|
| |
বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

কেউ লাইন ভেঙে সামনে চলে এলে কী বলবে

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:০০ পিএম
২৫২ পঠিত
কেউ লাইন ভেঙে সামনে চলে এলে কী বলবে
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
নিয়ম ভেঙে যে সামনে চলে এসেছে, তাকে কিছু বলার আগে একটু ভেবে দেখা দরকার। এতে তোমার আদতে কী লাভ হবে? তুমি কি নিজের হারিয়ে যাওয়া জায়গাটি ফিরে পেতে চাও, নাকি শুধু প্রতিশোধ নিতে চাও?

তুমি ২০ মিনিট ধরে একটা খাবার কেনার লাইনে দাঁড়িয়ে আছ। খিদের চোটে তোমার পেট চোঁ চোঁ করছে। পছন্দের খাবারটি তোমার হাতে আসার ঠিক আগমুহূর্তে তুমি দেখলে সেটি শেষ হয়ে যাওয়ার অবস্থায়। অথবা কোনো কনসার্টের গেটের বাইরে ছয় ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছ, যাতে সামনের সারিতে গিয়ে নিজের প্রিয় ব্যান্ডকে একদম সামনে থেকে দেখতে পারো।

ঠিক তখনই দেখলে, এক অচেনা মানুষ কোনো নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে সোজা এসে তোমার সামনে লাইনে ঢুকে পড়ল। তার কাণ্ড দেখে মনে হবে, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা তোমরা সবাই বুঝি কোনো কাজ না পেয়ে শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছ।

যারা এভাবে নিয়ম ভেঙে সামনে চলে আসে, তারা আসলে কতটা অন্যায় করে? জনপ্রিয় পডকাস্ট ‘ওয়ার ইউ রেইজড বাই উলভস?’ এর সহ–উপস্থাপক ও ভদ্রতাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিক লেইটন বলেন, ‘এরা মূলত সমাজের নিয়মকানুনকে কোনো পাত্তাই দেয় না।’

যারা এভাবে লাইনে ঢুকে পড়ে, তাদের হয়তো মনে সামান্য অপরাধবোধ কাজ করতে পারে। তবে তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো, আমাদের সবাইকে তাদের এই খারাপ আচরণের বিরক্তি মাথা পেতে সহ্য করতে হয়। এই চরম বিরক্তিকর পরিস্থিতি কীভাবে সামলাবে? কখন এবং কীভাবে প্রতিবাদ করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যাবে, তা নিয়েই আজকের লেখা।

লাইনে কেউ সামনে ঢুকে পড়লে কখন প্রতিবাদ করবে

কোনো অপরিচিত মানুষ যখন হঠাৎ করে তোমার সামনে লাইনে এসে দাঁড়ায়, তখন বিষয়টি বেশ রাগ হওয়ারই মতো। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) এর অধ্যাপক রিচার্ড সি. লারসন অনেক দিন ধরে লাইন বা সারি নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, আমাদের সবার জীবনের প্রতিটি মিনিটই খুব দামি। যে মানুষটি লাইন ভেঙে সামনে চলে আসে, সে যেন বিনা বাক্যে বুঝিয়ে দেয় আমার সময়ের দাম তোমার সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।

নিয়ম ভেঙে যে সামনে চলে এসেছে, তাকে কিছু বলার আগে একটু ভেবে দেখা দরকার। এতে তোমার আদতে কী লাভ হবে? তুমি কি নিজের হারিয়ে যাওয়া জায়গাটি ফিরে পেতে চাও, নাকি শুধু প্রতিশোধ নিতে চাও?

যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-গ্রিন বে ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক রায়ান মার্টিন। তিনি রাগ ও তীব্র আবেগ নিয়ে গবেষণার জন্য অনলাইনে ‘অ্যাঙ্গার প্রফেসর’ হিসেবে পরিচিত। তিনি বলেন, অনেক সময় মানুষ শুধু অন্য পক্ষকে এটা বোঝাতে চায় সে আসলে একজন খারাপ মানুষ।

অধ্যাপক মার্টিন বলেন, এমন পরিস্থিতিতে তিনি হয়তো প্রতিবাদ করবেন, যাতে ওই মানুষটি বুঝতে পারে সে ভুল করেছে এবং তাকে যেন লাইন থেকে সোজা পেছনে গিয়ে দাঁড়াতে বলা যায়। তবে একই সঙ্গে তিনি নিজেকে এ কথাও জিজ্ঞেস করেন, ‘এই ঝামেলার কারণে কি আমার পুরো সময়টা মাটি হবে?’

