|
| |
বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

কেনিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র: দেশে দেশে নির্বাচন প্রভাবিত করতে কীভাবে কাজ করেন ভারতীয় ‘পরামর্শকেরা’

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:০০ এএম
২৮৪ পঠিত
কেনিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র: দেশে দেশে নির্বাচন প্রভাবিত করতে কীভাবে কাজ করেন ভারতীয় ‘পরামর্শকেরা’
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:

ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের আহমেদাবাদের একটি সাদামাটা এলাকা। সেখানকার আসবাবহীন এক ফ্ল্যাটে রাতের পর রাত কাজ করতেন ২২ বছরের এক ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা। তিনি পোস্টার বানাতেন। ভিডিও সম্পাদনা করতেন। কাজটি ছিল হাজারো কিলোমিটার দূরের কেনিয়ায় ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উইলিয়াম রুটোর প্রচারের জন্য।

ওই তরুণের নাম রাজন কুমার। তাঁর তৈরি প্রচারসামগ্রী রুটোর আনুষ্ঠানিক প্রচারশিবির থেকে প্রকাশ করা হতো না। দিনে প্রায় ৮৭০ টাকা (৭ ডলার) মজুরিতে তিনি ৫০টি পোস্ট তৈরি করতেন। তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচয় গোপন রাখা অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হতো।

এসব অ্যাকাউন্ট রুটোর পক্ষে প্রচার চালাত; কিন্তু নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রাখত। যাতে করে একই পরিকল্পনার আওতায় প্রচার চালালেও তা ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির স্বতন্ত্র মতামত বলে মনে হয়।

কুমার জানান, বিরোধী নেতাদের বক্তব্য বিকৃত করতে তিনি তাঁদের বক্তৃতা বা সাক্ষাৎকারের অংশ কেটে ছোট করতেন। কখনো মিথ্যা দাবি দিয়ে পোস্টার বানাতেন। তাতে ভোটের আগে রুটোর জয়ের সম্ভাবনা ও জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেখানো হতো।

আল–জাজিরাকে কুমার বলেন, ‘কোনো নারী রাজনীতিক হলে আমরা কারও সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে দিই। উদ্দেশ্য সুনাম নষ্ট করা। কাউকে হেয় করার সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি এটি।’

কুমারের ভাষ্য, ‘সব বিতর্কিত প্রচারসামগ্রী’ পরিচয় গোপন রাখা পেজে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে সেগুলো ব্যাপকভাবে ছড়ানো হয়।

২০২২ সালের নির্বাচনে জিতে কেনিয়ার পঞ্চম প্রেসিডেন্ট হন রুটো।

চার বছর পর এবার আগামীকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এর আগে গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, ভারতীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বট ও অ্যাকাউন্ট পরিচয় গোপন রেখে নির্দিষ্ট প্রচারশিবিরের পক্ষে ভিডিও ছড়াচ্ছে। বট বলতে এখানে সফটওয়্যারের মাধ্যমে আংশিক বা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালানো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট বোঝানো হয়েছে।

মিশিগানে ডেমোক্র্যাট রাজনীতিক হেইলি স্টিভেন্সের পক্ষে এমন পোস্টের খবর প্রথম প্রকাশ করে নিউইয়র্ক টাইমস। গত ৪ আগস্ট সিনেটের দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের ভোটের আগে পোস্টগুলো ছড়ানো হয়। সিনেট হলো যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ।

সেই ভোটে আবদুল আল-সাইদের কাছে হেরে যান স্টিভেন্স। মধ্যবর্তী নির্বাচনে এখন দলের প্রার্থী আল-সাইদ।

কেনিয়ার সাধারণ নির্বাচনের আগে শেষ নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নেন দেশটির প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো। ২০২২ সালের ৬ আগস্ট দেশটির রাজধানী নাইরোবিতে ৯ আগস্ট

তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্বাচনী লড়াইয়ে ভারতীয় ‘পরামর্শকদের’ জন্য যুক্তরাষ্ট্র নতুন সংযোজন মাত্র। দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে পরিচয় গোপন রেখে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন ভারতের এসব ভাড়াটে অনলাইন প্রচারক। রাজনীতিকেরা তাঁদের ওপর ভরসা করছেন।

