|
| |
রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

ছেলের ঠিকানা শহরে, চরে অপিয়লের

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৯:২৫ এএম
৩৩৩ পঠিত
ছেলের ঠিকানা শহরে, চরে অপিয়লের
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
প্রতিদিন ঘুম থেকে দিন কীভাবে শুরু হয় এই প্রশ্নে অপিয়ল বলেন, ‘চরের মানুষ সকালে উঠিয়ায় আগত নদীর পারত যায়। চারদিক ছায়া দেখে রাতে কার বাড়ি ভাঙিল আর কার জমির ফসল ডুবি গেল।
কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদ বেষ্টিত বজরা দিয়ারখাতা চরে জমিতে সেচের ব্যবস্থা করছেন প্রবীণ কৃষক মো. অপিয়ল। সম্প্রতি চিলমারী উপজেলায়

পবিত্র ফজরের নামাজ পড়েই ব্রহ্মপুত্রের দিকে তাকান অপিয়ল। পানি বাড়ছে না কমছে, বাতাস কোন দিক থেকে বইছে, তা দেখেই ঠিক করেন দিনের কাজ। বয়স ৭৩ বছর। নামের আগে-পরে আর কিছু নেই। কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার চর বজরা দিয়ারখাতায় তাঁর জন্ম, এখানেই কেটেছে জীবনের বেশির ভাগ সময়। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে জীবনে ১২ বার বসতভিটা হারিয়েছেন। ২০২৫ সালেও ব্রহ্মপুত্র নদ তাঁর বসতভিটা ভেঙেছে। এবারও ভাঙনে গেছে ভিটার একাংশ আর ধানের জমির কিছুটা। দুই বছর আগে চিলমারী উপজেলা শহরে একটি বাড়ি করেছেন, ছেলের জন্য। তবু নিজে চর ছাড়েননি।

প্রতিদিন ঘুম থেকে দিন কীভাবে শুরু হয় এই প্রশ্নে অপিয়ল বলেন, ‘চরের মানুষ সকালে উঠিয়ায় আগত নদীর পারত যায়। চারদিক ছায়া দেখে রাতে কার বাড়ি ভাঙিল আর কার জমির ফসল ডুবি গেল। এই চর ভাঙলে কোন চরে বাড়ি নেমো, এই ভাবতে ভাবতে জমির কাজকাম শুরু করি।’

নদীর পেটে বাবার ৬০ বিঘা

অপিয়লের বাবা ছনদ্দি মুন্সি পাকিস্তান আমলে ৬০ বিঘা জমির মালিক ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় ১০ বছর পর কয়েক বছরের ভাঙনে সেই জমির সবটাই চলে যায় ব্রহ্মপুত্রের পেটে। তখন অপিয়লের ঘরে নতুন বউ। সচ্ছল পরিবারটি রাতারাতি নিঃস্ব। অন্যের জমিতে মাটি কাটা আর দিনমজুরি করে কোনোমতে সংসার চলত। সেই অভাবের মধ্যেই একটি গাভি কেনেন। বাছুর হওয়ার পর শুরু হয় দুধ বিক্রি। অপিয়ল অন্যের বাসায় দিনমজুরি করতেন আর বাসায় বানেছা বেগম গাভির যত্ন আর সংসারের দেখাশোনা করতেন। দুধ আর মজুরির টাকা অল্প অল্প করে জমিয়ে ১৯৯৫ সালে দুই বিঘা জমি কেনেন। ২০২৫ সালের ভাঙনে ওই জমির একাংশ ভেঙে গেছে।

স্বামীর সংসারের অভাবের দিনগুলোর কথা বানেছা বেগমের মনে এখনো স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘বিয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই সব জমিজমা নদীত ভাঙি যায়। সংসারে খুব অভাব-অনটন শুরু হয়। ওই সময় বাপের বাড়ি থাকি কিছু সাহায্য-সহযোগিতা পাইছি। মানুষটা (অপিয়ল) দিনমজুরির কাম করত। ১০-১৫ বছর পর মোক একটা গাই কিনা দেয়। ওই গাইয়ের দুধ বেচি, আস্তে আস্তে টাকা জমাইছি। সেই গাই থাকি ধীরে ধীরে জমিজমা করছি।’

‘এই চর ভাঙলে কোন চরে বাড়ি নেমো, এই ভাবতে ভাবতে জমির কাজকাম শুরু করি।’ ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে জীবনে ১২ বার বসতভিটা হারিয়েছেন ৭৩ বছরের অপিয়ল।

বছর দশেক হলো বাবার জমির প্রায় ৪০ বিঘা আবার জেগে উঠেছে। কিন্তু সেই জমিতে পা রাখতে পারেননি অপিয়ল। জমির একাংশ এখন প্রভাবশালীদের দখলে। অপিয়ল বলেন, ‘চোখের সামনত বাবার জমি, এল্যা সেই জমি অন্য মানুষ চাষ করে। আমার লাঠির জোর নাই, তাই জমিত যাবার পাই না। কষ্টে বুক ফাটি যায়।’