কনসার্টে গিয়ে গান উপভোগ করার বদলে যদি তুমি সারাক্ষণ সেই অপ্রীতিকর ঘটনার কথা ভেবে মন খারাপ করে থাকো, তবে লাইনে জায়গা হারানোর চেয়েও অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।

ভদ্রতাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিক লেইটন মনে করেন, এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে সব সময় একটি প্রশ্ন করা উচিত। এই বিষয়টি কি আসলেই এত গুরুত্বপূর্ণ যে এর জন্য আমাকে ঝগড়ায় জড়াতে হবে? তিনি বলেন, ভদ্রতা ও নিয়মের বিচারে এটি সব সময়ই খুব কাজের একটি প্রশ্ন।

পাশাপাশি নিজের নিরাপত্তার কথা সবার আগে মাথায় রাখা দরকার। লাইন ভেঙে সামনে দাঁড়ানো মানুষটিকে যদি বেশি আক্রমণাত্মক মনে হয় বা তার কাছে যেতে তোমার অস্বস্তি লাগে, তবে দোকানের বা আয়োজকদের কর্মীদের সাহায্য নাও অথবা বিষয়টি এড়িয়ে চলো। কেননা যেকোনো নিয়ম বা ভদ্রতার চেয়ে নিজের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কেউ সামনে ঢুকে পড়লে তখন ঠিক কী বলা উচিত

সামাজিক নিয়মকানুন নিয়ে গবেষণা করেন ডিকিনসন কলেজের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক মেরি হেলওয়েগ-লারসেন। লাইনে কেউ সামনে ঢুকে পড়লে মানুষ কেন এত রেগে যায়, তা তিনি গবেষণা করেছেন। ২০০৮ সালের এক গবেষণার জন্য তিনি ও তাঁর এক সহকর্মী জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘ইউ২’–এর কনসার্টের সামনের সারির ভক্তদের ওপর একটি জরিপ চালান। সেখানে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কেউ নিয়ম ভেঙে সামনে চলে এলে তারা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবেন।

মজার ব্যাপার হলো, কেউ সামনে এসে দাঁড়ালে যেমন সবাই রেগে যান, ঠিক তেমনি কেউ পেছনে এসে দাঁড়ালেও তাঁরা বিরক্ত হন। যদিও এতে পেছনের মানুষের নিজের কোনো ক্ষতি হয় না। হেলওয়েগ-লারসেন বলেন, ‘সবার নিয়ম মেনে চলা খুব জরুরি। তা না হলে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য আপনি যে কষ্ট ও সময় খরচ করেছেন, তার আর কোনো দাম থাকে না।’

অবশ্য লাইন কোথায় শেষ হয়েছে, তা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য কোনো রকস্টার বা বড় কোনো বক্তৃতার দরকার নেই। হেলওয়েগ-লারসেন একটি সহজ উপায় জানিয়েছেন। মাফ করবেন, লাইনটা কিন্তু ওই দিক থেকে শুরু হয়েছে। ভালো হলে এতটুকু বলাই যথেষ্ট। এমনভাবে কথাটি বলতে হবে যেন মনে হয় তাকে শুধু নিয়মটা মনে করিয়ে সাহায্য করছ।

এই সহজ পদ্ধতি উল্টো দিকের মানুষকে নিজের ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ দেয়। এতে তাকে কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হয় না। আর ভদ্রভাবে কথা বলার অর্থ এই নয় যে আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে লোকটি ভুলবশত এমনটা করেছে। লেইটন বলেন, এমনকি কেউ যদি জেনেশুনেও লাইন ভেঙে থাকে, তবু ঠান্ডা ও ভদ্র সুরে কথা বলা উচিত।

গবেষক লেইটন নিজে একবার এমন অভিজ্ঞতার মুখে পড়েছিলেন। দোকানে গিয়ে তিনি না বুঝে অন্য জায়গায় দাঁড়িয়েছিলেন। পরে কেউ যখন তাঁকে সঠিক লাইনটি দেখিয়ে দেন, তখন তিনি রেগে যাওয়ার বদলে বরং খুশিই হয়েছিলেন।