এই প্রতিবেদনের জন্য ভারতের প্রায় এক ডজন রাজনৈতিক পরামর্শকের সঙ্গে কথা বলেছে আল–জাজিরা। তাঁদের ভাষ্য, এমন গোপন প্রচারে কোনো সীমারেখা নেই। নিয়ন্ত্রণ নেই। নেই কোনো কোনো নিষেধের গণ্ডি।

নয়াদিল্লির রাজনৈতিক ‘পরামর্শক’ তুষার গিরি বলেন, ‘আমরা নির্বাচনে কারসাজি করছি। বিষয়টিকে অন্যভাবে বলার সুযোগ নেই। নির্বাচনী গণতন্ত্রের ধারণাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভোটারের স্বাধীন ইচ্ছা বলে কিছু নেই। সবকিছুতেই কারসাজি করা হয়।’

বিরোধী নেতাদের বক্তব্য বিকৃত করতে তিনি তাঁদের বক্তৃতা বা সাক্ষাৎকারের অংশ কেটে ছোট করতেন। কখনো মিথ্যা দাবি দিয়ে পোস্টার বানাতেন।

ক্ষমতার গোপন উৎস

রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনীতিক ও নির্বাচনী প্রচারশিবিরকে জনসমর্থন এবং ভোটে জেতার পরামর্শ দেয়। রাজনৈতিক মত প্রভাবিত করাকে সেবা হিসেবে বিক্রি করে এমন বিশেষায়িত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব হয় যুক্তরাষ্ট্রে, ১৯৩০-এর দশকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের সঙ্গে অসাধু কৌশলও অনলাইনে ছড়িয়েছে। ভোটারদের প্রভাবিত করা ও কাছে টানতে বিশেষ করে মেটা ও গুগলের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন চালানো হয়। নির্দিষ্ট ভোটারগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর জন্য এসব বিজ্ঞাপন বাছাই করে দেখানো হয়। এভাবে লাখ লাখ ভোটারের কাছে পৌঁছানো যায়।

আগের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের প্রভাবিত করতে রাশিয়াও একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছে।

নির্বাচনী প্রচারে যেসব বিষয় আনুষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো বেশি বিতর্কিত মনে হয়, সেগুলো প্রচারের নানা পথ আছে। কোনো পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মেটা বা গুগলে আগে থেকেই থাকা কোনো দলের গোপন পরিচয়ের পেজের নিয়ন্ত্রণ নেয়। কখনো নতুন পেজ খোলে। পুরোনো পেজের নাম ও পরিচিতি বদলায়। কখনো পেজ ভাড়া নেয়।

ভারতের ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে আল–জাজিরার এক অনুসন্ধানে এমন পেজের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া যায়। মেটা ও গুগলের ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের মতো সেবায় এসব পেজ বিক্রির জন্য রাখা হয়েছিল। ভোটারদের প্রভাবিত করতে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর উদ্দেশে বিজ্ঞাপনের অপব্যবহার ঠেকানোর নিয়ম পাশ কাটিয়ে এ কাজ চলছিল।

‘অ্যান্টিবট ফর নাভালনি’ নামেল বেনামি গবেষকদের একটি গোষ্ঠী ভ্রান্ত তথ্য ও অপপ্রচার নিয়ে কাজ করে। অনলাইনে সমন্বিতভাবে প্রভাব বিস্তারের তৎপরতা অনুসন্ধান করে তারা প্রকাশ করে থাকে। বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ ধরনের তৎপরতা নিয়ে তারা বেশি কাজ করে।

গোষ্ঠীটি আল–জাজিরাকে জানিয়েছে, মিশিগানের ডেমোক্র্যাটদের প্রার্থী বাছাইয়ের ভোটে স্টিভেন্সের পক্ষে ভিডিও ছড়ানো অন্তত ২৮টি অ্যাকাউন্ট তারা শনাক্ত করেছে। এক্সের এই ভিডিওগুলো ৭০ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে।