জাহানুর রহমান, প্রথম আলোর কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

ফসল ফলালেই লাভ হয় না

এখন নিজের কেনা জমি আর বর্গা নেওয়া জমি মিলিয়ে কয়েক বিঘায় চাষ করেন অপিয়ল। বজরা দিয়ারখাতায় দুই বিঘায় আমন, পাশের বান্ডালের চরে তিন বিঘায় ভুট্টা। চরের বালুমাটি পানি ধরে রাখতে পারে না, তাই ধান ভালো হয় না, ভুট্টা হয়। তবে খরচ কম নয়। অপিয়লের হিসাবে, হাল, বীজ, সার আর সেচ মিলিয়ে বিঘাপ্রতি ভুট্টায় খরচ প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। ফলন আর দাম ভালো হলে লাভ থাকে ২৫-৩০ হাজার। ফসল ওঠার আগে হাতে নগদ টাকা থাকে না, তাই সার আর তেল কিনতে হয় মহাজনের কাছ থেকে বাকিতে, বাড়তি দামে। ফসল বেচতে প্রথমে ঘোড়ার গাড়ি, তারপর নৌকায় যেতে হয় ১০-১২ কিলোমিটার দূরের জোড়গাছ হাটে। ভাড়া, কুলির মজুরি আর হাটের টোল দিয়ে লাভ আরও কমে। দাম পড়ে গেলে কিছুই থাকে না।

ছেলে মাসুদ রানার বয়স ৩৩ বছর। স্নাতকোত্তর পাস করার পর সরকারি চাকরির চেষ্টা করেছিলেন, কয়েকবার মৌখিক পরীক্ষা পর্যন্তও গেছেন, কিন্তু চাকরি হয়নি। এরপর কয়েক বছর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাইক্রোক্রেডিট শাখায় চাকরি করে শেষে পাঁচ বছর আগে গ্রামে ফিরেছেন। অপিয়লের আশা ছিল, ছেলে পড়াশোনা শেষে ভালো চাকরি করবে, সংসারে স্বস্তি আসবে। এখন বাবা-ছেলে একসঙ্গে খেতে কাজ করেন। মাসুদ রানা ছাড়াও অপিয়লের আরও দুই মেয়ে আছে। তাঁদের বিয়ে হয়েছে।

শিক্ষিত ছেলে হয়ে কৃষি পেশায় ফিরে আসার বিষয়ে মাসুদ রানা বলেন, ‘সরকারি চাকরির আশা তো সবাই করে। কিন্তু কপালে না থাকলে, মামা-খালু ও টাকা দিতে না পারলে চাকরি পাওয়া মুশকিল। চেষ্টার কমতি রাখি নাই। শেষে গ্রামে ফিরে এসে কৃষিকাজ শুরু করেছি।’

ভাঙনের বাইরে ছেলের ঠিকানা

দুই বছর আগে ভুট্টা আর গরু বিক্রির টাকায় চিলমারী উপজেলা শহরে জমি কিনে একটি বাড়ি করেছেন অপিয়ল। জমি কেনা ও বাড়ি করতে প্রায় আট লাখ টাকা খরচ হয়েছে। নদী যতবারই ভিটা কেড়ে নিক, ছেলের জন্য অন্তত ভাঙনের বাইরে একটা ঠিকানা থাকল। মাসুদ চাইলে সেখানে গিয়ে থাকতে পারবেন, সেই প্রশান্তি অপিয়লের চোখেমুখে। মৌসুমে চাষাবাদের সময় মাসুদ রানা গ্রামে থাকেন, অন্য সময় শহরের বাসায় থাকেন। এ ছাড়া বন্যার সময় চরের বাসা থেকে গরু-ছাগল নিয়ে সবাই শহরের বাসায় আশ্রয় নেন।

কিন্তু নিজে শহরে গিয়ে থাকতে চান না অপিয়ল। এই চরের মাটি, নদী, খেত আর গরুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর জীবন। গরুগুলোকে সন্তানের মতো ভালোবাসেন। এবারের ভাঙনে সেগুলো বিক্রির কথাও ভেবেছিলেন, পারেননি। বিকেলে গঞ্জে গেলে পুরোনো চেনা মানুষদের সঙ্গে দেখা হয়, সুখ-দুঃখের কথা হয়। সারা জীবনের অভাব-অনটনে পাশে থেকেছেন স্ত্রী বানেছা বেগম। শেষ বয়সে অপিয়লের চাওয়া সামান্য: কৃষিকাজ করেই বাকি জীবন কাটানো, কারও কাছে যেন হাত পাততে না হয়, আর স্ত্রী যেন একটু ভালো থাকেন।

সূত্র: প্রথম আলো