যদি প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকো, তবে দেরি না করে তখনই বলে ফেলা ভালো। ঘটনাটি ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই মুখ খোলা উচিত। কেউ সামনে ঢুকে পড়ার পর পাঁচ মিনিট ধরে তার পিঠের দিকে তাকিয়ে মনে মনে রাগ পুষে রাখলে, পরে আর কথা বলা সহজ হয় না।

কোনো দীর্ঘ লাইনে যদি অনেক সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তবে অধ্যাপক মার্টিন আরেকটি চমৎকার পরামর্শ দিয়েছেন। তোমরা বলতে পার, ‘আপনি হয়তো খেয়াল করেননি, কিন্তু এখানে অনেক লম্বা একটি লাইন আছে এবং মানুষ সারা দিন ধরে অপেক্ষা করছে।’ এর মাধ্যমে তুমি সুন্দরভাবে সমস্যাটি ধরিয়ে দিলে এবং তাকে ‘উফ, ভুল হয়ে গেছে, দুঃখিত’ বলার একটি সুযোগ তৈরি করে দিলে।

অবশ্য সব পরিস্থিতি এক রকম হয় না। কেউ হয়তো শৌচাগারে যাওয়ার জন্য সাময়িকভাবে লাইন থেকে একটু দূরে গিয়েছিল। এটি আর বন্ধুদের অনেক পরে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা পরিচিতদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার বিষয়টি এক নয়। লেইটন শৌচাগারে যাওয়া বা পানি আনতে যাওয়ার মতো ছোটখাটো বিষয়গুলো মেনে নিতে হবে।

কেউ লাইন ভেঙে না সরলে তখন কী করবে

মাঝে মাঝে তুমি খুব ভদ্রভাবে নিয়ম মনে করিয়ে দিলেও সামনের মানুষটি উল্টো অসহযোগিতা করতে পারে। সে ভালো করেই জানে সেখানে লাইন আছে, তবু সে এক চুলও নড়তে চায় না। তখন তুমি কী করবে?

যদি তোমার মনে হয় পরিস্থিতি তুমি একা সামলাতে পারবে, তবে অধ্যাপক মার্টিন একটু শক্তভাবে কথা বলার পরামর্শ দেন। তুমি বলতে পারো, ‘আমার মনে হয় আপনার লাইন ছেড়ে একদম পেছনে গিয়ে দাঁড়ানো উচিত।’ এখানে তুমি কাউকে কোনো অপমান করছ না, বরং সরাসরি একটি যৌক্তিক অনুরোধ জানাচ্ছ।

অধ্যাপক লারসনের মতে, ‘কী করছেন আপনি?’ এর মতো কোনো আক্রমণাত্মক কথা না বলাটাই ভালো। তুমি কেবল তাকে লাইনের পেছনে যেতে বলছ, কোনো ঝগড়া বা লড়াইয়ের জন্য চ্যালেঞ্জ করছ না।

এরপরও যদি সেই মানুষটি নড়তে না চায়, তবে তার সঙ্গে তর্কে জড়ানোর লোভ সামলাও। মার্টিনের মতে, পৃথিবীর সবাইকে তো আর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যিনি নাছোড়বান্দার মতো সরে যেতে চান না, তাঁকে বারবার চাপ দিতে গেলে পরিস্থিতি আরও বড় কোনো অশান্তির দিকে চলে যেতে পারে।

যদি কোনো কনসার্ট, থিম পার্ক বা অন্য কোনো জায়গায় আশপাশে আয়োজক বা নিরাপত্তারক্ষী থাকেন, তবে তুমি তাদের সাহায্য নিতে পারো। তুমি সব সময় কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে পারো। তারা শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থা নেবে কি না, সেটা আলাদা ব্যাপার। তবে কেউ যদি খুব অন্যায়ভাবে লাইন ভেঙে সামনে চলে আসে, তবে এই পথটি বেছে নেওয়া যেতে পারে।

আর যদি শেষ পর্যন্ত তুমি ঝামেলা এড়িয়ে বিষয়টি সেখানেই ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত না–ও, তবে চলে আসার সময় কোনো কটূক্তি করা থেকে বিরত থাকো। হয়তো মনের রাগ থেকে ‘বাহ, দারুণ তো।’ এর মতো কোনো ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করার ইচ্ছা জাগতে পারে। কিন্তু লেইটন এমন আচরণ করতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, এতে কোনো লাভই হয় না, বরং মেজাজ আরও খারাপ হয়।

সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট ও টাইমস ম্যাগাজিন

সূত্র: প্রথম আলো