গত কয়েক বছরে ভারত বিশ্বে রাজনৈতিক প্রচার চালানোর ‘বড় এক পাইকারি বাজারে’ পরিণত হয়েছে।

আল–জাজিরার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শনাক্ত করা অ্যাকাউন্টগুলোর অন্তত ১৫টি ভারতে বসে পোস্ট করা হয়েছিল।

সাউথ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মিডিয়া ফরেনসিক হাব’ নামের গবেষণাকেন্দ্রের গবেষকেরাও একই ধরনের কৌশল শনাক্ত করেছেন। আল-সাইদের বিরুদ্ধে স্টিভেন্সের পক্ষে প্রচারে ভাড়া করা ভারতীয় অ্যাকাউন্ট ও পেজ এসব কৌশল ব্যবহার করেছে।

ভারতের রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ নিয়ে লেখা বই ব্যাকস্টেজ অব ডেমোক্রেসির লেখক অমোঘ ধর শর্মা। তাঁর মতে, নির্বাচনের আগে রাজনীতিকেরা চান ভোটারদের মনোযোগ প্রকাশ্যে আসা বিষয়গুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক।

রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রসঙ্গে শর্মা আল–জাজিরাকে বলেন, ‘কিন্তু কখনো কখনো প্রকৃত ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয় জনচক্ষুর সম্পূর্ণ আড়ালে। গণতন্ত্রের ভেতরে এভাবে ক্ষমতার গোপন উৎস তৈরি হওয়া সবচেয়ে বড় নৈতিক উদ্বেগগুলোর একটি।’

সতর্ক থাকুন, চিহ্ন লুকান

ভারতে এখন যেকোনো নির্বাচনী প্রচারের এ ধরনের রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো রমরমা হয়ে উঠেছে। দেশে তাদের কাজের অভিজ্ঞতা অন্য দেশের রাজনীতিকদের আকৃষ্ট করতে প্রচারের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

নয়াদিল্লির পরামর্শক গিরি বলেন, ‘ভারতের মতো জটিল নির্বাচনী গণতন্ত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দেওয়ার প্রমাণিত অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। এখন বিদেশের প্রচারশিবিরও সে কারণে আকৃষ্ট হচ্ছে।’

ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার নিয়ম অনুযায়ী, অ্যাকাউন্ট বিক্রি, কেনা বা বিনিময় করা নিষিদ্ধ। এমন চেষ্টা করাও নিষিদ্ধ। ভুয়া বা চুরি করা পরিচয় ব্যবহার করেও অ্যাকাউন্ট চালানো যায় না।

সাধারণভাবে মেটা ও গুগল রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনদাতাদের পরিচয় যাচাই বাধ্যতামূলক করে। নির্বাচনী বিজ্ঞাপনের অর্থ কে দিয়েছেন, তা-ও জানাতে হয়। তবে সুনির্দিষ্ট নিয়ম দেশভেদে আলাদা।

ভারতীয় পরামর্শকেরা আল–জাজিরাকে বলেছেন, এসব ব্যবহারবিধি নিয়মিত লঙ্ঘন করা হয়।

চার বছর পর এবার আগামীকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এর আগে গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, ভারতীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বট ও অ্যাকাউন্ট পরিচয় গোপন রেখে নির্দিষ্ট প্রচারশিবিরের পক্ষে ভিডিও ছড়াচ্ছে।

গিরি বলেন, ‘এসব প্ল্যাটফর্মের নিয়মের পাতা অনেক দীর্ঘ; কিন্তু ভালো করে পড়লে এমন অনেক ফাঁক পাওয়া যায়, যেগুলো কাজে লাগানো সম্ভব।’

কোনো ভৌগোলিক অঞ্চলে বিধিনিষেধের মুখে পড়লে এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত অর্থের বিনিময়ে নেওয়া ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) সেবা ব্যবহার করে। এটা ব্যবহার করে সাধারণ ইন্টারনেটের মাধ্যমে আলাদা সুরক্ষিত সংযোগ তৈরি করা যায়।

