্ষেপ আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারতীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম অনলি মাই হেলথ-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কেআইএমএস হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক অধ্যাপক ডা. এস এম ফায়াজের বক্তব্যের ভিত্তিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর প্রথম পাঁচ মিনিটে করণীয় তুলে ধরা হয়েছে। এতে প্রথমে ঘটনাস্থল নিরাপদ করা, বিদ্যুতের সংযোগ বন্ধ, জরুরি সহায়তা নেওয়া এবং আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রথম মিনিট: নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন
কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে প্রথমেই তাঁকে সরাসরি স্পর্শ করবেন না। আক্রান্ত ব্যক্তি যদি তখনো বিদ্যুতের সংস্পর্শে থাকেন, তাকে ধরলে বিদ্যুৎ উদ্ধারকারীর শরীরেও প্রবাহিত হতে পারে। বিশেষ করে ভেজা মেঝে, পানি কিংবা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ঝুঁকি আরও বেশি।
প্রথমে নিরাপদ দূরত্বে থেকে বিদ্যুতের উৎস শনাক্ত করুন। ঘরের বৈদ্যুতিক সংযোগ হলে দ্রুত মেইন সুইচ বা সার্কিট ব্রেকার বন্ধ করুন। সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রের প্লাগ খুলে দিন। তবে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করার সময় নিজেকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবেন না।
দ্বিতীয় মিনিট: বিদ্যুতের উৎস থেকে আলাদা করুন
মেইন সুইচ বন্ধ করা সম্ভব না হলে এবং ঘটনাটি সাধারণ গৃহস্থালি বিদ্যুতের ক্ষেত্রে হলে, নিরাপদ পরিস্থিতিতে শুকনো কাঠ বা শক্ত প্লাস্টিকের মতো বিদ্যুৎ অপরিবাহী বস্তু দিয়ে বিদ্যুতের উৎস আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে সরানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। এ সময় নিজের শরীর বা হাত দিয়ে তাঁকে স্পর্শ করা যাবে না। ধাতব বস্তু, ভেজা কাপড় কিংবা পানি ব্যবহার করা যাবে না।
তবে বিদ্যুতের খুঁটি, ছিঁড়ে পড়া তার বা উচ্চ ভোল্টেজের লাইনের ঘটনায় কাছে যাওয়া কিংবা কাঠের লাঠি দিয়ে কাউকে সরানোর চেষ্টা করাও বিপজ্জনক। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিরাপদ দূরত্বে থেকে অন্যদের সরিয়ে দিতে হবে এবং বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে।
তৃতীয় মিনিট: জরুরি সহায়তা নিন
বিদ্যুতের সংস্পর্শ থেকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিরাপদে আলাদা করার পর দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিন। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে সহায়তা চাইতে পারেন। সম্ভব হলে আশপাশের কাউকে ফোন করতে বলুন, যাতে আপনি আক্রান্ত ব্যক্তির পাশে থাকতে পারেন।
আক্রান্ত ব্যক্তি অচেতন হলে, শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, শরীরে পোড়া ক্ষত দেখা গেলে কিংবা বুক ধড়ফড়, খিঁচুনি বা অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
চতুর্থ মিনিট: সাড়া ও শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করুন
বিদ্যুতের সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আক্রান্ত ব্যক্তির সাড়া আছে কি না দেখুন। কথা বলে বা কাঁধে আলতো স্পর্শ করে সাড়া পাওয়ার চেষ্টা করুন। এরপর বুক ওঠানামা করছে কি না এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছেন কি না পরীক্ষা করুন।
আক্রান্ত ব্যক্তি অচেতন হলেও স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিলে তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ করুন। ঘাড় বা মেরুদণ্ডে আঘাতের আশঙ্কা থাকলে অপ্রয়োজনে নড়াচড়া করাবেন না। তবে শ্বাসনালি সচল রাখা জরুরি হলে জরুরি সেবার নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
পঞ্চম মিনিট: প্রয়োজন হলে সিপিআর শুরু করুন
আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে দ্রুত সিপিআর শুরু করতে হবে। প্রশিক্ষণ থাকলে বুকের মাঝখানে দুই হাত রেখে প্রতি মিনিটে ১০০ থেকে ১২০ বার গতিতে বুকে চাপ দিতে হবে। প্রশিক্ষণ না থাকলে জরুরি সেবার ফোনে থাকা কর্মীর নির্দেশনা অনুসরণ করুন। কাছাকাছি অটোমেটেড এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর (এইডি) থাকলে সেটির নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করা যেতে পারে। চিকিৎসা সহায়তা না আসা পর্যন্ত সিপিআর চালিয়ে যেতে হবে।
বাইরে ক্ষত না থাকলেও বিপদ কাটে না
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর শরীরে পোড়া দাগ না থাকলেও ভেতরে গুরুতর ক্ষতি হতে পারে। বিদ্যুৎ শরীরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলে হৃদ্যন্ত্রের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত, শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, পেশি ও স্নায়ুর ক্ষতি এবং অভ্যন্তরীণ পোড়া ক্ষত তৈরি হতে পারে। কখনো কখনো আক্রান্ত ব্যক্তিকে বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও হৃদ্স্পন্দনে অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মায়ো ক্লিনিকের প্রাথমিক চিকিৎসাবিষয়ক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর শরীরে দৃশ্যমান ক্ষত না থাকলেও অভ্যন্তরীণ ক্ষতি বা হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা হতে পারে। তাই বিদ্যুতের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তির চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে অজ্ঞান হওয়া, শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা, হৃদ্স্পন্দনে অস্বাভাবিকতা, খিঁচুনি বা পোড়া ক্ষত থাকলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
পোড়া ক্ষত থাকলে সেটি ঘষাঘষি করা, ফোসকা ফাটানো কিংবা তেল, মলম বা টুথপেস্ট লাগানো উচিত নয়। ক্ষত পরিষ্কার ও শুকনো কাপড় বা জীবাণুমুক্ত গজ দিয়ে আলতোভাবে ঢেকে রাখতে হবে। পোড়া জায়গায় আটকে থাকা কাপড় টেনে সরানো যাবে না।
যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে উদ্ধারের সময় কয়েকটি ভুল পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। যেমন:
- বিদ্যুতের সংযোগ বন্ধ না করে আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করা।
- ভেজা হাত, পানি বা ধাতব বস্তু দিয়ে তাঁকে সরানোর চেষ্টা করা।
- উচ্চ ভোল্টেজের তারের কাছে যাওয়া বা নিজে থেকে তার সরানোর চেষ্টা করা।
- আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে কথা বলছেন বা হাঁটছেন বলে চিকিৎসার প্রয়োজন নেই মনে করা।
- অচেতন ব্যক্তিকে জোর করে পানি, খাবার বা ওষুধ খাওয়ানো।
- শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলেও চিকিৎসা সহায়তা নিতে দেরি করা।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি), মায়ো ক্লিনিক এবং যুক্তরাজ্যের এনএইচএসের নির্দেশনাতেও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে স্পর্শের আগে বিদ্যুতের উৎস বিচ্ছিন্ন করা, নিরাপদে উদ্ধার করা এবং শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তিকে উদ্ধারের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, প্রথমে নিজের নিরাপত্তা, এরপর বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং তারপর আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া। দ্রুত ও সঠিক পদক্ষেপ যেমন একজনের জীবন বাঁচাতে পারে, তেমনি অসতর্কতা উদ্ধারকারীকেও বিপদের মুখে ফেলতে পারে।
তথ্যসূত্র: অনলি মাই হেলথ, মায়ো ক্লিনিক ও সিডিসি
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স