কখনো শুধু অ্যাকাউন্টের উৎস–দেশের তথ্য বদলালেই কাজ হয়। তখন অন্য দেশে বসেও কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট ভোটার গোষ্ঠীর উদ্দেশে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন চালাতে পারেন।

গিরি জানান, গত বছর দক্ষিণ আমেরিকার দেশ সুরিনামের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের একটি প্রচারশিবিরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি।

লেখক শর্মা জানান, গবেষণার সময় তিনি অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানিতেও ভারতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ করার তথ্য পেয়েছেন। পরামর্শকেরা বলেন, তাঁরা নেপাল ও শ্রীলঙ্কাসহ ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোতেও নির্বাচনী প্রচারে কাজ করেছেন।

কেনিয়ায় ২০২২ সালে রুটোর পক্ষে কাজ করা কুমার জানান, মাসিক চুক্তিতে প্রতিদিন প্রতিটি কনটেন্টের জন্য প্রায় ৭ ডলার পেতেন তিনি। কোনো কোনো দিন তাঁকে ১০০টি পর্যন্ত প্রচারসামগ্রী তৈরি করে দিতে বলা হতো। টেলিগ্রামের গ্রুপে কাজের সমন্বয় করা হতো।

কুমার জানান, রুটোর কোনো প্রতিনিধির সঙ্গে তিনি কখনো সরাসরি কাজ করেননি। এ কাজের সঙ্গে বিভিন্ন ধাপে যাঁরা যুক্ত থাকেন, তাঁদের সবার পরিচয় নির্মাতাদের জানানো হয় না। এসব ধাপ পেরিয়ে কাজ গিয়ে পৌঁছায় প্রচারশিবিরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছে।

কুমার বলেন, ‘তারপরও সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। নিজেদের কাজের চিহ্ন লুকিয়ে রাখতে হয়।’ নিয়মিত চ্যাট মুছে ফেলা হয়। সিমকার্ডও নষ্ট করা হয়।

২০২৪ সালের ৪ জুন ভারতের সাধারণ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর নয়াদিল্লিতে বিজেপির সদর দপ্তরের বাইরে চলছে উদ্‌যাপন

এসব ঝুঁকি কিন্তু কাল্পনিক নয়, বাস্তব।

রুটোর প্রচারশিবিরের হয়ে কাজ করা দুই ভারতীয় রাজনৈতিক পরামর্শক জুলফিকার আহমদ খান ও মোহাম্মদ জায়েদ সামি কিদওয়াই ২০২২ সালের জুলাইয়ে নাইরোবিতে নিখোঁজ হন। নির্বাচন তখনো হয়নি। অক্টোবরে তাঁদের মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অভিযোগ ওঠে, কেনিয়ার পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট তাঁদের অপহরণ করেছিল।

জয়ের পর ওই ইউনিট ভেঙে দেন রুটো। হত্যার অভিযোগে ১৫ পুলিশ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়; কিন্তু ২০২৬ সালের আগস্টে কেনিয়ার হাইকোর্ট তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বাতিল করেন। এর আগে রাষ্ট্রপক্ষ হত্যার তদন্ত বন্ধের আবেদন করেছিল।

গোপনে অর্থের লেনদেন

বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক পরামর্শক জানান, কুমারের মতো যাঁরা পর্দার আড়ালে কাজ করেন, তাঁদের পারিশ্রমিক দেওয়ার প্রক্রিয়াও গোপন রাখা হয়।

নিরাপত্তার আশঙ্কায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পরামর্শক বলেন, ‘কালো অর্থ রাজনৈতিক পরামর্শক ব্যবসার একটি স্তম্ভ। বিদেশে আমাদের কোম্পানি আছে। সেগুলো নানা কাজের জন্য কাগজে-কলমে লোক নিয়োগ দিয়ে অর্থ দেয়; কিন্তু এগুলো আসলে অর্থ পাঠানোর আড়ালমাত্র।’

কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ‘হাওয়ালা’ নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করে। এটি পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে পরিচালিত অর্থ স্থানান্তরের একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা এড়িয়ে মধ্যস্থতাকারীদের সাহায্যে এক দেশ থেকে অন্য দেশে অর্থ পাঠানো হয়।

অন্তত তিনজন পরামর্শক পুরোনা দিল্লির বিস্তীর্ণ চাঁদনি চক বাজারের রপ্তানিমুখী কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে এমন লেনদেনের একটি কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পরামর্শক দুই বছর আগের একটি নাটকীয় লেনদেনের কথা জানান। তিনি সঙ্গে করে নির্দিষ্ট ক্রমিক নম্বরের একটি ভারতীয় নোট নিয়েছিলেন। অর্থ সংগ্রহের সময় পরিচয় নিশ্চিত করার সংকেত হিসেবে নোটটি ব্যবহার করা হয়।

ওই পরামর্শক বলেন, ‘আমি মানুষকে ১০ রুপির নোট দিয়ে লাখ লাখ রুপি নগদ নিতে দেখেছি। মনে হচ্ছিল, আমি যেন কোনো সিনেমায় আছি।’

তবে এই লেনদেনের অর্থ কোন দেশ বা কোন প্রচারশিবির দিয়েছিল, তা জানাতে রাজি হননি তিনি।

রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনীতিক ও নির্বাচনী প্রচারশিবিরকে জনসমর্থন আদায় ও ভোটে জেতার কৌশল বাতলে দেয়। তারা এর নাম দিয়েছে সেবা। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু যুক্তরাষ্ট্রে, ১৯৩০-এর দশকে।

সীমা কোথায়

পরামর্শক গিরির ভাষ্য, গত কয়েক বছরে ভারত এমন গোপন রাজনৈতিক প্রচার চালানোর ‘বড় এক পাইকারি বাজারে’ পরিণত হয়েছে।

এই পরামর্শক বলেন, আপনারা যেমন চীন থেকে খেলনা কেনেন, তেমনি ভারতে সবচেয়ে কম খরচে বিশ্বের যেকোনো দেশের নির্বাচনে কারসাজি করাতে পারেন।

ভারতের রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ বোঝাতে লেখক শর্মাও একই ধরনের তুলনা টেনেছেন।

শর্মার মতে, এটি সম্ভবত বৈশ্বিক আউটসোর্সিং শিল্পেরই সম্প্রসারণ। আউটসোর্সিং মানে নিজেদের কাজ অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া। ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এই শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

শর্মা বলেন, ২০০০-এর দশকে ভারত যেভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নানা কাজ অন্য প্রতিষ্ঠানের হয়ে করে দেওয়ার কেন্দ্র হয়েছিল, এখন সেভাবেই রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের উত্থান হচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারশিবিরগুলো তাদের কম স্বচ্ছ কাজ এসব প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করিয়ে নিতে পারে।

শর্মার মতে, অনলাইনে এসব গোপন প্রচারের নেপথ্যের লোকজন এবং তাঁদের নিয়োগ দেওয়া প্রচারশিবিরের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব থাকে। ফলে তৎপরতা ফাঁস হলে সংশ্লিষ্ট সবাই নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকারের সুযোগ পান। দূরত্বের কারণে তাঁদের অস্বীকারও বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হতে পারে।

একটি প্রচারশিবিরের জন্য পরামর্শকেরা কতটা দূর যেতে পারেন, তার ওপরই তাঁদের সাফল্য নির্ভর করে বলে মনে করেন গিরি। তিনি বলেন, ‘সীমা কোথায়? কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ভোটারদের প্রভাবিত করতে নোংরা কৌশল নিতে পারে, এমনকি (তাদের ভাড়া করা) রাজনৈতিক দলটির কল্পনারও বাইরে গিয়ে কিছু করতে পারে, তাহলে তারা সেই অনুযায়ী পুরস্কার পায়।’

গিরি বলেন, ‘যত বেশি নোংরা কাজ করতে পারবেন, তত বেশি অর্থ ও সুযোগ মিলবে।’

সূত্র: প্রথম আলো